তথ্যপ্রযুক্তি অথবা আউটসোর্সিংয়ের কাজে জড়িতদের নিয়মিত অনলাইনে ‘ডিজিটাল ডলার’ কেনার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ফেইসবুকে সক্রিয় রয়েছে ডলার কেনাবেচার একাধিক প্ল্যাটফর্ম। যেখানে বেশিরভাগ ডিজিটাল ডলার কেনাবেচা হয়। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু প্রতারক মানুষকে ঠকিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তারা টাকা নিয়েও দিচ্ছে না ডিজিটাল ডলার। টাকা নেওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী ডলার সরবরাহ তো দূরের কথা, গ্রাহকের ফোনকলই রিসিভ করে না।
এদিকে প্রতারণার শিকার হয়ে ভুক্তভোগীদের অনেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করছেন। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও থামছে না প্রতারণা। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করলেও সহজে কোনো সুরাহা হচ্ছে না। প্রতারকরা ফেইসবুক ও মোবাইল ফোনে সক্রিয় থাকলেও তাদের অনেককে খুঁজে পায় না পুলিশ। কারণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, ফেইসবুক কর্র্তৃপক্ষের কাছে অভিযুক্ত অ্যাকাউন্টধারীর তথ্য চাইলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় পার হয়ে যায়। এজন্য এসব প্রতারককে সহজে ধরা যাচ্ছে না। তবে মোবাইল ফোন নম্বরের সূত্র ধরে আসামি গ্রেপ্তার করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট খোলা, ফেইসবুক পেজ বুস্ট করা, সফটওয়্যার নবায়ন বা হালনাগাদসহ বিভিন্ন কাজের সেবামূল্য পরিশোধের আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সহজমাধ্যম ইউএস ডলার। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা অনলাইনে ডলার কিনে তা আবার ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় পরিশোধ করে দেন। পেপাল, নেটেলার, মানিবুকারস ও ওয়েবমানিসহ বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্টের জন্য ডলার কেনেন তারা। এসব অ্যাকাউন্ট থেকেই প্রয়োজনীয় লেনদেন সেরে নেন। এ ক্ষেত্রে সচরাচর ফেইসবুকের মাধ্যমেই যোগাযোগ করে ডলার কেনেন তারা। যা করতে গিয়ে অনেক সময় প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তবে প্রতারকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক ফেইসবুক আইডি ফেক থাকে। তথ্য দেখার সুযোগ থাকে না। ফেইসবুক যেহেতু আমাদের দেশ নিয়ন্ত্রণ করে না, যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। ওই দেশ থেকে তথ্য আনতে হলে ল অ্যান্ড ইনফোর্স এজেন্সিদের জন্য ফেইসবুকের ইললিগাল সাইট আছে। মামলা, জিডি বা কোর্টের রেফারেন্সে আমরা সেখানে সরকারি মেইল থেকে মেইল করি। রিপ্লাই দিতে তারা যতদিন সময় নেয় ততদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। এজন্য অনেক সময় এক-দুই মাস সময়ও লেগে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি কোনো বাংলাদেশি ফোন নম্বর ব্যবহার করে টাকা নেয়, তাহলে সেই নম্বর তদন্ত করে আমরা আসামি গ্রেপ্তার করি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. নুর ইসলাম নামে একটি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে বিডি ডলার মার্কেট প্লেসসহ বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে ডলার বিক্রির নামে প্রতারণা করা হচ্ছে। নুর ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নিলেও বিনিময়ে ডলার দেন না। অনেকেই তার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। নুর ইসলামের বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলেও তার প্রতারণা থামেনি। নুর ইসলামের প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর (০১৬৪৩৭৬৮০২৭) চালু থাকলেও পুলিশ তাকে ‘খুঁজে পাচ্ছে না’।
আসাদুজ্জামান চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি নুর ইসলামের প্রতারণার শিকার হয়ে গত ২ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) খিলক্ষেত থানায় একটি জিডি করেন। এতে তিনি অভিযোগ করেন, গত ২ আগস্ট সন্ধ্যায় মো. নুর ইসলামের সঙ্গে ডলার লেনদেন সংক্রান্ত ৭ হাজার ৭০০ টাকা তার ০১৬৪৩৭৬৮০২৭ নম্বরের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাঠান। বিনিময়ে ১০০ ডলার আসাদুজ্জামান চৌধুরীর পেপাল অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেননি নুর ইসলাম। পরে বিভিন্ন টালবাহানা করে একপর্যায়ে তার মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ করে দেন।
ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি প্রতারিত হওয়ার পর এর প্রতিকার চেয়ে থানায় মামলা করতে গেলে টাকার পরিমাণ কম হওয়ায় আমাকে জিডি করতে বলে পুলিশ। জিডি করার পরও বিষয়টির কোনো সুরাহা পাইনি। সে (নুর ইসলাম) অনেকের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছে।’
গত মঙ্গলবারও মো. নুর ইসলামের ফেইসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে ডলার বিক্রি করছেন। তার ফেইসবুক পেজে ডলার বিক্রি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ডলার কেনার জন্য ফোন নম্বরটিও সংযুক্ত আছে। ডলার কিনতে টাকার মূল্য লেখা আছে। টাকা পরিশোধের জন্য সরাসরি অথবা বিকাশ বা রকেট অ্যাকাউন্টের নম্বরও দেওয়া আছে।
প্রতারণার অভিযোগ ওঠা নুর ইসলামের মোবাইল ফোন নম্বরে গত সোমবার সকালে কল করলে তিনি রিসিভ করেন। তখন প্রতারণার শিকার আসাদুজ্জামান চৌধুরীর জিডির বিষয়ে জানতে চাইলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর থেকে একাধিকবার কল করলেও আর রিসিভ করেননি তিনি। সর্বশেষ গতকাল বুধবারও তার ফোন চালু ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানায় আসাদুজ্জামান চৌধুরীর করা জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই গৌতম কুমার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে ফোন ট্র্যাকিংয়ের প্রযুক্তি থাকে না। আমি ওই মোবাইল ফোন নম্বরের মালিকের তথ্য চেয়ে জয়েন্ট কমিশন স্যার বরাবর আবেদন করেছি। এখনো কোনো তথ্য পাইনি। তথ্য পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আসাদুজ্জামান চৌধুরীর মতোই প্রতারণার শিকার হন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি ডা. চৌধুরী সাইফুল আলম বেগ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রয়োজনে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে পেপাল ও স্ক্রিল নেটলারের মাধ্যমে তার ডলার লেনদেনের প্রয়োজন হতো। সেই সুবাদে ফেইসবুকে সাজ্জাদুল আলম নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়। গত বছর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সাজ্জাদুল আলম প্রায় ১০ লাখ টাকার সমপরিমাণ ডলার প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করে নেন। এমন পরিস্থিতিতে ডা. বেগ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ করেন। এরপর সিআইডি সদস্যরা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নওগাঁর বদলগাছী থানার মাস্টারপাড়া এলাকা থেকে সাজ্জাদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে। তিনি কয়েক বছরে ডলার প্রতারণার মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানান সিআইডি কর্মকর্তারা।
