মহামারী করোনার ক্ষতি মেটাতে অন্যান্য দেশে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (সিএসএমই) যে প্রণোদনা ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি জসিম উদ্দিন। গতকাল এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে শীর্ষ ব্যাংকারদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক সভায় এমন তথ্য তুলে ধরেছেন তিনি।
জসিম উদ্দিন বলেন, ভারতে কভিড প্রণোদনার ৩৮ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৩৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২৪ শতাংশ অর্থ সিএসএমই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই হার মাত্র ২২ শতাংশ। দেশে রপ্তানি ও বৃহৎ খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়ন সন্তোষজনক হলেও সিএসএমই খাতে বাস্তবায়ন হার তুলনামূলক কম, যা মাত্র ৭৭। এমন অবস্থায় কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রণোদনা ঋণের দ্রুত ছাড় জরুরি হয়ে পড়েছে।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বিরাজমান পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে এফবিসিসিআই। সভায় এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সঙ্গে এফবিসিসিআই নেই। প্রয়োজনে তাদের থেকে ঋণ আদায়ে ব্যাংকারদের সহায়তা করা হবে।
জসিম উদ্দিন বলেন, এসএমই খাতের জন্য ‘ডেডিকেটেড ডেস্ক’ চালু, এসএমই সার্ভিস সেন্টার, নতুন ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রবর্তনসহ বাংলাদেশ ব্যাংক বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও কোনো কোনো ব্যাংকে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনীহা দেখা যাচ্ছে। সভায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ও জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা চালু ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম সহজ ও সক্রিয় করার তাগিদ দেন তিনি।
এসএমই খাতের বিকাশে টার্ম লোনের মেয়াদ বাড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ বছর ও গ্রেস পিরিয়ড দুই বছর করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এফবিসিসিআই সভাপতি। ব্যাংক হিসাব না থাকা এসএমইদের সংশ্লিষ্ট ট্রেডবডির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যাংকঋণ দেয়ার সুপারিশ করেন তিনি। এ সময় তিনি সিএসএমই অর্থায়ন সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের মাস্টার সার্কুলার যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। বৃহত্তর স্বার্থে শিল্পঋণের সীমা নবায়ন বা পুনঃতফসিলিকরণের সময় ডাউন পেমেন্টের হার ১ থেকে ২ শতাংশ নির্ধারণ করলে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে জানান এফবিসিসিআই সভাপতি। নতুন করে ৩০ থেকে ৩৫টি সুতার মিল হচ্ছে। এসব ঋণের মেয়াদ দীর্ঘমেয়াদি না হলে সব খেলাপি হয়ে পড়বে। এ সময় তিনি বলেন ব্যবসায়ে ব্যয় কমাতে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করপোরেট কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার জন্য সরকারের সুপারিশ করেছে এফবিসিসিআই।
এদিকে গতকালের সভায় অন্য ব্যবসায়ীরা করোনার ক্ষতির কারণে নতুন করে ঋণ চান। আবার কেউ প্রণোদনার ঋণ পরিশোধে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় চান। অনেকে চান সব ব্যাংকের সুদহার এক হবে। তবে সবার দাবি ঋণের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার।
আর ব্যাংকাররা চান প্রণোদনার ঋণ যেন সময়মতো আদায় হয়। ব্যবসায়ীদের থেকে সময়মতো টাকা ফেরত চান তারা। পাশাপাশি চান খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ।
এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, একটি গ্রুপের কোনো একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে, বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও ঋণ পায় না যা ওই গ্রুপের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থাকে নাজুক করে তোলে। এ বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়রা আজম বলেন, আপনারা ঋণ পরিশোধে দীর্ঘমেয়াদি সময় চাইছেন। অথচ প্রণোদনার ঋণের মেয়াদ এক বছর। ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময় চাইছেন, কিন্তু আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে বাড়তি সময় চাওয়া কি সম্ভব?
রূপালী ব্যাংকের এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় নিয়ে এমন একটা সভার আয়োজন করতে পারে এফবিসিসিআই। এতে সব ব্যাংকের খুব উপকার হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার বলেন, প্রণোদনা ঋণ কোনো অনুদান নয়। ঋণের টাকা সঠিক সময়ে ফেরত আনা ব্যাংকের দায়িত্ব। টাকা আদায় নিয়ন্ত্রণ সংস্থারও দায়িত্ব নয়। তাই ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই করে ঋণ দিচ্ছে। প্রণোদনা ঋণের ৮০ শতাংশ ছাড় হয়েছে। এই হার আরও বাড়লে ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি।
এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, খেলাপি ঋণ পুরো খাতকে ক্ষতিতে ফেলেছে। ঋণ খারাপ হলে তা আদায় করতে ১০ বছর সময় লেগে যাচ্ছে। আমানতকারীদের থেকে তো টাকা ফেরত দিতে ১০ বছর সময় নেওয়া যাচ্ছে না। এ সময় খেলাপি ঋণ আদায়ে এফবিসিসিআইয়ের সহযোগিতা চান আলী রেজা ইফতেখার।
সভায় এবিবির সেক্রেটারি ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, যে দেশে সব ঋণের সুদহার এক, সেখানে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার এটাও একটি কারণ। ঋণের খরচের ওপর নির্ভর করে সুদ ঠিক করা প্রয়োজন। এখন যেভাবে বিভিন্ন সেবা মাশুল নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে, তাতে ব্যাংক খাতের আয় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ কমে আসবে।
