আফগানিস্তানে আইএস-তালেবান ও অন্যান্য দ্বন্দ্ব

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২১, ১০:২৯ পিএম

কাবুল বিমানবন্দরে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার তৎপরতার মধ্যে ২৬ আগস্ট আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্রাণ হারালেন আফগান নাগরিক এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ শতাধিক মানুষ। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আফগান সহযোগী ইসলামিক স্টেট ইন খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি) এই নৃশংস হামলার দায় স্বীকার করেছে। এভাবে নিজেদের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরে নিয়ে এসেছে সংগঠনটি।

বিদেশি গণমাধ্যমগুলো মাত্র অতিসম্প্রতি এই গোষ্ঠীর দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করলেও আইএসকেপি ২০১৫ সাল থেকেই আফগানদের আতঙ্কিত করে আসছে। ৩১ আগস্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরও তারা তা অব্যাহত রাখবে। এই হামলায় বিবেচনা করার মতো দুটি দিক আছে। প্রথমত, আইএসকেপি মূলত তার প্রতিদ্বন্দ্বী তালেবানের বদনাম করার জন্যই বিমানবন্দরে হামলা করেছে। এ ঘটনা সুন্নি চরমপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বৃহত্তর দ্বন্দ্ব আরেক দফা তেতে ওঠারই এক নমুনা।  দ্বিতীয়ত, আইএসকেপি এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তালেবান তার শাসনাধীনে বেসামরিক লোকজন, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা রক্ষা করা তাদের জন্য কঠিন হবে।

অ-রাষ্ট্রীয় সুন্নি পক্ষগুলোর দ্বন্দ্ব

আইএসকেপিসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের ছত্রী সংগঠন আইএস-এর উত্থানের জন্য অনেকেই আরব বিশ্ব থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক আবহ এবং সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্বকে দায়ী করে থাকেন। এ অঞ্চলে সহিংস দ্বন্দ্বের জন্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনাকেই দায়ী করার সমস্যাটি হচ্ছে, এতে করে আইএস-এর সুন্নিদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়ার দীর্ঘ ও রক্তাক্ত অতীতকে উপেক্ষা করা হয়।

২০১৪ সালে সিরিয়ায় আল-কায়েদা থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটি গোষ্ঠী গঠন করেছিল আইএস। তারা তখন তাদের মূল সংগঠন এবং এর সিরিয়ার সহযোগী জাবহাত আল-নুসরার ওপর হামলা চালিয়েছিল। আবার ২০১৫ সালে আইএসকেপি গঠিত হয়েছিল মূলত আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান উভয় অংশের তালেবান ছেড়ে আসাদের হাতে। তারা তখন আফগান শাখার ওপর হামলা চালায়। উভয় ক্ষেত্রেই দলত্যাগীরা মনে করত তাদের সাবেক সংগঠন যথেষ্ট চরমপন্থি নয় কিংবা সুন্নি হিসেবে পরিচিত কিছু লোকের ওপর (তাদের ভাষায় ‘আসলে পথবিচ্যুত বা শিয়া মুসলিম’) আক্রমণ করার জন্য যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।

একদিকে আইএস এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো এবং অন্যদিকে আল-কায়েদা এবং তালেবানের মধ্যে দ্বন্দ্বে সুন্নিদের নিজেদের বিরোধের বিষয়টি প্রায়শই আড়ালে পড়ে থাকে। সিরিয়া এবং আফগানিস্তান উভয়ই নিরাপত্তাহীনতার অঞ্চল যা অনেক ধরনের চরমপন্থি পক্ষ, বিশেষ করে ধর্মীয় যুদ্ধবাজ নেতাদের গড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে। এই অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলো মতাদর্শগতভাবে খুব কাছাকাছি বলে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা বহাল থাকা পর্যন্ত তাদের বৈধতা হুমকির মুখে থাকবে। এ কারণে তাদের অবিলম্বে নির্মূল করতে হবে। সহিংস প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করা গেলে বিজয়ীরা জিহাদি বয়ানকে একচেটিয়া করার পাশাপাশি নতুন সদস্য সংগ্রহে সুবিধা পাবে। যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করার পরিপ্রেক্ষিতে তালেবানের সঙ্গে এই দ্বন্দ্বের জন্যই প্রস্তুত হচ্ছে আইএসকেপি। আইএসকেপির সদস্যসংখ্যা মাত্র দুই হাজারে নেমে এলেও এটি আনুমানিক ৬০ হাজার সদস্যের তালেবানের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। বাহিনীর সদস্যরা সারা আফগানিস্তানে ছড়িয়ে পড়লে তালেবানের উপস্থিতি কিছুটা হালকা হয়ে যাবে। এতে করে তালেবান তার এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া উপদলের সহিংস সন্ত্রাসবাদী কৌশলের ঝুঁকির মুখে থাকবে।

শিয়াবাদ বিরোধিতা এবং নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান উভয় স্থানের তালেবানের শেকড় প্রোথিত দক্ষিণ এশীয় ইসলামি পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন রক্ষণশীল দেওবন্দি মতাদর্শের মধ্যে। ১৯৮০-এর দশকে মূল দেওবন্দি আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তানে গঠিত হয় সিপাহ-ই-সাহাবা সংগঠনটি। এর লক্ষ্য ছিল প্রধানত শিয়াবিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করা। একটি গ্রুপ ১৯৯০ এর দশকে লস্কর-ই-জাংভি নাম নিয়ে এই দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লস্করের দাবি ছিল, তাদের মূল গ্রুপ আদি শিয়া-বিরোধী প্ল্যাটফর্ম থেকে সরে গেছে। আবার এই গোষ্ঠীরও অনেকে আরও বেশি কঠোর শিয়াবিরোধী প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে পরে যোগ দেয় আইকেএসপিতে।

এই গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতার মূল শিকার হয়েছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে বসবাসকারী জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হাজারা যারা ধর্মবিশ্বাসে শিয়া মুসলিম। সম্প্রদায়টি ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন আফগান শাসকের নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবদুর রহমান খান যিনি ১৮৯০ এর দশকে হাজারাদের সম্পূর্ণভাবেই নির্মূল করতে চেয়েছিলেন। তার এক শতাব্দী পরে এই সম্প্রদায়টি আবার ক্ষমতা দখলে উন্মুখ তালেবানের সহিংসতার শিকার হয়। ১৯৯৮ সালে তালেবান তাদের যোদ্ধাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে মাজার-ই-শরিফে কয়েক হাজার হাজারাকে হত্যা করে। তার এক বছর আগেই শহরটি দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল তালেবান।

আইএসকেপির আবির্ভাবের পর হাজারা সম্প্রদায় তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সংগঠনটির ভয়াবহ হামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাবুলের শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার একটি মাতৃসদনে ২০২০ সালের মে মাসের গণহত্যা। এতে নবজাতক শিশু এবং প্রসূতি মা-সহ ২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। তারা এক বছর পরে ২০২১ সালের মে মাসে একই এলাকার একটি স্কুলে হামলা চালায় যাতে কমপক্ষে ৯০ জন প্রাণ হারায়। নিহতদের অধিকাংশই ছিল স্কুলছাত্রী।

এসব ঘটনাকে কিন্তু ‘সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব’ বলা ভুল হবে। কারণ ‘দ্বন্দ্বের’ ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে সমতার ইঙ্গিত থাকবে। ‘দ্বন্দ্ব’ বললে শিয়াবিরোধী মনোভাবের পাশাপাশি বিদ্যমান জাতিগত বিদ্বেষও ধামাচাপা পড়ে। দীর্ঘদিন ধরেই

আফগানিস্তানের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী হাজারাদের দেশটির আদিবাসী মানতে অস্বীকার করে আসছে যা আসলে ভুল। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত আফগান সরকারের হাজারাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার মধ্যেও এ মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে। বস্তুত, এ সরকারের কেউ কেউ সম্প্রদায়টির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন বলেই সবার জানা।

তালেবান নেতারা বারবার বলেছেন, সংখ্যালঘু এবং নারীদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। নেতারা তাদের যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আদেশ অমান্য করলে ব্যবস্থা নিতে পারবেন কি না তাই দেখার বিষয় এখন। এ মুহূর্তে যেটা নিশ্চিত তা হলো, তালেবানের জন্য আইএসকেপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আফগান সমাজ ও নিজের বাহিনীর বেশি চরমপন্থিদের মধ্যে সংগঠনটির প্রতি আকর্ষণ দূর করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২৬ আগস্টের রক্তাক্ত হামলা বাইডেন প্রশাসনকে প্রতিশোধ নিতে বাধ্য করবে। শেষ পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ সামরিক প্রত্যাহারের বর্তমান পরিকল্পনা জটিল করে তুলবে, এমনকি হয়তো খোদ তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

আল জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

লেখক ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, স্যান মার্কোসের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত