টাঙ্গাইল ও গাজীপুরে ৮৬ স্কুলে বন্যার পানি

শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরা অনিশ্চিত

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৪৮ এএম

টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতির কারণে ৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ ও মাঠে বন্যার পানি রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় অন্তত ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ওঠায় পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে উপজেলার তুরাগ নদ, মকশ বিলসহ কয়েকটি বিলে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যা প্লাবিত এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কোথাও স্কুলমাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও আবার ক্লাসরুমেই ঢুকে পড়েছে পানি। কিছু  স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত পানি জমে আছে। টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের বন্যায় জেলার ১ হাজার ৬২৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬৬টি বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করে। ৩৪টি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও মাঠে এখনো পানি রয়েছে। ৬৯৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৭টি বন্যাকবলিত হয়। ২৭টি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এখনো বন্যাকবলিত। এ ছাড়া পাঁচটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় পাঠদানযোগ্য নয়।

সরেজমিনে জানা যায়, করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর স্কুল খোলার আনন্দে ভাসছে শিক্ষার্থীরা। এখনো জেলার প্লাবিত স্কুলগুলো পাঠদানের যোগ্য না হলেও শিক্ষক-কর্মচারীরা ধোয়ামোছা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সেরে রাখছেন। ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্কুলের ক্লাসরুম থেকে পানি নেমে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের অয়নাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এখনো বন্যার পানি। স্কুলে যাতায়াতের রাস্তাটি পানির নিচে। বিদ্যালয়ের তিনটি ভবনের মধ্যে দুটির শ্রেণিকক্ষে পানি রয়েছে। বেঞ্চগুলোও এক প্রকার পানির নিচে ভাসছে। একই উপজেলার গালারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। এ বিদ্যালয়ের মাঠে এখনো হাঁটুপানি। পশ্চিম দিকে একটি ভবনের প্রায় অর্ধাংশ পানির নিচে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বন্যার পানি নেমে না গেলে ছোট ছোট শিশুকে স্কুলে পাঠানো ঠিক হবে না। মাঠে এখনো পানি রয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পানি নেমে যাবে কি না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। সদর উপজেলার মগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠেও পানি জমে রয়েছে। সেখানে অবস্থিত মগড়া ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের মূল ভবনের সামনে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন স্থানীয়রা। বিদ্যালয়ের পুরো মাঠ পানির নিচে।

কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের হাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে পানি নেমে গেলেও কাদায় একাকার। প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীন জানান, স্কুলের মাঠ থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। কিন্তু এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নদী পার হয়ে স্কুলে আসে। এ ছাড়া স্কুলে আসার রাস্তাটি এখনো পানি নিচে। তারপরও স্কুল খোলার সব প্রস্তুতি তারা গ্রহণ করেছেন। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সঙ্গে তারা বৈঠকও করছেন।

টাঙ্গাইল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী আহসান জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত স্কুলগুলো নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ যেকোনো উপায়ে ১২ সেপ্টেম্বর শতভাগ স্কুল খোলা নিশ্চিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম জানান, এখনো বন্যাকবলিত স্কুলগুলো কীভাবে খোলা যায়, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেসব এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে, সেগুলোতে নির্দেশনা অনুযায়ী ক্লাস চলবে। ১২ সেপ্টেম্বর জেলার সবগুলো বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গাজীপুরে ২০ স্কুলে পাঠদান অনিশ্চিত : উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। অধিকাংশ স্কুলেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সব প্রস্তুতি স¤পন্ন হয়েছে। তবে উপজেলার ২০টি স্কুলে ও স্কুলের মাঠে বন্যার পানি ওঠায় পাঠদান শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার ঢালজোড়া ইউনিয়নের বাসুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে প্রায় ৫ ফুট পানি জমে আছে। স্কুলের বারান্দায়ও পানি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এক দিনেই স্কুলের ভেতরে পানি ঢুকে যাবে। ওই ইউনিয়েনের ঢালজোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেওয়াইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। কোনোটি একেবারে ডুবে গেছে আবার কোনোটির মাঠ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। একই অবস্থা দেখা গেছে মৌচাক ইউনিয়নের বাঁশতলী ও কুন্দাঘাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

বাসুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মালেক হোসেন বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর শিক্ষার্থীদের দেখি না। দীর্ঘদিন পর তাদের সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে। আবার সেই হইচই হবে। কিন্তু স্কুল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় সবার মন খারাপ হয়ে গেছে।’

বাঁশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি আলতাফ হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুলে ক্লাস করার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্কুলটি তুরাগ নদের পাড়ঘেঁষা হওয়ায় আর বন্যার পানি বেড়ে যাওয়ায় স্কুলের মাঠে এখন হাঁটু পানি জমে আছে। যার কারণে ক্লাস করানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘গাজীপুর জেলায় মোট ৭৮১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কালিয়াকৈর উপজেলার ১২২ স্কুলের মধ্যে ২০টি স্কুলের মাঠে, রাস্তায় ও স্কুলের ভেতরে পানি ওঠায় পাঠদান পরিচালনা করা যাবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত