গদ্যলেখক কবিতার কাছে

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২১, ১০:৫১ পিএম

মতি নন্দী জানতে চাইলেন, ‘কবিতা পড়েন না? গল্প লেখার সময়ে?’ চমকে তার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন দেবেশ রায়। আর ভেবেছিলেন, সে কী, তার এত গোপন কথা মতি নন্দী জানলেন কী করে? দেবেশ রায় কবিতা পড়ার বিষয়টা স্বীকার করতেই মতি জানিয়েছিলেন, ‘আমি তো কবিতাই পড়ি শুধু, গল্প শেখার সময়ে, বিষ্ণু দে।’ জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে ‘গন্ধের কথাও তুলিনি’ শিরোনামে দেবেশ রায় লিখেছেন, মতি নন্দীর বিষ্ণু দে-অনুরাগের ফল তার একটি গল্পের শিরোনাম ‘তাপের শীর্ষে’, বিষ্ণু দের কবিতা থেকে।

এখানে গল্পলেখক মতি নন্দী বা দেবেশ রায়ের সাহিত্যিককৃতি আলোচ্য নয়। বরং, দুজন তরুণ লেখক একে অন্যের সঙ্গে তাদের গল্পলেখার সেই সূচনার দিনগুলোতে যে আলাপ করছেন, সেখানে তাদের গদ্যযাত্রায় কবিতা পড়া কোনো সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে কি না সেটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা। দেবেশ রায় লিখেছেন, ১৯৫৬ সালে সেই মুহূর্তে দুজন ‘পরিচয়’ অফিস থেকে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজের দিকে আসছেন। দুজনেরই ‘দেশ’ ও ‘পরিচয়’-এর মতন কাগজে একাধিক গল্প প্রকাশিত হয়েছে ও হবে। দেবেশ রায় এখানে মতি নন্দীর সে সময়ের ‘বেহুলার ভেলা’ নামের বিখ্যাত গল্পটির কথা উল্লেখ করছেন।

কথাসাহিত্যিক যাত্রায় কবিতাপাঠক গদ্যলেখক বিষয়টি নিয়ে ভাবা যেতে পারে। কবিতার ভাষা, এখানে ‘ভাষা’ বলতে বাংলা ইংরেজি আরবি ফারসি যেমন ভাষা, সে ভাষা যে নয়, সে কথা ব্যাখ্যারও প্রয়োজন নেই। তবে আর একটু এগিয়ে বললে কবিতার পঙ্ক্তিতে যে কাব্যভাষা, সেই ভাষা কি গদ্যলেখকের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করে? নিশ্চয়ই করে, অন্তত বাংলা গদ্যের প্রধান কারিগরদের কাহিনীগদ্যের যাত্রাপথকে নজর রাখলে বিষয়টি খানিক ধরাও পড়ে।

কিন্তু এখানে, একটু আগের কথা আবার মনে রাখা প্রয়োজন, এই ভূমিকা পালন প্রভাবকের কিন্তু কাহিনীগদ্যকে প্রভাবিত করে তা কোনোভাবেই গদ্যকে কাব্য আক্রান্ত করার কথা তোলা হচ্ছে না। সেটি কোনো গদ্যলেখকের ক্ষেত্রে যদি ঘটে থাকে, সে আলোচনা একেবারেই ভিন্ন, এখান থেকে সে বিষয়টি দূরের ও একেবারেই ভিন্ন আলোচনা। বরং, বাংলা কথাসাহিত্যের পঞ্চাশের দশকের দুজন প্রধান কথাসাহিত্যিকের পারস্পরিক সংলাপের ভেতর দিয়ে বুঝে নিতে চেয়েছি যে, এই ‘কবিতা পড়া’ বিষয়টি গদ্য লেখকদের ক্ষেত্রে একটি সহজাত প্রক্রিয়া কি না?

‘কপালকুণ্ডলা’র প্রতিটি অধ্যায়ে একটি করে শীর্ষউদ্ধৃতি আছে। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইংরেজি ভাষার প্রধান কবিদের প্রত্যেকের দুটি-চারটি পঙ্ক্তি ব্যবহার করেছেন। যেমন: শেক্সপিয়র, বায়রন, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রমুখ। বঙ্কিমচন্দ্রের ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল, কিন্তু ওই জগদ্বিখ্যাত ইংরেজ কবিদের পাশে তিনি কোনো কোনো অধ্যায়ের ওপরে ব্যবহার করেন মাইকেল মধুসূদনের পঙ্ক্তিও। বঙ্কিমচন্দ্রের এই ব্যবহার অতি সচেতনভাবে, জীবদ্দশায় কোনো কোনো উপন্যাস তিনি অন্তত বারো-চৌদ্দবার সংস্কার করেছেন, ফলে তার এই মধুসূদন প্রীতি কোনো বাড়তি ঝোঁক আর স্বাদেশিকতার আলগা উদ্বোধন নয়। এদিয়ে একটি বিষয় অন্তত নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তিনি তার এই অগ্রজ কবির ইতিপূর্বে প্রকাশিত কাব্যকৃতি সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা রাখতেন বলেই সেগুলো তার উপন্যাসের কোথায় প্রযুক্ত হতে পারে এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন।

নিজের কালের আগেকার কবিতা সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা নিয়ে ‘আধুনিক সাহিত্য’, ‘সাহিত্য’, ‘সাহিত্যের পথে’, ‘সাহিত্যের স্বরূপ’ এই বইগুলোয় খোঁজখবর পাওয়া যায়, তবে কালীদাস আর বৈষ্ণব কবিতার প্রতি রবীন্দ্রনাথের ঝোঁক কমবেশি জীবনের সব পর্বেই বহমান ছিল। ‘সোনার তরী’ থেকে তিনি নিয়মিত কাহিনীগদ্য লিখতে শুরু করেন, এবং পাঠক ও সমালোচক ওই পর্বের ‘সোনার তরী’র সঙ্গে ‘গল্পগুচ্ছ’র প্রথম পর্ব আর ‘ছিন্নপত্রবলী’র পাঠকে কখনো মিলিয়ে দেখেন, কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই কারও খেয়াল থাকে না, তিনি রবীন্দ্রনাথ, গদ্যভাষার ক্ষেত্রে তার দখলদারি এতটাই সার্বভৌম যে নিজের একই দিনের ভিন্ন লেখায় তিনি গদ্যও যে আমূল পালটে দিতে পারতেন, সেটি গীতিকবিতায় শব্দ ব্যবহারের অভূতপূর্ব ক্ষমতার কারণে।

ঠিক এর পরের পর্বের লেখকদের, এখানে প্রধান কথাসাহিত্যিকদের, তারা নিজেদের গদ্যরচনার ক্ষেত্রে কবিতার কাছে ভাষার সেই আশ্রয় খুঁজতেন কি না, সে কথা স্থিরভাবে জানা যায় না। তবে কারও কারও প্রথম জীবনে কাব্যচর্চার কিছু নিদর্শন অবশ্য আছে। তারাশঙ্করের প্রথম বই কাব্য, মানিকের কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে মৃত্যুর পরে। বিভূতিভূষণের গদ্যভাষায় এলানো বিষয়টা বলা হয়, কিন্তু ওই জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত এমন এক গদ্য, সেখান থেকে লেখকের সচেতন প্রয়াসটি তিনি সচেতনে লেপে পুছে নিয়েছেন যে গদ্যলেখক হিসেবে তার অনন্যসাধারণ ক্ষমতার প্রকাশ সেখানে। ওদিকে ‘কবি’ উপন্যাসের লেখককে কেউ বলেন কবি, আর ‘দিবারাত্রির কাব্য’ কারও কারও কাছে গদ্য কাব্য, প্রতি ভাগের শুরুতে একটি করে কবিতা আছে।

একটু ভিন্নভাবে ভাবলে, বিশ শতকের বিশ ও তিরিশের দশকে রবীন্দ্রনাথ কবি ও গীতিকবি হিসেবে বাংলা ভাষায় এমনই প্রভাববিস্তারী যে সে সময়ের কথাসাহিত্যিকের কলমে অজ্ঞাতসারে ওই কাব্যভাষার ছাপ ঢুকে পড়া স্বাভাবিক। তা ছাড়া, প্রধান গদ্যলেখকদের গদ্যেও অমোচনীয় ছন্দ থাকে। এটাকে কবিতার ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় গদ্যছন্দ বলে কি-না জানি না। কিন্তু একটু খেয়াল করে পড়লেই বোঝা যায়, তিনি সংক্ষিপ্ত কিংবা দীর্ঘ যেভাবেই বাক্য লিখুন না কেন, ক্রিয়াপদকে এমন একটি জায়গায় বসান যে ওই গদ্য ছন্দ সাম্য রক্ষা করে চলে। আবার একই ধ্বনির ক্রিয়াপদ দিয়ে একটি বাক্য শেষ করলে যে কানে লাগে, সেটা কবিতার অন্ত্যমিলের কথা মনে করিয়ে দেয়, সেই সচেতনতাও থাকে সেখানে। ওসব বাক্যর দিকে নিবিড়ভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, সমকালীন কিংবা এর আগেকার কাব্যভাষার কাছে তার ঋণ আছে। এখানে গদ্যলেখক কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক ও আবদুল মান্নান সৈয়দকে পাশে সরিয়ে রাখা যাক। কিন্তু এই তর্কেও শামিল হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, তাহলে রবীন্দ্রনাথ কেন এলো। সে কথা একটু আগে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পরেও বলা যেতে পারে।

বাংলা গল্প-উপন্যাসের শিরোনামের ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত যত রবীন্দ্র পঙ্ক্তি ব্যবহৃত হয়েছে তা দিয়ে একখানা পুষ্ট বইও বেরিয়েছে। একই সঙ্গে মনে রাখা যাক নিকোলাই গোগল সম্পর্কে দস্তয়েভস্কির উক্তি, আমরা সবাই বেরিয়েছি তার ওই ওভারকোটের পকেট থেকে সে কথার অনুসরণে হুমায়ূন আহমেদ কোনো-এক টেলিভিশনে বলেছিলেন, আমরা সবাই বেরিয়েছি রবীন্দ্রনাথের জোব্বার পকেট থেকে।

পশ্চিম বাংলার পঞ্চাশের দশকের দুজন কথাসাহিত্যিকের উদাহরণ দিয়ে শুরু হয়েছিল এই লেখা। সেই পঞ্চাশের দশকেই প্রয়াত হন প্রায় অজ্ঞাত এক নিঃশব্দ কবি জীবনানন্দ দাশ। তার কবিতা বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার কথাসাহিত্যিকের গদ্য ভাষায় কী প্রভাব বিস্তার করেছে, সেটি দুই অঞ্চলের ষাট ও সত্তরের দশকের কথাসাহিত্যের দিকে একটু খেয়াল করলেই বুঝে নেওয়া যায়। তত দিনে পঞ্চাশের লেখকেরা স্বীকৃতি পেয়েছেন, ষাটের গদ্যলেখকেরা তারুণ্যে ঝলমল। আমাদের এখানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, কায়েস আহমেদের ভাষায় ধরা পড়ে, কবিতার পাঠক হিসেবে তারা তাদের গদ্যভাষার জন্য রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের কাছে কোন ঝোঁকে নিজেদের নিয়ে যেতেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তো একবার একেবারে গোড়া থেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েছিলেন ছন্দের ভুল ধরবেন বলে। অর্ধেকের মতন এগিয়ে বাদ দিয়েছিলেন সেই ব্যক্তিগত প্রকল্প। কিন্তু তাতে গদ্যভাষার ছন্দ যে ভীষণ সমৃদ্ধ হয়েছে, তা তার দীর্ঘ বাক্যগুলো নিয়ন্ত্রণের মুনশিয়ানায় বোঝা যায়।

মাহমুদুল হকের বিক্রমপুরের পটভূমিতে লেখা উপন্যাসে, আর অনুর পাঠশালায় আছে জীবনানন্দীয় কাব্য পঙ্ক্তির এক বিপরীত চলন, কিন্তু বিষণœ গড়ানো দুপুর আর শালুকভরতি জলে যে জীবনানন্দীয় খেলা করেছে মগ্নতা তা বোঝা যায়। কায়েস আহমেদেরও জীবনানন্দ মুগ্ধতা, বইয়ের লাশকাটা ঘর নামকরণেই শুধু নয়, কোনো কোনো গদ্যের ‘পরাবাস্তব’ আবহও ওই কবির মগ্ন পাঠককে মনে করায়। যদিও তাদের কারও লেখাই কোনোভাবেই কাব্য আক্রান্ত নয়, প্রচলিতভাবে ‘কাব্য করা’ কথাটার সঙ্গে এক ধরনের কোমলতার খোঁজও করা হয়, সেখানে ‘হাইড্রান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল’ কিংবা, ‘আমি যেন সেই বাতিওয়ালা, যে সন্ধ্যায় রাজপথে-পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য,’ কিংবা, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়’ মতো পঙ্ক্তির ‘কঠোরতা’ গদ্যেরও এক কাঠি ওপরে।

এখানে গদ্যভাষায় কাব্য পঙ্ক্তির কিংবা কাব্যভাষার প্রভাব বলা হয়নি। একেবারে শেষে এসেও এ কথাটা আবার বলতে হচ্ছে। বলার চেষ্টা করা হয়েছে, কোনো ভাষার কবিতা বা প্রধান কবিতা সেই ভাষার চলমান কাহিনীগদ্যের ভেতরে অতি সূক্ষ্মভাবে হলেও প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে কি না। তা তো করেই। তাই গল্প লেখার সময়ে অথবা গল্পলেখার সময়ে না-হলেও গদ্যলেখককে কবিতার কাছে যেতে হয়! শব্দের সর্বসাম্প্রতিক অবস্থা কবিতায় ধরা পড়ে, গদ্যে সময়!

লেখক কথাসাহিত্যিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত