কিন্ডারগার্টেনের বন্ধ দরজা খুলছে না হতাশ শিক্ষক-শিক্ষার্থী

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:০৮ এএম

রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি কিন্ডারগার্টেনে ২০২০ সালে ভর্তি হয়েছিল ৬২৮ জন শিক্ষার্থী। বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ২১২ জনে। স্কুলটির কর্ণধার জাহাঙ্গীর কবির রানা জানান, অনলাইনে যখন ক্লাস নেওয়া শুরু করি, তখন ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যেত। এখন কেউই আর ক্লাসে অংশ নেয় না। তিনি বলেন, ‘সরকার স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণার পর ২১২ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কেউ জানিয়েছেন, ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছেন, কেউ বলেছেন, সপরিবারে গ্রামে চলে গেছেন। এমনকি শিক্ষকও পাওয়া যাচ্ছে না। আমার বিদ্যালয়ের নিচেই ইংরেজির শিক্ষক চায়ের দোকান দিয়েছেন।’

করোনার কারণে ১৭ মাস ধরে বন্ধ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ সময়ে  অনেক শিক্ষক পেশা বদল করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দীর্ঘ সময়ে মাসে অনেক সেক্টর খোলা ও বন্ধ হয়েছে। এই সুযোগে অনেকেই সময় ও সুযোগে ঘুরেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু শিক্ষাই একমাত্র জায়গা, যেখানে শুধুই তৈরি হয়েছে হতাশা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে ৬০ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী ছিলেন ১২ লাখ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ লাখ। ১২ সেপ্টেম্বর সারা দেশে স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে কিন্ডারগার্টেনগুলো কার্যত বন্ধই থাকছে।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাঙা বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় এখন এই সেক্টরের কোনো কাজেই আসছে না। অবস্থা এমন তৈরি হয়েছে যে আমরা নতুন বছরকে মাথায় রেখেই আবার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সংগ্রহে কাজ করছি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্কুল মালিক বলেন, ‘আমার স্কুলের ভবনের ভাড়া ছিল মাসে ৭২ হাজার টাকা। করোনাকালে আমার বউয়ের গয়নাও বিক্রি করেছি। এখন এমন অবস্থা নতুন করে কী করব আর ভেবেই পাচ্ছি না।’

রাজধানী ঢাকার কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর ৯৫ শতাংশ ভাড়া বাসায় পরিচালিত হয়। এখানে যারা শিক্ষকতা করতেন তার অধিকাংশই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অথবা যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করেও ভালো চাকরি পাননি। এ ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত টিউশন ফি দ্বারা পরিচালিত হয়। করোনার কারণে মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এরপর থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎসও বন্ধ। ফলে ভাড়া মিটিয়ে আবার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার কারণে ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক অভাবে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন একাধিক শিক্ষক-কর্মচারী। এ ছাড়া পেশাবদল করেছেন হাজারো শিক্ষক। অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় প্রতিদিনই স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিন্ডারগার্টেন স্কুল খুলে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনও করছেন। তবে সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় বাস্তবে এ সেক্টরে তেমন কোনো কাজেই আসবে না।

এদিকে সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সরকারি ঘোষণার পর সব স্কুল-কলেজে তোড়জোড় লেগেছে। বিদ্যালয়ের আঙিনা পরিষ্কার, বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড ও শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করতে ঘাম ঝরাচ্ছেন কর্মীরা। তবে রাজধানীর মুগদা, বাসাবো, খিলগাঁওসহ একাধিক এলাকায় সরেজমিনে কোনো কিন্ডারগার্টেনকেই এমনটি দেখা যায়নি; বরং এসব স্কুল শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন নিয়ে আরও বিপাকে রয়েছে। দেশের কিন্ডারগার্টেনগুলোর ৬০-৭০ শতাংশই নারী শিক্ষক। একটি কিন্ডারগার্টেনে দেখা যায়, সেখানে ৭ জন শিক্ষিকা কর্মরত আছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, ক্লাস বন্ধ থাকলেও আমরা প্রতিদিন বিদ্যালয় খুলে বসে আছি। তবে দীর্ঘ ১৭ মাসেও কোনো বেতন পাননি বলে অভিযোগ করেন তারা।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত ৮০ শতাংশ কমেছে। নতুন শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। এর থেকে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী বেতন পরিশোধ করছে। তা দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান আয়া-দপ্তরি ও বৈদ্যুতিক ভাড়া মেটাচ্ছেন। অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেনের মালিক বলেন, সরকারি প্রণোদনা না পেলে এটি আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

এ বিষয়ে কিন্ডারগার্টেন ও সমমান স্কুল রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আবদুল ওয়াদুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলোর দৈন্য নিরসনে সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। এ সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আমাদের প্রস্তাব তোলা হয়েছে ও বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে আমারা এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি আশ^াস পাইনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত