ক্যালিগ্রাফিকে বলা হয় জীবন্ত শিল্পকলা। এর সৌন্দর্য, অঙ্কন পদ্ধতি, উপস্থাপনা ও লিপিশৈলীর গভীরতা যেকোনো মানুষকে মোহিত করে। মুসলিম বিশ্বে ক্যালিগ্রাফি বিশেষভাবে সমাদৃত। ক্যালিগ্রাফি নিয়ে লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
ক্যালিগ্রাফি
ক্যালিগ্রাফি এমন শিল্পকে বলা হয়, যাতে চমৎকার সব অক্ষর, শব্দ, প্রতীক ইত্যাদিকে নিখুঁত ও সুন্দর আয়োজনে সাজানো হয়। শব্দ ও হরফের নানা বাঁক সৃষ্টির দক্ষতা, কৌশল ও ভিন্নধর্মী সৃজনশীল নকশা ক্যালিগ্রাফির মূল আকর্ষণ। এ কারণে গবেষকরা আরবি ক্যালিগ্রাফিকে ‘লিভিং আর্ট’ বা জীবন্ত শিল্পকলা বলে অভিহিত করেছেন। আরবি বর্ণমালাকে কেন্দ্র করে ইসলামি লিপিকলার উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ। আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি, আরবি লিপি-বর্ণ হরফ-জের-জবর-পেশের সঙ্গে মুসলমানদের আলাদা আবেগ-অনুভূতি মিশে আছে। অন্যদিকে ইসলামে মানুষ কিংবা প্রাণীর ছবি আঁকা নিষিদ্ধ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই লিপিকলানির্ভর অলংকরণশৈলীর উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
ইংরেজি ক্যালিগ্রাফি শব্দটি গ্রিক ক্যালিগ্রাফিয়া থেকে এসেছে। গ্রিক শব্দ ক্যালোস এবং গ্রাফেইনের মিলিত রূপ ক্যালিগ্রাফিয়া। ক্যালোস অর্থ সুন্দর, আর গ্রাফেইন অর্থ লেখা। সহজে ক্যালিগ্রাফির পরিচয় এমন, ‘বর্ণ বা শব্দ ব্যবহার করে চমৎকার লিখনশিল্পকে ক্যালিগ্রাফি বলে।’ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, ভাষা এবং ধর্মের লোকরা সানন্দচিত্তে ক্যালিগ্রাফির চর্চা করেন। বিভিন্ন ভাষার হরফে ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে। আরবি, ইংরেজি, চীনা, জাপানি ও বাংলা প্রভৃতি ভাষার হরফের ক্যালিগ্রাফি মানুষকে মোহিত ও আনন্দিত করে। ইদানীং হ্যান্ড রাইটিং, টাইপোগ্রাফি, পিক্টোগ্রাফিসহ নানা রকমের রাইটিংকে নির্দ্বিধায় ক্যালিগ্রাফি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এম্বিগ্রাম, মনোগ্রাম, লেটারিং ইত্যাদিও ক্যালিগ্রাফি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
ইতিহাস
ধারণা করা হয়, ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার বর্ণমালা সভ্যতার শুরু থেকেই। তবে সবাই এটা স্বীকার করেন, ক্যালিগ্রাফিকে সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পেছনে আরবদের অবদান সবচেয়ে বেশি। ইসলামপূর্ব সময়ে মক্কায় আরবি লিপি প্রথম প্রচলন করেন বিশর ইবনে আবদুল মালিক আল কিন্দি। তিনি উত্তর আরবের হীরা এবং আনবার অঞ্চলের অধিবাসীদের কাছ থেকে ‘নাবাতিয়ান’ লিপি লেখার শৈল্পিক জ্ঞান অর্জন করেন। প্রাচীন তথ্য-প্রমাণে দেখা যায়, আরবরা ইসলামের আগে থেকেই আরবি লিপিতে লেখালেখি করত। এ ছাড়া সে সময় ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের বইপত্র হিব্রু এবং ‘সিরিয়াক’ লিপির সঙ্গে আরবিতেও লিখত।
তবে আরবি ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে লিপির ভেতর শৃঙ্খলা ও সুচারুবোধের অভাব লক্ষ করা যায়। এ অবস্থায় আরবি ভাষার অসামঞ্জস্য দূর এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নোকতা (হরফ পৃথক্করণ চিহ্ন) এবং তাশকিল (স্বরচিহ্ন) পদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করেন আবুল আসওয়াদ আল দোয়াইলি (মৃত্যু : ৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ)। এরপর আল-খলিল ইবনে আহমদ আল ফারাহিদি (মৃত্যু : ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ) আবুল আসওয়াদের তাশকিল পদ্ধতিকে সংস্কার করেন। ১১ শতকের গোড়া থেকে আন্তর্জাতিকভাবে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এতে ছয়টি স্বরচিহ্ন-কার হচ্ছে ফাতাহ (আ-কার), জাম্মাহ (উ-কার), কাসরা (ই-কার), সাকিন (স্বরচিহ্নমুক্ত চিহ্ন), সাদ্দাহ (দ্বিত্ব ব্যঞ্জন বর্ণচিহ্ন) এবং মাদ্দাহ (স্বরকে দীর্ঘকরণ চিহ্ন)।
ক্যালিগ্রাফি চর্চার শুরু
নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে ইবনে মুকলাহ ক্যালিগ্রাফি (আল-খত-আল মানসুব) নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা এবং বিজ্ঞানসম্মত কিছু নিয়মনীতি চালু করেন। তিনি হরফের বিন্যাসকে পরিমাপ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন। ইবনে মুকলাহ ক্যালিগ্রাফিতে ছয়টি মৌলিক রীতি প্রবর্তন করেন। ১. কুফি, ২. নাসফি, ৩. ওয়াহানি, ৪. তাওকি-রিকা, ৫. সুলুস ও ৬. ফারসি। তিনি আরবি বর্ণবিন্যাস থিওরি দেন। যার কয়েকটি হলো ক. আরবি বর্ণমালার ২৯টির মধ্যে ১৯টি মূল অক্ষর। যার ওপর নির্ভর করে বাকি অক্ষর বিন্যস্ত হয়। অক্ষরসমূহ হলো আলিফ, বা, হা (হুত্তি), দাল, রা, সিন, সোয়াদ, ত্বোয়া, আইন, ফা, ক্বাফ, কাফ, লাম, মিম, নুন, ওয়া, হা (হাওয়াজ), হামজা ও ইয়া। খ. আলিফ অক্ষরকে একক আকৃতি ধরে অন্যান্য বর্ণ লেখা, গ. শব্দের মধ্যকার ফাঁক একই রকম দূরত্বে রাখা, ঘ. দুই লাইনের মধ্যকার পার্থক্য একই মাপের থাকা, ঙ. অক্ষরে ঊর্ধ্বরেখার কৌণিক বিস্তৃতি যথাযথ বিবেচনায় রাখা ও চ. কলমের নিবের প্রশস্ততা পরিমিতভাবে ব্যবহার করা। ক্যালিগ্রাফির ক্ষেত্রে এমন সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য ইবনে মুকলাহকে ক্যালিগ্রাফি বা লিপিকলার জনক বলা হয়।
বিশেষ কলম
ক্যালিগ্রাফিকে আরবিতে ‘খত আল আরব’ ও ফারসিতে ‘খোশনবিশি’ বলে। তবে আরবিতে ক্যালিগ্রাফিকে ‘খত আল-আরব’ না ‘খত আল-ইসলামি’ বলা হবে, এটা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। আরবরা আরবি ক্যালিগ্রাফিকে ‘খত আল-আরাবি’ ব্যবহারের পক্ষে। কিন্তু অনারবরা ‘খত আল-ইসলামি’ ব্যবহারের পক্ষে। কারণ ‘খত আল-আরাবি’র অর্থ এটা আরবদের আর্ট। কিন্তু ক্যালিগ্রাফিতে শিল্পচর্চা তো ব্যাপক বিষয়। তাই একে ‘খত আল-ইসলামি’ বা ‘ইসলামি ক্যালিগ্রাফি’ বললে আরব-অনারব সব দেশ-জাতি অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
ক্যালিগ্রাফিতে বহুল ব্যবহৃত কলমকে বলে ‘কলম খাশাব’ ও ‘কলম বুস।’ এখনো ক্যালিগ্রাফিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাঁশের কঞ্চি কেটে বানানো বিশেষ কলম ব্যবহার করা হয়। আগের দিনে এটা হাড় কিংবা পাতলা পাথর কেটে বানানো হতো। অনেকে বলেন, ক্যালিগ্রাফির যাবতীয় রহস্য কলমের নিবে লুকায়িত। ক্যালিগ্রাফি কলমে হরফ লেখায় নিবের কৌণিক অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু আরবি হরফ ডান দিক থেকে বাম দিকে লিখতে হয়। এজন্য কলমের নিব রাখাটা হরফের সর্বাবস্থায় কৌণিক অবস্থান ডান দিকে ৪৫ ডিগ্রি বরাবর হয়, অনুরূপ বাংলা হরফ বাম থেকে ডানে লেখা হয় বলে এর কৌণিক অবস্থান বাম দিকে ৪৫ ডিগ্রি বরাবর হয়।
গুরুমুখী বিদ্যা
ক্যালিগ্রাফি একেবারেই গুরুমুখী বিদ্যা। অনেকে ভাবেন, নিয়মবিধি ও রীতি মেনে রংতুলি কিংবা কালি-কলম নিয়ে ইচ্ছে করলেই ক্যালিগ্রাফি করা সম্ভব। উত্তর একেবারেই না। কারণ যেকোনো বিষয় জানার একটা বিধিবদ্ধ নিয়ম আছে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যার পরিভাষা রয়েছে। এগুলো জানতে হয়, নিজে নিজে শেখায় সেগুলো সম্পর্কে জানা যায় না। যদি কোনো আরবি জানা লোককে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘সুলুস’ কী? তিনি জবাবে বলবেন, এক-তৃতীয়াংশ বা তিন ভাগের এক ভাগ। কিন্তু কোনো ক্যালিগ্রাফি শিল্পীকে জিজ্ঞেস করলে জবাবে বলবেন, এটা ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে জনপ্রিয় শৈলীর নাম। দেখা যাচ্ছে, একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা গুরুর সান্নিধ্য ছাড়া পাওয়া কঠিন।
তা ছাড়া হরফের প্রতিটি রেখা, রেখাংশ, বিন্দুর গঠন, স্বভাব অনুযায়ী অবস্থান চিহ্নিত এবং ক্যালিগ্রাফি হরফে রূপান্তরের গোপন কৌশল হাতে-কলমে আয়ত্তের মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফি করা সহজ হয়। চতুর্থ খলিফা ও ক্যালিগ্রাফির মহান উস্তাদ হজরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে বলেন, ‘আল-খত্ মুখফিউন ফি তালিমিল উস্তাজি ওয়া কওয়ামুহু ফি কাসরাতিল মাশকি ওয়া দাওয়ামুহু’ অর্থাৎ ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে রহস্যময়, উস্তাদের শিক্ষার মাধ্যমে তা উন্মোচিত হয় আর অধিক অনুশীলন এবং লেগে থাকার মাধ্যমে তা আয়ত্তে আসে।
নান্দনিক প্রয়োগ
মধ্যযুগের মুসলমানরা নানা রকম ব্যবহার্য জিনিসপত্রে লিপিকলার নান্দনিক প্রয়োগ ঘটিয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত উসমানীয় আমলের তলোয়ার, পঞ্চদশ শতাব্দীতে পারস্যে নির্মিত লোহার শিরস্ত্রাণ, দ্বাদশ শতাব্দীতে পারস্যে নির্মিত ব্রোঞ্জের দর্পণ, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মিসর অথবা সিরিয়ায় নির্মিত সোনা ও রুপার প্রলেপ দেওয়া পিতলের গামলা, চতুর্দশ শতাব্দীতে স্পেনের গ্রানাডায় তৈরি রেশম কাপড় এবং ষোড়শ শতাব্দীতে পারস্যে নির্মিত বিভিন্ন অলংকারের সাক্ষ্য বহন করছে। এ সময়ে ধাতব মুদ্রাতেও ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে ইসলামি লিপিকলার সবচেয়ে সুন্দর প্রয়োগ ঘটেছিল মুসলমানদের নির্মিত বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্যে। বিশেষ করে মসজিদ, সমাধিসৌধ ও প্রাসাদের অলংকরণে ক্যালিগ্রাফির অসাধারণ ব্যবহার মুসলিম স্থাপত্যকলাকে অনন্য ও অতুলনীয় শিল্পমাত্রা দিয়েছিল। ওই সময় মসজিদের ভেতরে ও বাইরে অলংকরণ করা হতো অ্যারাবেস্ক মোটিফ, লতাপাতার নকশা ও আরবি বর্ণমালাভিত্তিক শিল্পকলার সাহায্যে। তখন লিপিকলা ব্যবহার করে মসজিদের দরজা, দেয়াল, ছাদ, গম্বুজ ইত্যাদিতে কোরআনের আয়াত ও হাদিসের বাণী উৎকীর্ণ করা হতো। দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত দিল্লির কুতুব মিনার ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত উজবেকিস্তানের সমরকন্দে অবস্থিত তৈমুর লংয়ের গোর-ই-আমির সমাধিসৌধ এখনো ইসলামি লিপিকলার উৎকর্ষের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। একইভাবে মুসলিম শাসকরা প্রাসাদ অলংকরণেও ইসলামি লিপিকলা ব্যবহার করেছেন। এ ক্ষেত্রে চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত স্পেনের গ্রানাডায় অবস্থিত সুবিখ্যাত আল-হামরা প্রাসাদের অনুপম স্থাপত্যকলা ও ক্যালিগ্রাফির কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কুফিরীতি
আরবি লিপিকলার প্রসিদ্ধ ও সুপ্রতিষ্ঠিত রীতিসমূহের অন্যতম কুফিরীতি। কোনাকৃতি আরবি লিপিমালাটি ১৭ হিজরি মোতাবেক ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে কুফা নগরী প্রতিষ্ঠার প্রায় এক শতাব্দী আগে উদ্ভাবিত হয়। এটি আরবি লিপিমালার সর্বপ্রাচীন লিপিশৈলী। এই রীতিতে বক্রকার এবং স্তুতিলিপি নাবাতীয় লিপিকলা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে ব্যবহৃত ফিনিশীয়দের দ্বারা উদ্ভাবিত। ওই লিপির নাম ছিল হিময়ারি। ইসলামপূর্ব যুগে হিময়ার শহরে এই লিপির প্রচলন থাকায় এর নাম হয়েছে ‘হিময়ারি।’ ‘কুফি’ লিখনরীতি হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে সর্বাপেক্ষা কোনাকৃতি লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে লেখনশৈলী বক্রাকার হতে থাকে।
কুফিরীতি থেকে আরও বিভিন্ন উপরীতির উদ্ভব হয়। যেমন আবুল আসওয়াদ দুয়াইলি (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ অনুসারী কুতবা কুফি লিপির চারটি রীতি আবিষ্কার করেন। এ ছাড়া ‘আল জালি’ নামে এক ধরনের কুফিরীতির উদ্ভব হয়, যা রাজকীয় চিঠিপত্র এবং শিলালিপিতে ব্যবহৃত হতো। ‘সাজ্জালাত’ ছিল দলিল-দস্তাবেজে ব্যবহৃত কুফিরীতি। ‘সালাসীন’ লিপিরীতি সরকারি কর্মচারীদের কাছে লিখিত সরকারি পত্রাদিতে ব্যবহৃত হতো। ‘মিফতাহ’ ছিল ‘সালাসীন’ লিপিরীতি এবং এস্ট্রেনজেলো লিপিমালার মিশ্রণ। নারীদের লিখিত লিপিশৈলীর নাম ছিল ‘হারাম।’
নাসখ রীতি
প্রায় তিন শতাব্দী লিপিরীতি হিসেবে দুর্দান্ত প্রতাপের সঙ্গে রাজত্বের পর কুফির প্রচলন থেমে আসে। দীর্ঘকাল ব্যবহৃত কুফি অর্থাৎ কৌণিক আরবি লিপিরীতির পাশাপাশি বক্রাকার রীতির প্রচলন অব্যাহত ছিল। পরে এটি রাষ্ট্রীয় লিপিরীতি হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, বক্রাকার লিপিশৈলীর নাম ‘নাসখ।’ ‘নাসখ’ও চরম উৎকর্ষ লাভ করে, এ লিপির সঙ্গে স্বরচিহ্ন, হরকত ও বিরাম চিহ্নের সংযোজন কুফিরীতি অপেক্ষা অধিক সৌন্দর্যময়। ‘নাসখ’ রীতিতে কোনাকৃতি কুফি লিপির খানিকটা প্রতিফলন পাওয়া যায়। প্রসিদ্ধি লাভের পর নাসখ রীতি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। স্পেনে ‘আন্দালুসী’ নামে নাসখের একটি উপরীতির প্রচলন হয়। কর্ডোভা শহরে এটির অধিক প্রচলন থাকায় এটি ‘কর্ডোভীয়’ রীতি নামেও পরিচিত। ‘আলজেরীয়’ নামেও নাসখের একটি উপরীতি রয়েছে। মরক্কোর ফেজ শহরে ‘ফাসি’ নামে এর চেয়ে অধিকতর বক্রাকার রীতির উদ্ভব হয়। এ ছাড়া মধ্য আফ্রিকার টিম্বাকতু শহরে ‘সুদানি’ নামে এক লিপিশৈলীর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি এ লিপিরীতি ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১৩০১ সালে বিহারে সুলতান শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের আমলের বিভিন্ন স্থাপত্যশিল্পে ‘নাসখ’ লিপিশৈলীর ব্যবহার এর প্রমাণ।
নাসতালিক রীতি
কুফি ও নাসখ রীতির পর আরবি লিপিকলার ইতিহাসে ‘নাসতালিক’ রীতির নাম সোনার হরফে লিখিত। আগের কোনাকৃতি কুফি ও বক্রাকার নাসখ লিপিশৈলী আরবদের দ্বারা উদ্ভাবিত হলেও গোলাকৃতি নাসতালিক রীতি পারস্যদের আবিষ্কার। আরবদের দ্বারা পারস্য বিজয়ের বহু আগে থেকেই তারা ‘পাহলভি লিপি’র ব্যবহার করত। তবে ‘নাসতালিক লিপি’ বহু আগে আবিষ্কৃত হলেও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এ লিপির মাধ্যমে গ্রন্থাবলি লেখা শুরু হয়। এই লিপিতে সর্বপ্রথম ফার্সি কাব্যগ্রন্থ লিখিত হয়। নাসখ রীতির মাধ্যমে পবিত্র কোরআন ও বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাবলির লিপিকরণ আর দুই পঙ্ক্তির মধ্যভাগে এবং পৃষ্ঠার প্রান্তদেশে নাসতালিকের ব্যবহারের দ্বারা প্রতীয়মান হয়, লিপিকলার ক্রমবিকাশের প্রথম স্তর থেকেই নাসতালিক পারস্যবাসীর মধ্যে অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ রীতির কোনো উপরীতি সম্পর্কে জানা যায় না।
অন্যান্য লিপিরীতি
আরবি লিপিকলার রীতিসমূহের মধ্য থেকে আলোচ্য তিন রীতিই হচ্ছে প্রধান রীতি। এগুলো ছাড়া অপরাপর রীতিসমূহ মূলত এগুলোর আলংকারিক রীতি। যেমন ‘সুলুস’ হচ্ছে নাসখ লিপিকলার আলংকারিক প্রকরণ। এর সঙ্গে নাসখের পার্থক্য হচ্ছে, নাসখের তুলনায় সুলুসের লম্বালম্বি দণ্ড এবং বক্রাকার রেখার অনুপাত তিন গুণ বড়। ‘সুলুস’ লেখন পদ্ধতিতে নাসখ রীতিতে যে খাড়াদণ্ড ও বক্ররেখা সুপ্ত হয়ে রয়েছে তা প্রকাশ পেয়েছে।
‘খত্তুর রুকা’ হচ্ছে আলংকারিক লিপিশৈলীগুলোর মধ্যে সুষমামণ্ডিত লিপিকলা। সুলুস অপেক্ষা রুকা অধিকতর আলংকারিক রীতির পরিচায়ক। এর রেখাগুলো ভঙ্গিতে চলমান সাপের মতো অথবা স্রোতবাহী তরঙ্গের মতো সাবলীল ছন্দে প্রসারিত। ‘তাউকি’ হচ্ছে নাসখ লিপিশৈলীর অন্যতম আলংকারিক রূপ। ধারণা করা হয়, রুকা ও তাউকি কোনো লিপিশৈলী নয় বরং তাউকি লিপিশৈলীর সঙ্গে সুলুস লিপিশৈলীর সাদৃশ্য রয়েছে। ‘জুলফ-ই আরুশ’ নামে এক ধরনের আশ্চর্য লিপিমালা রয়েছে। যখন বক্রাকার রেখাগুলো শেষপ্রান্তে কুণ্ডলাকৃতি ধারণ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত হয় এবং খাড়া দণ্ডগুলো নাতিদীর্ঘ ও সূচ্যগ্র হয়ে প্রস্থে ক্ষীণ পরিসর গ্রহণ করে, তখন তাকে ‘জুলফ-ই আরুশ’ অর্থাৎ নববধূর কুণ্ডলাকৃতি বেণি বলা হয়। মূলত এটি নাসতালিকের একটি আলংকারিক রীতি।
অপর একটি লিপিরীতির নাম ‘রায়হানি।’ সুলুসের সঙ্গে সূচ্যগ্রে দণ্ডায়মান রেখার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও রায়হানি লিপিশৈলীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে সুলুসের সঙ্গে রায়হানি লিপিশৈলীর পার্থক্য নির্ণয় করা হয় বক্রাকার ও খাড়া রেখাগুলোর অনুপাতে। ‘গুলজার’ ও ‘তাউস’কে নিশ্চিতরূপে লেখনশৈলী বলা যায় না। কারণ, এগুলো অন্যান্য লিপিশৈলীর আলংকারিক রূপ, এগুলোতে প্রচলিত ভঙ্গিমায় কলমের আঁচড়ে প্রথম অক্ষরের একটি পরিলেখ সৃষ্টি করা হয় এবং পরে আলংকারিক রেখা চিত্র অথবা ফুল বা জীবজন্তু যেমন মাছ অথবা ময়ূর অলংকৃত হয়। ‘লারজা’ও কোনো ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লিপিশৈলী নয়, অন্যান্য আলংকারিক রীতির মতো এটিও অলংকরণ পদ্ধতিতে লিখিত একটি কৌশল মাত্র। লারজা লিপিশৈলীর অক্ষরগুলো দেখে মনে হবে যে এগুলো বাঁকানো পল্লব।
‘মানসুর’ নামে যে লিপিশৈলীর প্রচলন রয়েছে তা খুবই অদ্ভুত। এই রীতিতে মনে হয়, কোনো ফিতাকে জড়িয়ে অক্ষরগুলো লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই লিখনরীতিতে অক্ষরগুলো শেষপ্রান্তে ফাঁসের মতো দেখা যায়। ‘মুহাক্কিক’ও একটি আলংকারিক রীতি। অপরাপর আলংকারিক লিখনরীতির মতো লিপিকলার ইতিহাসে এটি খুবই বিরল এবং এটি বৈপরীত্য ও অভিনবত্ব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। আরবি লিপিমালার অন্যতম আলংকারিক লিপিশৈলী হচ্ছে ‘বিহার।’ যদিও অন্যান্য রীতির মতো এ লিপিমালায় অলংকরণের প্রয়োগ খুব কম। তবে আরবি লিপিমালার সর্বাপেক্ষা চাতুর্যপূর্ণ কৌশল হচ্ছে ‘তুঘরা।’ কোরআন শরিফের একটি আয়াত অথবা সুরাকে এ রীতিতে এমনভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় যে, তা কোনো প্রাণীর যেমন পাখি, বাঘ অথবা অন্য কোনো প্রাণীর আকৃতিতে আঁকা বলে মনে হবে।
উপরোক্ত রীতিগুলো ছাড়াও বিভিন্ন গ্রন্থাবলিতে অনেক লিপিশৈলীর উল্লেখ রয়েছে। যেমন : গুবার, সাফিয়া, খত্তে বাবর ও হিলানি। তবে এসব লিপিরীতি অন্যান্য লিপিরীতির মতো বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। সর্বশেষ বিভিন্ন ধাঁচের আরবি হস্তলিপির সঙ্গে অ্যারাবেস্ক নামক জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার করে নকশাবিদরা নান্দনিক লিপিকলা সৃষ্টি করতেন। এটাও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়।
