সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ফেরদৌসী

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:১৬ এএম

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী দীর্ঘ বিরতির পর তার চলচ্চিত্র নিয়ে আসছেন। নতুন মুভিটির নাম ‘ফ্রম বাংলাদেশ’। ইতিহাসনির্ভর গল্প নিয়ে তৈরি এই মুভির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেশবরেণ্য অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। এটি বর্তমানে ডাবিং টেবিলে রয়েছে। পুরো ক্যারিয়ারে ফেরদৌসী মজুমদার যে কাজগুলো করেছেন প্রতিটি ছিল সচেতনভাবে বাছাই করা। পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বাছ-বিচার অনেক বেড়েছে। এ সিনেমাটিতে কাজের ব্যাপারে কোন বিষয়টি সবচেয়ে আকর্ষণ করেছে জানতে চাইলে এ কিংবদন্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মঞ্চ, টিভি কিংবা সিনেমা যে কাজই করেছি প্রতিটি ক্ষেত্রে স্ক্রিপ্টকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছি। এ সিনেমার স্ক্রিপ্ট খুব ভালো। এর প্রেক্ষাপট দেশভাগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ। যা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিশেষ করে এ সিনেমায় দেখানো হয়েছে এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা। নির্দেশক কাকলী বাদ দেননি সনাতন ধর্মের শ্রেণি-বৈষম্যকেও। এসব কিছুই আমার মনে দাগ কেটেছে। এজন্য সিনেমাটি করেছি।’

ফেরদৌসী মজুমদার এ সিনেমার শ্যুটিং করেছেন মানিকগঞ্জের দিকে। মোট ১০ দিনের মতো শিডিউল ছিল তার। এতে তাকে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের কর্ত্রীর ভূমিকায় দেখা যাবে। যিনি সেকালের মানুষ হিসেবে অনেক ধরনের সংস্কার মেনে চলেন। যেমন বাড়ির ওপর দিয়ে কোনো মুসলিম কিংবা নিচু জাতের কেউ হেঁটে গেলে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেন। কিন্তু একটা সময় তিনি বুঝতে পারেন, এগুলো আসলে কিছুই নয়। যখন তার সব আপনজন তাকে ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু বিধর্মী বলে যাকে তিনি আজীবন অবহেলা করেছেন সেই ছেলেটিই তার শেষ সময়ের সঙ্গী হয়। ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘মানুষের ধর্ম তার মনে। গঙ্গাজল ছিটালেই কি সবকিছু শুচি হয়ে যায়? কিন্তু সেটা মানুষের বিশ^াস। আমাদের পরিবারে কখনই এমন সাম্প্রদায়িক চেতনার বসবাস ছিল না। আমার বাবা ছিলেন খুবই পরহেজগার মানুষ। কিন্তু তিনি সকল ধর্মের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে বলতেন। তার ভাষ্য ছিল, “যেখানে কদর পাবা, সেখানে যাবা”। অর্থাৎ অনেক বড় মানুষ, কিন্তু তোমাকে তোয়াক্কা করছে না, সেখানে সময় নষ্ট করার মানে নেই। তার চেয়ে যদি কোনো হতদরিদ্র লোক তোমাকে সম্মান করে তাদের সঙ্গে সময় কাটানোই শ্রেয়। এই সিনেমায় সে কথাই বলে।’

এ সিনেমার শ্যুটিং অভিজ্ঞতা কেমন ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনোদিন শ্যুটিংয়ের জন্য বাইরে রাতযাপন করি না। যত কষ্টই হোক শ্যুটিং শেষে ঘরে ফিরি। এ নিয়ে প্রথম প্রথম পরিচালক কাকলী একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমি তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছি। আমি যেখানেই থাকি না কেন, কাজ শেষে ঘরের মায়া আমাকে তাড়া করে ফেরে। ভাবতে থাকি কখন ঘরে গিয়ে নিজের চেয়ারে একটু বসব, এক কাপ চা নিয়ে বেলকনিতে বসব। আসলে আমি প্রচ- ঘরকুনো। নিজেকে তো মাঝেমধ্যে অসামাজিকও মনে হয় (হা হা হা)। কোথাও যাই না। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছি, তাই স্কুলের রাস্তাটা চিনি। আর চিনি শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা সমিতি। এর বাইরের জগৎ সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই। তবে আমার মেয়ে ত্রপা আমার অনেক কাজ সহজ করে দেয়। শ্যুটিংয়ে সে আমার সঙ্গে থাকে বেশিরভাগ সময়। বহু আগেই সে আমার মায়ের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে। তার অনেক কথা আমি মেনে চলি। আমার মেয়েও আমাকে খুব ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। আমি তাকে নিয়ে গর্বিত।’

করোনার কারণে সবার মতো অনেক কাজের ক্ষতি হয়েছে ফেরদৌসী মজুমদারেরও। তবে সব পরিস্থিতি থেকে ভালো কিছু খুঁজে নিতে পারেন তিনি। শোনা যাক তার মুখেই, ‘করোনার অনেক খারাপের মধ্যে আমার জন্য একটি ভালো দিক হলো রান্না করা। করোনা প্রকোপ বেড়ে গেলে কাজের লোকের সহায়তা কম পেয়েছি। তাই নিজে অনেক ধরনের রান্না করেছি। নতুন ধরনের একটি রান্না করার পর অন্যরকম আনন্দ লাগে। বই পড়ে কিংবা টিভি দেখেও নতুন রান্না করার চেষ্টা করেছি। তবে আমি তাদের রেসিপি হুবহু অনুসরণ করি না। কারণ তারা প্রচুর মসলা দিয়ে রাঁধে। গোটা এলাচ, বড় এলাচ, ছোট এলাচ, তিন ধরনের যদি এলাচই একটি রান্নায় দেওয়া হয় তাহলে সেই খাবারের গুণমান কী হয় ভাবুন! ছোটবেলা থেকেই শিখেছি, টক দই আর দুধ এক রান্নায় দিতে নেই। কিন্তু এখন অনেক রেসিপিতে সেটি ব্যবহার করে। আমি তো মা, মাসি, শাশুড়ি, ননদ-ননাসদের রান্না দেখেছি। তাদের প্রত্যেকের অসম্ভব ভালো রান্নার হাত। তারা কিন্তু এত মসলা দিয়ে রাঁধতেন না। তাই আমি কোনো নতুন রেসিপি ট্রাই করলে নিজের মতো করেই সেটি প্রস্তুত করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবসময় যে নিজে রান্নার জন্য টিভির রেসিপি দেখি, তা নয়। জানার জন্যও দেখি। সুপ্তটা কী, সেটা জানতে ইচ্ছে করে। কোন ফুলের নাম কী? কোন পাখির নাম কী? এগুলো না জানা থাকলে হয়? প্রকৃতির সঙ্গে নিজের বন্ধনটাই তো পোক্ত হয় না।’

এখন সময় কেমন কাটছে জানতে চাইলে বললেন, ‘করোনার মধ্যে আসলে লেখালেখিটা বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সেটা পারিনি। তবে নিয়ম করে ডায়েরি লিখি। স্মৃতি তো সবসময় আমাদের দখলে থাকে না। তাই লিপিবদ্ধ করা আর কি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত