ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে? সাধারণত মনে করা হয়ে থাকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। কারণ হতে পারে এটি তার পরিচিত জনপ্রিয় প্রবন্ধগুলোর একটি আর কথাসাহিত্যিকেরা অনেকে এই প্রস্তাবনাকে দিঙ্নির্দেশনামূলকও মনে করে থাকেন। বিষয়টি পুরোপুরি তা নয়। এটা ১৯৯০-এ বাংলাদেশের প্রধান কথাসাহিত্যিকদের কাছে সাপ্তাহিক বিচিত্রার জিজ্ঞাসা ছিল, তাতে সাড়া দিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একই শিরোনামে দিয়েছিলেন মোক্ষ জবাব। সে জবাব পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে নয়, গোটা বিষয়টা নিয়ে তার উপলব্ধি, চলমান সামাজিক কাঠামোয় ছোটগল্প নামের কথাশিল্প মাধ্যম সংকটে পড়েছে অথবা (ধরা যাক) পড়েনি। দীর্ঘ বিশ্লেষণসহ তিনি জানিয়েছেন, ছোটগল্প এখনই না-মরলেও সামনে সংকটে পড়তে যাচ্ছে।
লেখাটা তিরিশ-একত্রিশ বছর আগের, তারপরের এই তিন দশকে দুনিয়া নানান ওলটপালটের ভেতর দিয়ে গিয়েছে ও যাচ্ছে। এর ভেতরে যুদ্ধ ও শান্তি আর অপরাধ ও শাস্তির নানান ঘটনার ভেতরে গোলকায়ন বা গ্লোবালাইজেশন নামক এক গোলকধাঁধার পাকে-চক্করে পড়েছে। পরিবর্তন তো প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মোটামুটি স্বাভাবিক এক প্রগতিপ্রক্রিয়া। তবে গত তিরিশ বছরের মতন অল্প সময়ে অনেক বিষয়ে এমন আমূল বদল হয়েছে যা কল্পনারও অতীত। সে সময়েই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এমন কয়েকটি দিক চিহ্নিত করেছিলেন যে একটু তলিয়ে ভাবলে লেখক হিসেবে তার দূরদৃষ্টির পরিধিও বুঝে নেওয়া যায়। লেখাটির শুরুর দিকে তিনি জানাচ্ছেন, ‘ছোটগল্প তো তার জন্মলগ্ন থেকেই বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তির রোগ ও ক্ষয়কে তীক্ষèভাবে নির্ণয় করে আসছে।’ এটা ওই শিল্পমাধ্যম সম্পর্কে তার প্রস্তাবনার অংশ। আপাতত সেদিকে সম্পূর্ণ খেয়াল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু বোঝা দরকার একটি শিল্পমাধ্যম কী সামাজিক ক্ষতকে সরাসরি বিশ্লিষ্ট করে। এর বিশ্লেষণে তিনি যা বলেছেন :
১. ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচনের মচ্ছব চলে, সেখানে ব্যবস্থা এমনই মজবুত যে কোটিপতি ছাড়া কারও ক্ষমতা নেই যে নির্বাচিত হয়।’ ২. ‘রাজনীতি আজ ছিনতাই করে নিয়েছে কোটিপতির দল। এদের পিছে পিছে ঘোরাই এখন নিম্নবিত্ত মানুষের প্রধান রাজনৈতিক তৎপরতা।’ ৩. ‘রাজনীতি থেকে সর্বক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ বুলি হাঁকায় এমন অনেক সাচ্চা মুসলমানের মক্কা হলো আমেরিকা, ছেলেমেয়েদের আমেরিকা পাঠিয়ে তাদের গ্রিন কার্ড, ব্লু কার্ড না রেড কার্ড করার রঙিন খোয়াবে তারা বিভোর।’ ৪. ‘বিজ্ঞানচর্চা বাদ দিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফল ভয়াবহ, এর ফল হলো নিদারুণ সাংস্কৃতিক শূন্যতা এবং অপসংস্কৃতির প্রসার।’
এই চারটি উদ্ধৃতিই যথেষ্ট। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতন লেখক, ছোটগল্পের মুমূর্ষু-দশা কি না তা চিহ্নিত করতে গিয়ে নব্বইয়ের দশকের বা গত শতকের শেষ দশকের এই দেশের জনজীবনের উপরিতলের কয়েকটি সংকট নিয়ে এমনভাবে কথা বলেছেন যে, তাতে যদি তিনি ওই রচনার আগের অংশ কেউ না-পড়েন, অথবা শুধু শিরোনামটিই বিবেচনা করেন, অথবা লেখাটির শিরোনাম তিনি খেয়ালই করলেন না, তাহলে যিনি শুধু শিরোনামটুকু দেখবেন তার কাছে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি মনে হতে পারে। আবার যিনি শিরোনামটা খেয়াল করলেন না তার কাছে মনে হতে পারে রাজনৈতিক প্রবন্ধ। কিন্তু, একটি শিল্পমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সংকট বিবেচনা করার জন্যে সেই সমাজের চলমান গতিপ্রবাহকে যে একেবারে খোলনলচেসমেত দেখা প্রয়োজন, এই লেখা তার প্রমাণ। আর একই সঙ্গে এটিও খেয়াল রাখা দরকার, আজ থেকে তিরিশ বছর আগে এ দেশের রাজনৈতিক জীবনে, সামাজিক রাজনীতিক চৌহদ্দিতে যে মোচনীয় সংকটগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর কোনো সুরাহা তো হয়ইনি বরং বেশির ভাগ সংকট এখন একেবারে অমোচনীয় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে আর হচ্ছে। সেখানে এ দেশের মানুষের সামাজিক সাম্য অনেক দূরের বিষয় হিসেবে একজন গদ্যলেখকের কাছে ধরা দিতে পারে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার ব্যাখ্যায় সেই বিষয়গুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। কোনো সমাজকে বাদ দিয়ে বা পাশে সরিয়ে রেখে সাহিত্য সৃষ্টি হতে পারে না। একেবারে ব্যক্তিই যে লেখার বিষয়, ‘সমাজ’ সেখান থেকে যদি দূরেও থাকে, তবু ‘ব্যক্তির রোগ ও ক্ষয়’কে তীক্ষèভাবে তুলে ধরতে, দূরগত হলেও ওই সমাজ ও এর চালিকাশক্তি হিসেবে রাজনীতি ছায়ার মতন পাশে এসে দাঁড়ায়। তার গদ্যের রূপক কীভাবে বাস্তবের আড় ভাঙে, ‘একটি শ্যালো মেশিনের কলকব্জার মিস্ত্রিসুলভ বর্ণনায় উন্মোচিত হয় একটি গোটা এলাকার মানুষের হতাশা।’
সবচেয়ে তীব্র যে সংকট, সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখছেন, ‘বিজ্ঞানচর্চা বাদ দিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের ফল’; তার উদ্বেগ, ‘ভয়াবহ’। এর ফল হবে, ‘সাংস্কৃতিক শূন্যতা’ এবং ‘অপসংস্কৃতির’ প্রসার। এই দুটো বাক্যই সরাসরি তার লেখা থেকে নেওয়া। একটি বাক্য ছিল, কথার গুরুত্বটাকে দুই অংশে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে বোঝার সুবিধার জন্যে। একই সঙ্গে এটিও এখানে খেয়াল করা দরকার যে, প্রযুক্তির ব্যবহার গত দুই দশকে যে পরিমাণে বেড়েছে তা ১৯৯০-এর আগেপাছে সেভাবে ছিল না। আজ যা ইন্টারনেট, অনলাইন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ভিন্ন ভিন্ন উপাদান তখন অনেকের চিন্তার বাইরের বিষয় ছিল। এগুলো যে আসছে সে ইঙ্গিতও তো হয়তো ঠিকঠাক পাওয়া যায়নি। কিন্তু তখনকার প্রযুক্তি কীভাবে দিনে দিনে ক্ষতির কারণ হতে পারে তার মারাত্মক সমস্ত ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন। ওই কথার কুড়ি বছর বাদে, গত অন্তত বছর দশেক ধরে আমাদের চারদিকে সবচেয়ে বেশি যা হাহাকারে পরিণত, তা হলো প্রযুক্তির এক সর্বগ্রাসী রূপ, জনজীবনের সব ধরনের সংযোগের কায়দা আর ভাষা ও যোগাযোগকে একেবারেই উলটে দিয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত না-লিখলেও চলে। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চাহীন প্রযুক্তি, শিক্ষায় বিজ্ঞান-চিন্তাশূন্য একটি সমাজ যে সাংস্কৃতিক রক্তশূন্যতায় দারুণভাবে ভুগবে, সেই ভবিষ্যদ্বাণীর এমন সম্পূর্ণ ফলে যাওয়া বিস্ময়কর। সংস্কৃতি অপ আর সাধু বলে কিছু নেই। কিন্তু আখতারুজ্জামান এখানে অপসংস্কৃতি বলতে কী বুঝিয়েছেন সেটি ভাঙিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। সাংস্কৃতিক শূন্যতা এখন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে এ বিষয়েও প্রত্যেকের ধারণা আছে। এখানে বলার কথা আর বোঝার কথা, যে বাস্তবতায় একটি সমাজ তখন প্রবেশ করেনি, তার অনেক আগেই তিনি সেই বিষয়ে, একজন ছোটগল্প লেখক একটি সমাজে যে সংকটে ভবিষ্যতে মুখোমুখি হবেন বলে মনে করছেন, তিনি দিয়েছেন তার চরম পূর্বাভাস।
তাহলে, ‘ছোটগল্প কী করে যাচ্ছে?’, এ কথায় ওই শিল্পমাধ্যম একটি সামাজিক বাস্তবতায় যে সংকটে পড়েছে ও পড়বে, সেকথা তিনি স্বীকার করেছেন, কিন্তু একথা বলেননি যে মাধ্যমটি মরে যাচ্ছে, আজ বা আগামীকাল এর মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা যাবে। সেখানে একেবারে স্পষ্টই জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে এই মাধ্যমে কাজ করতে গেলে, এই যে এমন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ওলটপালট এর সবটা কি আর ছোট প্রাণ ছোট কথায় ধরা যাবে! ছোট দুঃখ বলে আজ আর তো প্রায় কিছুই নেই। বরং ওই ছোট দুঃখর ভেতরে তাকিয়ে পড়লে দেখা যায়, ‘তার মস্ত প্রেক্ষাপট, তার জটিল চেহারা এবং কুটিল উৎসব’। সেই কারণে ওই একটি বিষয়কে কেন্দ্রে রেখে, লেখক যেন কোনোভাবেই একে বাগে আনতে পারেন না বলে সে সব জায়গা নিয়ে নিচ্ছে উপন্যাসে। ছোটগল্প লেখকের করার আর কিছুই থাকছে না। ফলে অমন ‘মস্ত দুঃখে’র অথবা ‘সুখে’র জীবনের আরও যা-যা তা ছোটগল্প আগামী দিনে ধরতে পারবে তো? এ ভবিষ্যৎদ্রষ্টার বক্তব্য। ওই লেখার শেষ দিকে এ কথাও আছে, ছোটগল্পের পরীক্ষিত আর পোষমানা রীতির বাইরে গিয়ে সেদিনের লেখককেই এর জন্যে প্রয়োজনীয় পথ খুঁজে নিতে হবে। শুধু কাহিনী কিংবা কাহিনীহীনতার কাহন দিয়ে ছোটগল্পের আঁটোসাঁটো গড়নকে প্রকৃত ছাঁচ দেওয়া যাবে না।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এ কথাগুলো, যদি বোঝাবুঝি মোটামুটি ঠিকঠাক হয়ে থাকে, সেখানে নিরাশার কোনো বাণী নেই। এরপরের তিন দশকে বাংলা ভাষায় অসংখ্য ছোটগল্প রচিত হয়েছে। খোপে-পোরা, খোপভাঙা, আঁটো গড়নের বাইরে কিংবা গড়ন মেনে অথবা না মেনে, সবই তো ঘটেছে। কিন্তু জনজীবনের সাংস্কৃতিক মানের শূন্যতা, ওই ‘অপসংস্কৃতি’, ‘বিজ্ঞানচর্চাহীনতা’ তাও আজকের লেখকের বিষয়, অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যে সামাজিক রক্তশূন্যতার ইঙ্গিত আছে ওখানে, তা গল্প কিংবা উপন্যাসের মতন কাহিনীগদ্যে যেভাবেই ধরা পড়–ক, সাহিত্য পাঠেরও তো এক সাংস্কৃতিক মান থাকে! আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেকথা বলেননি, সেই অবস্থা দেখেও যাননি, হয়তো প্রযুক্তির নাম করে ইঙ্গিত দিয়েছেন মাত্র। সেই ভাষিক সাংস্কৃতিক মান না থাকলে কোনো কিছু ঠিকঠাক ধরা যাবে তো? নাকি তখন বিষয়টা দাঁড়াবে এই ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে নয়, ‘কি’ অব্যয় অপ্রয়োজনীয়, ‘মরে যাচ্ছে’ বললেও দেখা যাবে সমাজ থেকে তাকে ধরার প্রয়োজনীয় ভাষাটাই হারিয়ে গেছে। ঘটিয়েছে তা বিজ্ঞানচর্চাহীন প্রযুক্তি। কারণ, প্রযুক্তির মোড়কে সে ভাষার কাব্য বা উপন্যাসের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সোজা নয়, কিন্তু ছোটগল্পের ছোট প্রাণে আঘাত দেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে কিছুটা আছে। সেদিন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই রচনার ভিন্ন পাঠ দাঁড়াবে। তখন তা আবার পড়া যাবে।
লেখক কথাসাহিত্যিক
