আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন

‘গুম’ হওয়া স্বজনদের ফিরে পেতে আকুতি

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২১, ০২:০১ এএম

আট বছর আগে নিখোঁজ হওয়া রাজধানীর তিতুমীর কলেজের ছাত্র আবদুল কাদের মাসুমের মা আয়েশা আলী এখনো প্রতীক্ষায় আছেন ছেলের ঘরে ফেরার। তার সেই প্রতীক্ষা যেন আর শেষ হয় না। তবে কি এই প্রতীক্ষার অবসান কখনই হবে না, ছেলে কি আর ঘরে ফিরবে না এই প্রশ্ন মনে নিয়ে এখন দিন-রাত কাটে মাসুমের মায়ের। শুধু মাসুমের মা আয়েশা আলী একাই নন, একইভাবে দিন কাটে নিখোঁজ হওয়া আরও অনেক পরিবারের। বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেখানে তারা তাদের নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে পেতে আকুতি জানান।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকে তাদের নিখোঁজ স্বজনের ছবি সঙ্গে নিয়ে আসেন। কারও বুকে ছিল সন্তানের ছবি, কারও বুকে বাবার ছবি, আবার কারও বুকে ভাইয়ের ছবি। সভায় নিজেদের দুঃসহ কষ্টের কথা তুলে ধরেন নিখোঁজদের স্বজনরা। তারা প্রতিটি ‘গুমের’ ঘটনাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন।

স্বজনরা নিখোঁজদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তা না হলে তাদেরও ‘গুম’ করার আহ্বান জানান। নিখোঁজ একজনের স্বজন বলেন, ‘রাজনীতি করলেই তাকে গুম করতে হবে কেন? আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিন। স্বজন হারিয়ে আমারা দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছি। তাদের খুঁজে বের করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিন।’

নিখোঁজ হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের মেয়ে হাফসা ইসলাম বলেন, ‘আমি একই জায়গায় আট বছর ধরে দাঁড়িয়ে আমার বাবাকে খুঁজছি। কেউ আমার বাবার খোঁজ দিচ্ছে না। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলছি, আমি আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমার বাবা বেঁচে আছে না মরে গেছে আমি জানি না। আমার ছোট বোন বাবাকে কখনো দেখেনি। আমি শুধু আমার বাবাকে ফেরত চাই। এ জায়গায় দাঁড়িয়ে আর বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আকুতি জানাতে চাই না। আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’

নিখোঁজ হওয়া তিতুমীর কলেজের ফাইন্যান্স বিভাগের ছাত্র আবদুল কাদের মাসুমের মা আয়েশা আলী বলেন, ‘আশায় বুক বেঁধে আছি, এক দিন ছেলে আমার কোলে ফিরে আসবে। মা বলে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু সেই প্রতীক্ষা যেন আর শেষ হয় না। তবে কি এই প্রতীক্ষার অবসান কখনই হবে না, ছেলে কি ফিরবে না?’

মিরপুর এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বাতেন নিখোঁজ হন ২০১৯ সালের জুনে। তার মেয়ে আনিসা ইসলাম বলেন, ‘বাবাকে ফিরে পেতে আর কত বছর লাগবে জানি না। আদৌ ফিরে পাব কি না, সেটাও বলতে পারছি না। বাবা বেঁচে আছেন কি না, এটাও আমরা বলতে পারছি না। আমি জানতে চাই, আমার বাবা বেঁচে আছেন কি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই অনুরোধ, তিনি যেন আমার বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।’

অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘আজ শুধু দেশের অভ্যন্তরে গুম হচ্ছে না। এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশে। পরে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরেক জায়গায়। এই যে আন্তঃদেশীয় ব্যবস্থা, এটা কখনই রাষ্ট্রীয় সম্মতি ছাড়া সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে এসব ঘটনা তদন্তে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। কমিশন তথ্য অনুসন্ধান করবেন, তদন্ত করবেন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনবেন।’

সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে আসে, গুম কারা করে? এই গুম সরকারি বাহিনী করেছে, সরকার করেছে, এটা বিশ্বাস করার বহু কারণ রয়েছে। যদি গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সরকারি বাহিনী না করে থাকে, তাহলে যারা গুম হয়েছেন, তাদের খুঁজে বের করছেন না কেন। কেউ কেউ তো গুম হয়েছেন ১০-১২ বছর হয়ে গেছে।’

সভায় নিখোঁজদের পরিবারকে সহমর্মিতা জানাতে এসেছিলেন মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ দেন। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। এদের মধ্যে ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত