বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে সরকার। এর ফলে নিট ঋণ কম দেখালেও সুদব্যয় তুলনামূলক বাড়বে সরকারের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ করে সরকার। এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ৮ হাজার ১৯১ কোটি টাকার পুরনো ঋণ পরিশোধ করে সরকার। ফলে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা, যা সরকারের ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রার ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।
গত অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ব্যাংকঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে আসায় চলতি অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনা হয়। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল বাজেটে সরকারের ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। তবে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ঋণ আসায় সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭৯ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা করা হয়। অর্থবছর শেষে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এ কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হলেও অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারের ব্যাংকঋণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। গত জুলাই মাসেই প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার। তবে আগস্টের শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করায় নিট ঋণ কমে আসে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা নিয়ে অসুবিধার কিছু দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এটা একটা নিয়মিত প্রক্রিয়া বলে জানান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার মধ্যে সব প্রকল্পের কাজ স্থবির হয়ে পড়ায় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ তেমন কাজে লাগছিল না এতদিন। তবে এখন আবার সব প্রকল্পের কাজে গতি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে সামনে হয়তো ব্যাংকঋণ আরও বাড়বে।’
চলতি অর্থবছরে সরকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। তবে এই সময়ে সরকার আয় করতে পারবে ৩ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাজেট ঘাটতি থাকে ২ লাখ ১১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। অনুদান বাদ দিলে ঘাটতি আরও কিছুটা বেড়ে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা হবে।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এই সময়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ৩৭ হাজার ১ কোটি টাকা ঋণ করবে সরকার। ব্যাংকবহির্ভূত উৎসের মধ্যে সরকার সঞ্চয় স্কিম থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা, যা ছিল এর আগের অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া ঋণের প্রায় তিনগুণ।
সরকারের বাজেট ঘাটতি সংস্থানে গত কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্রনির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। তবে এতে সরকারের সুদব্যয় বাড়ছে বলে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা ব্যাংকঋণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কেননা, বর্তমানে করোনার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও কম। গত জুলাই মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে এবং বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে এমন প্রক্ষেপণ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এক্ষেত্রে সরকারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া ঋণ পরিশোধ করা হলেও নতুন করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের মেয়াদপূর্তি হলে নির্ধারিত হারে সুদ পরিশোধ করতে চলতি অর্থবছরেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রেখেছে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৬২ হাজার কোটি টাকা সুদ পরিশোধে ব্যয় করবে সরকার।
