চট্টগ্রাম নগরীতে এখন দিনে পানির চাহিদা ৪২ কোটি লিটার। চট্টগ্রাম ওয়াসা সর্বসাকল্যে উৎপাদন করছে ৩৬ কোটি লিটার। এই উৎপাদিত পানিরও ২৯ থেকে ৩০ শতাংশ (১১-১২ কোটি লিটার) অপচয় হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মিটার রিডার যোগসাজশে এ অপচয়কে ‘সিস্টেম লস’ দেখিয়ে প্রতি মাসে কোটি টাকার পানির বিল হাতিয়ে নিচ্ছেন। ফলে বারবার আলোচনায় এলেও অদৃশ্য কারণে পানির অপচয় রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও, তা ফাইলেই বন্দি রয়েছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরীর ৮১ হাজারের বেশি গ্রাহকের দৈনিক চাহিদা ৪২ কোটি লিটার পানি। বর্তমানে তিনটি শোধনাগার ও বিভিন্ন গভীর নলকূপের মাধ্যমে দৈনিক ৩৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু সিস্টেম লসের কারণে আগে যেখানে ৩৪-৩৫ শতাংশ উৎপাদিত পানির অপচয় হতো, এখন তা কমে ২৯-৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। পুরোপুরি সিস্টেম লস কমানো সম্ভব নয়। তবে সিস্টেম লস সিঙ্গেল ডিজিটে আনার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরো নগরীকে আমরা ১০০টি অঞ্চলে ভাগ করে স্মার্ট মিটারের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি এলাকায় স্মার্ট মিটার বসানোর দরপত্র আহ্বান করা হবে। আর সিস্টেম লসের নামে পানির বিল হাতিয়ে নেওয়ার কাজে ওয়াসার কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীতে দৈনিক প্রায় ৪২ কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৩৬ কোটি লিটার। এ হিসাবে কাগজে-কলমে প্রায় ৬ কোটি লিটার পানির চাহিদা মেটাতে পারছে না সংস্থাটি। এ অবস্থায় সিস্টেম লস দেখিয়ে ১১ কোটি লিটার পানি অপচয় দেখানোর বিষয়কে বিল হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছেন নগরবাসী। ওয়াসার বোর্ড সভা দুই বছর আগে সিস্টেম লস কমাতে একটি তদন্ত কমিটি করেছিল। তবে সেই কমিটির প্রতিবেদন এখনো আলোর মুখ দেখেনি। মূলত মিটার ও পাইপ নষ্ট হওয়ায় বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় হচ্ছে। এই সিস্টেম লস ঠেকাতে ডিএমএ (ডিস্ট্রিক্ট মিটারিং এরিয়া) সিস্টেম ও স্মার্ট মিটার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ডা. শেখ শফিউল আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়াসার বোর্ডের প্রতিটি সভায় পানির অপচয় কমাতে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। বর্তমানে সিস্টেম লস অনেক কমে এসেছে। এটি পুরোপুরি কমানো গেলে সংস্থার জন্যই ভালো হবে। চলমান প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।’
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে বর্তমানে মোট সংযোগ রয়েছে ৮১ হাজার ৭১৭টি। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ৮৮৪টি আবাসিক সংযোগ এবং ৭ হাজার ৮৩৩টি বাণিজ্যিক সংযোগ। বর্তমানে আবাসিক খাতে প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম ১২ টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক খাতে প্রতি ইউনিটে ৩০ টাকা ৩০ পয়সা বিল নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম ওয়াসা তালিকাভুক্ত এসব সংযোগের বাইরেও হাজারো গ্রাহককে পানি সরবরাহ করে। এতে ওয়াসার একাধিক অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মিটার রিডার জড়িত। তারা দৈনিক মোট উৎপাদিত পানির ২৯-৩০ শতাংশ সিস্টেম লস দেখিয়ে অবৈধভাবে বিক্রি করে। এতে দিনে গড়ে ১১-১২ কোটি লিটারের বেশি পানি বিক্রির টাকা অবৈধভাবে তাদের পকেটে যায়। এ ছাড়া মিটার নষ্ট দেখিয়ে দীর্ঘদিন মিটার রিডাররা লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। সিস্টেম লসের কারণে সরকার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা এ এস এম শাহেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিস্টেম লস কমাতে আমরা সজাগ রয়েছি। সিস্টেম লস সিঙ্গেল ডিজিটে আনাই আমাদের লক্ষ্য। নগরীতে ডিএমএ সিস্টেম চালু হচ্ছে। এরপর সিস্টেম লস পুরো নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কারণ, ডিএমএ চালু হলে কোন ওয়ার্ডে কত গ্রাহকের কাছে কী পরিমাণ পানি সরবরাহ হচ্ছে, তা নিমেষে জানা যাবে, যা এখন জানা সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর বাইরে নগরীতে প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ৩০০ স্মার্ট মিটার বসানোর বিষয় প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। পানির সংকট নিয়ে অভিযোগও আর থাকবে না।’
