সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনে আজ শনিবার ভোটগ্রহণ হবে। করোনা মহামারীর কারণে দফায় দফায় পেছানোর পর শেষমেশ এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। সব কেন্দ্রে ভোট হবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ-উদ্দীপনা না থাকলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থী জয় পেতে মরিয়া। তফসিল ঘোষণার পর থেকে তারা নির্বাচনী এলাকার তিন উপজেলায় সভা-গণসংযোগ করে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিকের পক্ষে তাদের দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও শেষ মুহূর্তে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছেন। দলের আপত্তি না মেনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কার হয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সাংসদ শফি আহমদ চৌধুরী। প্রচারে তিনি একা থাকলেও ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এ আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য প্রার্থী বাংলাদেশ কংগ্রেসের জুনায়েদ মোহাম্মদ মিয়া ভোটের মাঠে খুব একটা আলোচনা ও প্রচারে নেই।
এদিকে জাপা প্রার্থী আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে টাকা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। টাকা দিয়ে তিনি ভোট টানার চেষ্টা করছেন জানিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ফারুক আহমদ গতকাল শুক্রবার রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে তিনি বলেছেন, নৌকার সমর্থক ও সাধারণ জনগণের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন যে লাঙ্গলের প্রার্থী আতিকুর রহমান স্বয়ং ও তার সমর্থক কর্মীরা ভোটারদের মাঝে টাকা বিতরণ করে ভোট কেনার চেষ্টা করছেন। দক্ষিণ সুরমার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের মাঝে টাকা বিলিয়ে দিচ্ছেন তারা। যা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। তাই এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ফারুক আহমদ। এছাড়া দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করায় তিনজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থী ও একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি কেমন হয় সেটাই ঘুরেফিরে আলোচিত হচ্ছে। বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করেছে। সেই সঙ্গে চলছে করোনা মহামারী। এ অবস্থায় ভোটার উপস্থিতি খুব বেশি হবে না বলেই অনেকের ধারণা। তবে ভোটার উপস্থিতি যেমনই হোক, প্রার্থীদের কাছে জয়টাই মুখ্য।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জয়ের ব্যাপারে আমি দৃঢ় আশাবাদী। এলাকায় নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ মানুষ উন্নয়নের পক্ষে। তারা বুঝতে পেরেছে নৌকায় ভোট দিলে উন্নয়ন হবে। গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নৌকা বিজয়ী হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শনিবারের উপনির্বাচনেও নৌকা জিতবে বলে আশা করছি।’
অন্যদিকে জাপা প্রার্থী আতিক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শফি চৌধুরীর মূল চিন্তায় ভোটের নিরপেক্ষতা। তারা দুজনই নির্বাচনী প্রচারের সভা-সমাবেশে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন বারবার। জাপার কেন্দ্রীয় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকায় নির্বাচন কমিশন এবং সিলেটে রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জাপার প্রার্থী আতিকুর রহমান আতিক বলেন, ‘গত বেশ কিছু নির্বাচনের কারচুপি দেখে এখন ভোটের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। এ অবস্থায় সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা যদি এখানে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করে তবে ভোটের প্রতি আবার মানুষ আগ্রহী হবে। যা দেশের গণতন্ত্রের জন্য খুবই জরুরি।’
অবাধ নির্বাচন হলে নিজের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে আতিক আরও বলেন, ‘এ আসনটি দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই দুর্গ আবার উদ্ধার হবে।’
অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য (বর্তমানে বহিষ্কৃত) স্বতন্ত্র প্রার্থী শফি আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘অষ্টম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলাম। এরপর এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছি। কিন্তু পরবর্তীকালে নিরপেক্ষ নির্বাচন না হওয়ায় নবম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনে (দশম নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি) জিততে পারিনি। এবার সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমিই জিতব। এলাকার মানুষ আমাকে চায়।’ শফি চৌধুরী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা, সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সবরকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে।’
৩ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আ.লীগের : দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করায় তিনজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের একজন এপিপিকে অব্যাহতি এবং ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদককে বহিষ্কার ও একই উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অব্যাহতিপ্রাপ্ত এপিপি সুয়েব আহমদ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক উপদপ্তর সম্পাদক।
তাকে অব্যাহতির বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেটের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিজাম উদ্দিন বলেন, দায়িত্বে অবহেলার কারণে আইন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে সুয়েব আহমদকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুয়েব আহমদ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিলেট-৩ আসনের নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের পোস্ট করেন। এতে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেন।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আউয়াল কয়েছকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মজির উদ্দিন গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছেন। এছাড়া ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাশার আহমদ শাহকে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ স্বাক্ষরিত ওই নোটিসে তাকে গতকাল রাত ১২টার মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে জবাব না দিলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগদলীয় সাংসদ মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১১ মার্চ মারা যাওয়ায় শূন্য হয় সিলেট-৩ সংসদীয় আসনটি। এরপর এ আসনে উপনির্বাচন আয়োজন নিয়েও করোনা পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান অনুযায়ী গত ৮ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও করোনাকে ‘দৈব-দুর্বিপাক’ দেখিয়ে আরও ৯০ দিন সময় নেয় কমিশন। এরপর তফসিল ঘোষণা করে গত ২৮ জুলাই ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছিল কমিশন। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর এ আসনের উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ইসরাইল হোসেন গত ২৫ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলামকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিযুক্ত করে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া নির্বাচনসংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দেশে ‘কঠোর লকডাউন’ ঘোষণা করে সরকার। এ অবস্থায় নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে গত ২৬ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের ছয়জন আইনজীবী ও সিলেট-৩ নির্বাচনী এলাকার সাতজন ভোটারের পক্ষে নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনির। রিটের শুনানি শেষে আদালত ৫ আগস্ট পর্যন্ত ভোটগ্রহণ স্থগিত করে। গত ৫ আগস্ট বিষয়টি শুনানির জন্য আদালতে উপস্থাপিত হলে আদালত ওই রিটকে অকার্যকর ঘোষণা করে আগামী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা দেয়। এর আলোকে নির্বাচন কমিশন ৪ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ ধার্য করে।
তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮৩। তিন উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে মোট ভোটকেন্দ্র ১৪৯টি।
