প্রকল্প বাস্তবায়নে অনীহা

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২১, ১০:০৭ পিএম

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ধীরগতি প্রায় অনিরাময়যোগ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রত্যেক প্রকল্পেই শ্লথগতির অভিযোগ আসে। কিন্তু প্রকল্প গ্রহণের তিন বছর পরও কাজ শুরু না হওয়াকে কী বলে চিহ্নিত করা সম্ভব? খুলনা নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য তিনটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কথা জানা গেল দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি খবর থেকে। একনেকে অনুমোদনের সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণই শুরু হয়নি। জানা গেছে, খুলনা নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য তিনটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পায়। প্রায় ৩৯৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। অথচ সড়ক তিনটির জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণই এখনো হয়নি। ফলে প্রকল্পটি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অথচ নগরবাসীর যোগাযোগ দুর্ভোগ নিরসনে এই সংযোগ সড়কগুলো নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের তিনটি সংযোগ সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নে যে গড়িমসি লক্ষ করা যাচ্ছে, তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক ও হতাশার।

প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যাচ্ছে, নতুন নতুন প্রকল্পের অনুমোদন মেলে, বিল ছাড়ও হয়। বাস্তবে অগ্রগতি হয় না খুলনা উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর। খুলনা নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সরাসরি সিটি বাইপাস সড়কে সংযুক্ত হতে একটি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রায়ের মহল পর্যন্ত একটি এবং দৌলতপুর কৃষি কলেজ (পুরাতন সাতক্ষীরা রোড) থেকে বাস্তুহারা পর্যন্ত আরেকটি সংযোগ সড়ক নির্মাণে পরিকল্পনা গ্রহণ করে খুলনা উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ। এর মধ্যে প্রথম সড়কটি নিরালা ১ নম্বর সড়ক হয়ে দিঘির পাশ দিয়ে সোজা বাইপাসে গিয়ে মিশবে। এ সড়কটি হবে আড়াই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রায়ের মহল পর্যন্ত দ্বিতীয় সড়কটি ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং দৌলতপুর কৃষি কলেজ (পুরাতন সাতক্ষীরা রোড) থেকে বাস্তুহারা পর্যন্ত তৃতীয় সড়কটি ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার হওয়ার কথা। তিন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দেখাশোনা জন্য ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পিকআপ কেনা হয়েছে, যা এখন অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া রড পরীক্ষায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ হাজার কেএন ক্ষমতার একটি ইউটিএম মেশিন কেনা হয়েছে, যা সংস্থাটির গ্যারেজে প্যাকেটবন্দি হয়ে পড়ে আছে। জমি অধিগ্রহণের আগেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ ধরনের সড়ক সম্পর্কে ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের’ জন্য বিদেশ সফরও করেছেন। কিন্তু এতসব কিছু হলেও মূল সড়ক নির্মাণকাজই এখনো শুরু করা যায়নি। শুধুই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সড়কের অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তনে তৎপরতা বেড়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম কি চলতেই থাকবে? সরকারি প্রকল্পগুলোতে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা জনগণের অর্থ। জনগণের অর্থের এই অপচয় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ সব মন্ত্রণালয় তাদের অধীন সব প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবে, এটাই প্রত্যাশিত। বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। একদিকে খরচ বৃদ্ধির কারণে যেমন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তেমনি এই প্রকল্পের ব্যাপারে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অবস্থানও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে সরকারি প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ার এক প্রবণতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নেই। পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত, কিন্তু তা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে গাফিলতি ও দুর্নীতি করার চরম মানসিকতা কাজ করে। যার কারণে কেনাকাটা ও বিদেশ সফরে অতি আগ্রহ দেখান কর্মকর্তারা। ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। তাই প্রকল্পে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা উচিত। একটি প্রকল্পে ৩-৪ বার করে মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তি এই টাকা জনগণ দেবে। কিছু ঠিকাদার ও অসাধু কর্মকর্তা ভাগ করে খাবে। এতে অর্থের অপচয় হয় ঠিকই কিন্তু জনগণের ভোগান্তি উল্টো বাড়ে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৭০ শতাংশ প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয় না। মূলত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের লোভের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন অবস্থা বিরাজ করছে। এসব ঘটনায় দেখা যায় নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মপরিধি বৃদ্ধির নামে কৌশলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু এর পেছনে থাকে অন্য উদ্দেশ্য। কারণ, প্রকল্প যত দিন চলবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তত দিন সুবিধা নিতে পারেন। তাই নতুন নতুন প্রকল্পে আকর্ষণের শেষ নেই। প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার, ভাতা নেওয়াসহ নানা সুবিধার কারণে সংশ্লিষ্টরা চান না দ্রুত প্রকল্প শেষ হয়ে যাক। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আরও জবাবদিহি, মনিটরিং ব্যবস্থা ও ক্ষেত্র বিশেষে শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত