জোয়ারে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:০৪ এএম

দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাত কিছুটা হ্রাস পেলেও উজান থেকে নেমে আসা ঢল অব্যাহত থাকায় চলমান বন্যা পরিস্থিতির কোথাও অবনতি, কোথাও আবার উন্নতি হয়েছে। পদ্মা নদীর পানি বাড়লেও ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তায় পানি কমেছে। ফলে কোনো কোনো জেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সেসব নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাসমূহ জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে।

ড্রেনের পানি উপচে পড়ে রাস্তাঘাটে প্রবেশ করছে। জোয়ারের উচ্চতা বেশি হওয়ায় ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। তার ওপর গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন তো আছেই। দুর্ভোগ আর ভোগান্তি নিয়ে দিন পার করছেন লক্ষাধিক বন্যাকবলিত মানুষ। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তারা বলছে, দেশের সকল প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ এবং শরীয়তপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমানে ১০টি নদীর ১৬টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

আমাদের বরগুনা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাবে জেলায় বিপদসীমার ১৮ সে.মি. উপর দিয়ে পানি বইছে। পানির তোড়ে প্লাবিত হয়েছে বরগুনা পৌরশহরসহ উপকূলের নিম্নাঞ্চল। জোয়ারের উচ্চতা বেশি হওয়ায় ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয়েছে মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি। ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি পরিমাপক শাখা সূত্রে জানা গেছে, বরগুনার প্রধান তিনটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে বিষখালী নদীর পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বরগুনায় স্বাভাবিক অবস্থায় যা ২ দশমিক ৮৫ সে.মি. দিয়ে প্রবাহিত হয়। গতকাল দুপুর ১২টায় বিষখালী পয়েন্টে ৩ দশমিক ০৩ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়ছার আলম বলেন, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো ভাঙনের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বেশকিছু স্থানে ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি, ক্ষতিগ্রস্তের কোনো খবর পেলেই আপনাদের জানানো হবে।

বরিশাল সংবাদদাতা জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও অমাবস্যার জোয়ারের প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের সকল নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বরিশালে কীর্তনখোলা নদীর পানিও গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীতীরবর্তী নিচু এলাকা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি জোয়ারের পানিতে বরিশাল নগরের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। ড্রেনের পানি উপচে পড়ে শহরের রাস্তাঘাটে প্রবেশ করছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় কীর্তনখোলা নদীর পানি বরিশাল বন্দর পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। অপরদিকে বিভাগের অপর ৫টি নদীর ৯টি পয়েন্টে সোমবার বিপদসীমা অতিক্রম করে। গতকালও ওই ৫ নদীতে অস্বাভাবিক পানি প্রবাহ ছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মিটার গেজ রিডার আব্দুর রহমান জানান, কীর্তনখোলার নদীর পানির বিপদসীমা ২ দশমিক ৫৫ মিটার। গতকাল সকাল ৬টায় ২ দশমিক ৬০ মিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এদিকে পানি বৃদ্ধির কারণে নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলো জোয়ারের সময় পানিতে তলিয়ে যায়। এতে দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়।

মাদারীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তীব্র স্রোতের ফলে আশপাশের নিচু জায়গা প্লাবিত হয়ে ভাঙনের শুরু হয়েছে। ভাঙনের ফলে বসতবাড়ি, দোকানপাটসহ ফসলি জমি ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের ভয়ে অনেকেই বাড়িঘর ও দোকানপাট অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। গত ২ দিনেই ২টি বসতবাড়িসহ ৩টি দোকান পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর মহিষেরচর (পুরাতন ফেরিঘাট) এলাকায় নদীভাঙন তীব্র হওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মহিষের চরের বেশ কিছু জায়গায় প্রায় ৬০০০ জিও ব্যাগ ডাম্পিং করেছিল।

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এবং অতি দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলে যমুনাসহ সকল নদীর পানি কমলেও এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি টাঙ্গাইল অংশে ২৫ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার কালিহাতী, ভূঞাপুর, নাগরপুর, বাসাইল ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলার লক্ষাধিকের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে পানির কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর তীব্র ভাঙন। ভাঙনের ফলে নদীতীরবর্তী এলাকায় ইতিমধ্যে তিন শতাধিক বসতভিটা, মসজিদ, বাঁধ, রাস্তাসহ নানা স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া কাঁচাপাকা রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত