২০১৯ সালে তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ও ‘আইনি সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে রায় দেয় উচ্চ আদালত। ওই রায়ে দেশের সব নদ-নদী-খাল-বিল-জলাশয়কেও পরস্পর সম্পৃক্ত বা একটি অঙ্গীভূত একক সত্তা হিসেবে একই সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা দেওয়ার ঘটনা ছিল যুগান্তকারী। নদীমাতৃক বাংলাদেশ পৃথিবীর চতুর্থ রাষ্ট্র হিসেবে নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করার গৌরব অর্জন করেছে ওই রায়ের মাধ্যমে। যুগান্তকারী ওই রায়ে একই সঙ্গে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদী-জলাশয় দেখভালের জন্য অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে আশাবাদ জাগ্রত হয়েছিল যে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দখল-দূষণ থেকে দেশের নদ-নদী রক্ষা এবং ইতিমধ্যেই দখল হওয়া নদীগুলো দখলমুক্ত করার কাজ এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে আদালতের রায় এবং কমিশনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নদ-নদী দখলমুক্ত করার বিষয়টি বাস্তবে ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এসব এখনো কাগুজে বাঘ হয়েই রয়ে গেছে।
বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘৮ বছর ধরে দখল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের অন্যতম বড় নদী এবং অন্যতম প্রধান নৌপথ মেঘনার একাংশসহ ফুলদী নদীর মুখ দখলমুক্ত করতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আট বছর ধরে মেঘনা ও ফুলদী নদীর আংশিক দখল করে নিয়েছে ‘থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেড’ নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান। এই আট বছরের মধ্যে ২০১৯ সালে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাতীয় নদী কমিশনকে চিঠি দিয়ে থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডকে নদী দখলকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি নদী দখলমুক্ত করতে কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অন্যদিকে মেঘনা-ফুলদীর মোহনা সংলগ্ন এলাকায় একই প্রতিষ্ঠানের দখলের কবলে পড়া ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি মালিকদের করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ এপ্রিল হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে। চার সপ্তাহের মধ্যে ওই রুলের জবাব দিতে বলা হলেও এখন পর্যন্ত তা দেননি মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক, গজারিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান ও সহকারী কমিশনার।
উল্লেখ্য, ‘৮ বছর ধরে দখল’ প্রতিবেদনটি ছিল গত ২৮ জুলাই ‘মেঘনা-ফুলদীর বুকে কারখানা’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনের ফলোআপ। প্রথম প্রতিবেদনটির সূত্র ধরে গত ২ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে মেঘনা-ফুলদীর মোহনা এলাকায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ। চিঠিটি একই সময় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারকেও পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গত ১২ আগস্ট অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যানকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। বিআইডব্লিউটিএ চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদন চলতি সপ্তাহের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু গত আট বছরে যেমন গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দখলমুক্ত হয়নি তেমনি দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন, মন্ত্রিপরিষদের চিঠি এবং আদালতের রুল সত্ত্বেও বস্তুতপক্ষে কয়েকটি চিঠি চালাচালি ছাড়া আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ দেশে নদী রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পাশাপাশি প্রতিটি জেলা প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে। এ ছাড়া নদীর ভেতর স্থাপনা হচ্ছে কিনা সেসব দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) রয়েছে। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও নদী ও খাল ভরাট করে কারখানা নির্মাণ করা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে যে, থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের ক্ষমতার উৎস কোথায়? অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদী-খাল দখলদার হিসেবে অভিযুক্ত থ্রি অ্যাঙ্গেল মেরিন লিমিটেডের সঙ্গে কেনাকাটার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে যে, এমন একটি নদী দখলদার ও ঋণখেলাপিদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশের নদ-নদী দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ কোন যুক্তিতে লেনদেন করছে?
পরিবেশবিদ ও নদীরক্ষা আন্দোলনকর্মীরা বলছেন, আইনি ভিত্তি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও দেশের নদ-নদী-জলাশয় রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তরাও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে না পারার দায় এড়াতে পারেন না। এক্ষেত্রে দখলদারদের পাশাপাশি এই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাহলে হয়তো দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করবে। এই পরিস্থিতিতে মেঘনা-ফুলদীর মোহনা দখলমুক্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী স্পারসোর স্যাটেলাইট সার্ভের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা নির্ধারণ করে সে সংক্রান্ত ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রকাশ করার কাজও দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। তাহলে নদ-নদী অবৈধ দখলমুক্ত করার কাজে জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএসহ সরকারের নানা সংস্থা ও দপ্তরকে জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হবে।
