১৬ বছর ধরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃক অনুমোদিত মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেল। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃক অনুমোদিত মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে আর তাদের অধীনে পরিচালনা করতে পারবে না।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রণীত বেসরকারি খাতে মেডিকেল টেকনোলজি প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১০ অনুযায়ী, আবেদন করলে সমস্ত শর্ত পূরণ করত সন্তোষজনক বিবেচিত হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধিভুক্তি সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে।
এর পাশাপাশি একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হলো সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ। জানা গেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ১৮১তম গভর্নিং বডির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডকে ১৪ জুলাইয়ে এক চিঠিতে জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠির প্রেক্ষিতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড গত ২ আগস্ট বোর্ডের অধিভুক্ত মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অধ্যক্ষ/পরিচালকদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অবহিত করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়েরকারী বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট ৫ বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক।’ তিনি অবিলম্বে ‘ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট’ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মেডিকেল টেকনোলজি শিক্ষা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। ১৯৬২ সাল থেকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আলোকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধিভুক্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০০৫ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদন দিয়ে কোর্স পরিচালনা শুরু করলে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
১৬ বছর ধরে এ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। জটিলতা নিরসনে ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্টের আওতায় পরিচালনার সুপারিশ করে। কিন্তু এ সুপারিশ উপেক্ষা করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ও কোর্স পরিচালনা অব্যাহত রাখায় জটিলতা বৃদ্ধি পায়।
এ পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শূন্য পদে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এতে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় তারা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নেওয়া হলে সর্বোচ্চ আদালত ২০১৬ সালের নভেম্বরে ২০০৭ সালে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশের আলোকে ‘ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চার বছরেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ঊর্ধ্বতন ৮ কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়।
২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ওই কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, ‘সুপ্রিমকোর্টের সিভিল পিটিশন লিভ টু আপিল নং ২১৪৩/২০১৬ মামলার নির্দেশনা মোতাবেক কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃক অনুমোদিত মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বোর্ড আইন ২০১৮ এ মেডিকেল টেকনোলজিসংক্রান্ত বিধিবিধান বিলুপ্ত/সংশোধন করে ৩০ দিনের মধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগকে কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হলো।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আদেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ গড়িমসি শুরু করে। এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়াধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পাসকৃত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অধ্যয়নরত ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যায়। এ সময় তারা সংক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মোঃ সেলিম মোল্লা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মেডিকেল টেকনোলজি কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘কোর্স এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সর্বোচ্চ আদালতের এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সব নির্দেশনা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে।’
