প্রতিষ্ঠান প্রচার প্রতিষ্ঠা

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৩৭ পিএম

সাহিত্যে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্য কতটা জরুরি? এখানে বিষয়টা প্রশ্ন হিসেবেই উত্থাপিত, যদিও উত্তরও হয়তো সবারই জানা, আর তা প্রত্যেকের কাছে এক-এক রকম। বাংলা সাহিত্যের বেশি দূরের ইতিহাসে ঢুঁ মারার প্রয়োজন নেই। অত দূরে গেলে হয়তো সবই তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে। শুধু মনে রাখা যাক, মধুসূদন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত প্রায় সবাই বিত্তে সম্পন্ন পরিবারের সন্তান, ফলে তাদের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠায় তা সহায়ক কি না সে প্রশ্ন একেবারেই ভিন্ন প্রসঙ্গ, কিন্তু বই ছাপানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তাতে সেই সময়ে কার কী প্রতিষ্ঠা হয়েছে কী হয়নি, সেটিও আলোচ্য নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিজের বই নিজেই ছাপাতেন, আর তা বিক্রিও হতো দেদার, ফলে ইংরেজের চাকরি ছেড়েও মধুসূদনসহ অন্যদের সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে কোনো অসুবিধা হয়নি তার। কিন্তু এখানে যে প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্যের প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে, সে সবই বিদ্যাসাগরের ওই সব কর্মকান্ডের মোটামুটি একশ বছর পরের কথা।

কথাটা উঠছে প্রাতিষ্ঠানিকতার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানবিরোধী শিবির থেকে নাকি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো অথবা কোনো একটি সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান যখন তার প্রচারকুশলতার গুণে অথবা শক্তিতে সাধারণ পাঠককে প্রভাবিত করে তার কোলের দিকে টানতে পেরেছিল তার পরে? তাহলে এ বিষয়ে ওসব তারিখেরও কিছু হিসাব নেওয়া প্রয়োজন। সে চেষ্টায় দেখা যাবে, কবিতা ও কথাসাহিত্য মূলত সাময়িকপত্রের বিষয় ছিল দীর্ঘকাল, দৈনিক পত্রিকা মূলত সংবাদই বহন করত, সাহিত্যিক বিষয় সংবাদে পরিণত হলেই তা দৈনিকে জায়গা পেত। রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী প্রধান লেখকদের, এখানে কবি ও কথাসাহিত্যিকদের, লেখা প্রকাশের সূচি দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। দেশভাগ পূর্ববর্তী সেই সময়ে, দৈনিকের রবিবাসরীয় পৃষ্ঠাগুলোয় গল্প-প্রবন্ধ জায়গা পেলেও, তা সেই সময়ে সাহিত্যের পাঠকদের কাছে প্রধান পাঠ্য হয়ে ওঠেনি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনীকারদের মারফত জানা যায়, পূজা সংখ্যায় প্রথম উপন্যাসটি লিখেছিলেন তিনি। সম্ভবত ১৯৪২ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘সহরবাসের ইতিকথা’। তার মানে, এর আগে পর্যন্ত পূজা সংখ্যায় একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস প্রকাশের ধারা ছিল না। তাহলে এই বিষয়টি মাত্র আশি বছর আগের ঘটনা; সেই সময়ে পূজা সংখ্যা বা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যে ঈদ সংখ্যা, সেখানে ছোট আকৃতির যে উপন্যাসরাজি প্রকাশিত হওয়ার রীতি চালু হয়েছে, ওই উনিশ শ বিয়াল্লিশের আগে তা ছিল না। এর আগে বাংলা ভাষার উপন্যাসের যে বিপুল আয়তন তা কোথায় প্রকাশিত হয়েছে? অতি বিখ্যাত কয়েকটির নাম করেই বলা যায়, কপালকু-লা ও কৃষ্ণকান্তের উইল, বিষাদসিন্ধু, গোরা ও ঘরে-বাইরে, পথের পাঁচালী ও আরণ্যক, পদ্মানদীর মাঝি ও পুতুল নাচের ইতিকথা, কবি ও গণদেবতা ইত্যাদি। উত্তর খুবই সোজা, বেশির ভাগই কোনো না কোনো সাময়িকপত্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। হয়তো কোনোটি প্রকাশিত হয়েছে ওসব সামায়িকপত্রের একটি সংখ্যাতে, অথবা কোনো উপন্যাস একবারে বই হয়ে পাঠকের কাছে গেছে। সেটি আয়তনের দিক থেকে ছোট হোক কি বড় যাই হোক। আবার, আনন্দবাজারসহ অন্যান্য দৈনিক কিংবা সাপ্তাহিক ও মাসিকপত্রের পূজা সংখ্যায় উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার ওই ধরন, মাত্র একটি উপন্যাস প্রকাশিত হওয়াতে আটকে ছিল অনেকটা কাল। তবে এর বাইরে সাময়িকপত্রের লেখকদের কোনো গোষ্ঠী বা দল-উপদল, সেখানকার লেখক, লেখকদের ভেতরে সেই উপদলগুলোর দলাদলি যে ছিল না তাও তো নয়, সেগুলো ছিলই (কল্লোল, কালি-কলম, পরিচয়কে মনে রেখে), কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর তকমা বা সিল একেবারে সরাসরি গায়ে লাগতে শুরু করে, তা খুব বেশি হলে পঞ্চাশ বছর আগে। এর আগে প্রতিষ্ঠানের আনুকূল্য ইত্যাদি বিষয়টা অতটা জটিল আকার ধারণ করেনি। হয়তো সে সুযোগও ছিল না। এক অর্থে, মোটামুটিভাবে দৈনিক পত্রিকার নিয়ন্ত্রণের বাইরে সাহিত্যের সুবর্ণকাল ধরে নেওয়া যেতে পারে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগ পর্যন্ত। সেখানে কবিতার নির্দিষ্ট কাগজ ও গোষ্ঠী, গল্পেরও, এছাড়া গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ মিলিয়ে সাহিত্য পত্রিকা, নির্দিষ্ট সাময়িকপত্র আর অল্প আয়ুর লিটল ম্যাগাজিন সবই এ সময়ে এত বেশি বেরিয়েছে, আর সেখানে একই সঙ্গে তরুণ থেকে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের অংশগ্রহণে ভরপুর থাকত যে ওই পুরনো কাগজগুলো কখনো হাতে এলে সেখানে সাহিত্য অন্তপ্রাণ অনেক মানুষের প্রায় ব্যবসায়িক বুদ্ধিশূন্য স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আজও আমাদের বিস্মিত করে।

সেই বিস্ময় কাটল কেন? কিংবা সেই বিস্ময়ের বিপরীতে সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক, যে সম্পর্ক ছাড়া প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব বলেই ঠাওর হতে শুরু হলো, এটা কেন ঘটল? নিশ্চয়ই সাহিত্য বাজারজাতকরণের সঙ্গে এর ভোক্তার ভালোলাগার মন্দলাগার অথবা উল্টোটা ওই ভোক্তাকে ভালো-মন্দের ফারাক কিংবা ভিন্ন রুচির অধিকার দেওয়ার আগে, নিজ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ভাষায় এমনভাবে বুঁদ করে রাখতে হবে যাতে এর বাইরে তার তাকানোর কোনো সুযোগ না ঘটে। ফলে সেই আশি বছর আগে থেকে শুরু হয়ে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর আগে পর্যন্ত, পশ্চিমবাংলায় যে বিষয়টি ছিল বইয়ের বাজার, সাময়িকপত্র, সাহিত্য-রাজনৈতিক বিশ্বাসজনিত গোষ্ঠিতার হাতে, তা ধীরে ধীরে দৈনিক পত্রিকা, এখানে বিশেষত দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর হাতে এসে গেল। আনন্দবাজার পত্রিকা ও এর সহযোগী পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত উপন্যাস ও অন্যান্য রচনা যখন তারাই বই আকারেও বাজারজাত করতে শুরু করলেন তখন ওই নজরগ্রাসী প্রচারেরও প্রয়োজন হলো, কেননা ও সবই তাদের পণ্য আর তা যথাযথভাবে বিপণনের দায়িত্বও তাদের। ওটিই তখন হয়ে উঠল বাংলা সাহিত্যের সর্বেসর্বা সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান। যে ওই প্রতিষ্ঠানের সাহিত্যিক আনুকূল্য পাবেন না, তিনি লেখক হিসেবে দাঁড়াতেই পারবেন যে যেন। এর অর্থ এই নয়, এই পর্বে আনন্দবাজার বা দেশ পত্রিকায় ভালো লেখা প্রকাশিত হয়নি। আবার, হলেও সেই লেখার সবই আনন্দবাজার প্রচারিত সাহিত্যাদর্শের মানদন্ডে জনপ্রিয় হয়েছে তাও নয়। একেবারে নাম করেই বলা যায়। আবার, ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও সাহিত্যিক প্রচারে ওই কাগজগুলোর আনুকূল্য সবাই পেয়েছেন তাও নয়। এসব বড় জটিল হিসাব অথবা ভীষণ জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। তবে আনন্দবাজারের ওই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে কলকাতায়, যাকে বলে সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতারও বিস্তার ঘটে। সেখানেও অসংখ্য যোগ্য কবি ও কথাসাহিত্যিক যুক্ত হন। এমনকি কোনো কোনো দৈনিকও আংশিক ও সর্বত্রভাবে এই আনন্দবাজার আনুকূল্যের বিপরীতে থাকা লেখকদের কোলে টেনে নেন। তবে পশ্চিমবাংলায় ওই সাহিত্যিক বিপণনপ্রক্রিয়া যেমন জোরালো এর বিপরীতে অপ্রাতিষ্ঠানিক সাময়িকপত্র ও লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনও, অন্তত গত এক দশক আগে পর্যন্ত ভীষণভাবে বেগবান ছিল।

সেই স্রোতের ধাক্কা, আমাদের এখানে লাগতে শুরু করে অন্তত আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। যদিও এখানে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর মতন কোনো সাহিত্যিক বাড়ির বা প্রতিষ্ঠানের জন্ম তখনো পর্যন্ত হয়নি। হওয়ার সুযোগও ছিল না। বইয়ের বাজার আর সাহিত্যের বাজার আর এর পেছনে যে প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির প্রয়োজন, এর কোনোটাই তখন ছিল না। থাকার সুযোগও ছিল না। সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা কিংবা জনপ্রিয় লেখাপত্র কিংবা যে কোনো লেখাকে যদি সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজিরও সব সময়েই বড় অভাব। সেটি দাঁড়াতেও সময় লাগে, কিছুটা দাঁড়ালও একসময়ে। একটি-দুটি প্রতিষ্ঠান সেভাবে দাঁড়ানোর মতন আকাক্সক্ষা নিয়ে এসেছিল, হয়তো এখনো আছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গত দশ বছরে সব পাটাতনকে একেবারে উলটেপালটে দিয়েছে। এর আগে বইমেলা কিংবা বই বিপণনের মৌসুমে, যে কোনোভাবে প্রচারসর্বস্বতা দিয়ে একটি বইয়ের ও সেই লেখকের দীর্ঘকালীন সাহিত্যিক যাত্রা কিংবা সাহিত্যিক-কীর্তি থাকুক কি নাই থাকুক এক বিপণন কায়দা চালু হয়েছিল, হয়তো তা এখনো আছে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এর বিপরীতে এতটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছে যে সেখানে ওই কিছুটা সাবেকি কায়দাগুলো এখন আর তেমন হালে পানি পাচ্ছে না। ওদিকে পশ্চিমবাংলার আনন্দবাজার পত্রিকার ও এর প্রকাশিত কথাসাহিত্যের আগের সেই পরাক্রমী দশা নেই। তাদের প্রকাশিত নতুন উপন্যাসগুলো বিজ্ঞাপনের পরেও সংস্করণ কিংবা মুদ্রণহীন থেকে যাচ্ছে। বরং, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বই ভালো বলে প্রচারিত হলে তার বিক্রি বেড়েছে। আবার সর্বত্রই আগেকার, অর্থাৎ গত কয়েক দশক ধরে যে লেখক জনপ্রিয় তারা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন, কারও জনপ্রিয়তা বাড়ছে, আর একেবারেই বুকশেলফ বা প্রকাশকের গোডাউনে পড়ে থাকা লেখকের বই হঠাৎ সামনে আসছে। এই পাটাতনে এসে যুক্ত হচ্ছেন আগে যাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো তারাও। আর, সবমিলে বই বিপণন, সাহিত্যিক পুঁজির কিংবা সাহিত্য বিপণনের মাধ্যমেও নতুন ব্যবস্থা উপস্থিত হয়েছে। ফলে সামনের দিনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতা কোনো লেখককে আপনার বলে প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে, সেই লেখা অনায়াসে ভোক্তাকে কিনিয়ে কিংবা পড়িয়ে নিতে পারবে বলে মনে হয় না। সে জন্য তাদের বিকল্প রাস্তা খোঁজ করতে হবে। পুঁজির ধর্মই তাই, যে কোনো উপায়ে বিকানো, তা হয়তো পেয়েও যাবে। আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক বলে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার যে তরঙ্গ সেখানেও ভিন্ন ঢেউ ততদিনে খেলবে বলে আশা করি। শুধু প্রকৃত লেখকের এখানে এইটুকু মনে রাখলে চলবে, কবজির জোর ছাড়া সাহিত্য কাউকে জায়গা দেয় না। বিজ্ঞাপন আর প্রচার যা দেয়, সাহিত্যের ক্ষেত্রে তা সাময়িক।

লেখক কথাসাহিত্যিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত