দেশে করোনার টিকাদানে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকার মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশকে করোনার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য গত বাজেট বক্তৃতায় একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়। সেখানে প্রতি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়ার কথা বলা হয়। আর আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার টিকা দিতে চায় ৮ কোটি মানুষকে। কিন্তু টিকার বর্তমান গতি ও সরবরাহের কারণে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৮ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এমনকি বর্তমানে সরকার যে হারে টিকা দিচ্ছে, সে অনুযায়ী ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে সরকারের সময় লাগবে সাড়ে চার বছর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক ২০২০’ তথ্য অনুযায়ী দেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার। সে হিসেবে ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার পযন্ত পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন মাত্র ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ বা ১০ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ গত ৭ মাস ৩ দিনে সরকার পূর্ণ টিকা দিতে পেরেছে ১ কোটি ৩২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০১ জনকে। এখনো টিকা বাকি ৭০ শতাংশ মানুষের।
অন্যদিকে, সরকার যে হারে টিকা দিচ্ছে, তাতে ৮০ শতাংশ মানুষের টিকা দিতে সর্বসাকল্যে চার বছর আট মাস সময় লেগে যাওয়ার কথা। তবে গণটিকাদান কর্মসূচির আদলে যদি টিকা দেওয়া হয়, তাহলে এই সময়সীমা কমে আসবে ২ বছর ৪ মাসে। আর সরকারি রোডম্যাপ অনুযায়ী যদি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দেওয়া হয়, তাহলে সবাইকে টিকার আওতায় আনতে সময় লাগবে চার বছর চার মাস।
তবে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৮ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার যে পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, তা পূরণে সংশয় রয়েছে। কারণ আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে আট কোটি মানুষকে টিকা দিতে হলে মোট টিকা লাগবে ১৬ কোটি ডোজ। এর মধ্যে দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৫১৫ ডোজ। আর লাগবে ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৮ হাজার ৪৮৫ ডোজ। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে ৫০ লাখ করে টিকা আসবে। বর্তমানে মজুদ আছে ৫০ লাখের কিছু বেশি টিকা। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে টিকা আসবে ৮ কোটি ডোজ। এই টিকা দিয়ে ৪ কোটি মানুষকে সম্পূর্ণ টিকা দিতে পারবে। অবশিষ্ট ২ কোটি মানুষ টিকার আওতার বাইরে থাকবে। অর্থাৎ আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছয় কোটি মানুষকে দুই ডোজ করে পূর্ণ টিকা দেওয়া সম্ভব হবে।
টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘ হলে বর্তমান হিসাবের চেয়ে টিকা বেশি লাগবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কম সময়ের মধ্যে সবাইকে টিকার আওতায় আনা না গেলে পরে পূর্ণ ডোজ টিকা পাওয়া মানুষদের আবার নতুন করে টিকা দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৮ কোটি মানুষকে টিকা দিতে হলে টিকাদান কর্মসূচির গতি বাড়াতে হবে এবং টিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। বর্তমান হারে টিকা দেওয়া চলতে থাকলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষিত সময়ের মধ্যে ৮ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনা কিছুতেই সম্ভব হবে না।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা পরিষ্কার, টিকার প্রাপ্যতার ওপর টিকাদানের গতি নির্ভর করে। বাংলাদেশ গণটিকার আদলে যে পরিমাণ টিকা দিয়েছে, তার তিনগুণ টিকা দেওয়ার সক্ষমতা স্বাস্থ্য বিভাগের রয়েছে। আমরা যথেষ্ট পরিমাণ টিকা পাচ্ছি না। তাই দিতে পারছি না। উন্নত দেশগুলো যে পরিমাণ টিকা পাচ্ছে, আমরা পেলে আমাদের লক্ষ্য মাত্রা পূরণ করতে পারব।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভাবছে আমাদের কাছে টিকা আসলে আমরা টিকার যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারব না। তাই তারা দিচ্ছে না। আমরা টিকা বৈষম্যের মধ্যে পড়ে গেছি। এই বৈষম্য দূর করতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সবাইকে একসঙ্গে টিকা দিতে না পারলে, দেখা যাবে যারা আগে টিকা দেবে ও যারা শেষের দিকে টিকা দেবে, তখন প্রথমে যারা টিকা দিয়েছিল তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাবে। তখন তাদের আবার টিকা দিতে হবে। টিকার পরিমাণ বেড়ে যাবে। তাই দ্রুতগতিতে টিকা দিয়ে দিতে হবে।
সম্পূর্ণ টিকা (দুই ডোজ) পেয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ : গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। সে হিসেবে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৭ মাস ৩ দিনে ৮০ শতাংশের মধ্যে মাত্র ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ বা পূর্ণ টিকা দিতে পেরেছে সরকার। এ সময় দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন ১ কোটি ৩২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০১ জন। আর এক ডোজ টিকা নিয়েছেন ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ ২ কোটি ৪ লাখ ৩৭ হাজার ১১৪ জন। এ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে মোট টিকা নিয়েছেন ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৫১৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাদান কর্মসূচির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকার ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সে হিসেবে মোট টিকা পাওয়ার কথা ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার মানুষের। এই জনসংখ্যার মধ্যে পূর্ণ টিকা পেয়েছেন ১০ শতাংশ মানুষ। এখনো বাকি ৭০ শতাংশ মানুষ।
৮০ শতাংশকে টিকা দিতে সময় লাগবে ৪ বছরের বেশি : গত বাজেট বক্তৃতায় সরকার টিকাদান কর্মসূচির রোডম্যাপ ঘোষণা করে। সেখানে বলা হয়, প্রতি মাসে ২৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। এ হারে টিকা দিলে নির্দিষ্ট জনসংখ্যাকে টিকা দিতে সরকারের সময় লাগবে ৫২ মাস বা চার বছর ৪ মাস। তবে গণটিকার আদলে টিকা দিলে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সরকারের সময় লাগবে ২ বছর তিন মাসের মতো। কারণ গণটিকাদানসহ বর্তমানে মাসিক গড় টিকা ৪৮ লাখ ১৩ হাজার ৭৩।
ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৮ কোটি মানুষের টিকা নিয়ে সংশয় : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার ৮ কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। আর গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে ৫০ লাখ করে টিকা আসবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির মধ্যে মোট টিকা লাগবে ১৬ কোটি ডোজ। এর মধ্যে ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৫১৫ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মজুদ আছে ৫০ লাখের কিছু বেশি। সে হিসেবে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৮ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হলে আরও ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৮ হাজার ৪৮৫ ডোজ টিকা লাগবে। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে ৫০ লাখ হিসাবে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে টিকা আসবে ৮ কোটি ডোজ, যা দিয়ে চার কোটি মানুষকে টিকা দিতে পারবে সরকার। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সে সময়ের মধ্যে ২ কোটি মানুষ টিকার আওতার বাইরে থাকবে।
বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে : টিকার দিক থেকে এখনো বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের করোনা আক্রান্ত দেশগুলোর অনেক নিচে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে টিকাদানে এগিয়ে আছে ভুটান। এদেশ ৭২ দশমিক ৭২ শতাংশ টিকা দিয়েছে। এরপর মালদ্বীপ ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলংকা ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, ভারত ৩৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ ও পাকিস্তান ২২ শতাংশ মানুষকে টিকা দিয়েছে। এরপর বাংলাদেশের অবস্থান। এখানে পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়েছে ১০ শতাংশ মানুষকে। সবার শেষে আফগানিস্তান, সেখানে টিকা দেওয়া হয়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষকে।
এছাড়া টিকাদানে এগিয়ে রয়েছে সৌদি আরব ৮৯ শতাংশ, পর্তুগাল ৮৬ শতাংশ, কাতার ৮০ শতাংশ, স্পেন ৭৯ শতাংশ ও উরুগুয়ে ৭২ শতাংশ মানুষকে টিকা দিয়েছে।
যেভাবে চলছে টিকাদান কর্মসূচি : গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ওই দিন ৩০ হাজার মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলিয়ে মোট ৯ লাখ ৬৭ হাজার ১১৪ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এই সংখ্যা চলমান টিকাদান কর্মসূচির স্বাভাবিক গতি নয়। কারণ গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ শুরু হওয়ায় সরকার টিকাদানে কয়েক দিনের জন্য গতি এনেছে। এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ সেপ্টেম্বর (মাঝখানে ৩ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক বন্ধের দিন টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল) প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলিয়ে ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯৬ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই পাঁচ দিন দৈনিক গড়ে টিকা পেয়েছেন ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৯ জন।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচির মোট সময় ছিল ৭ মাস তিন দিন। এ সময় দুই ডোজ মিলিয়ে মোট টিকা পেয়েছেন ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৫১৫ জন। সে হিসেবে এই সাত মাস তিন দিনে দৈনিক গড় টিকার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯০ ডোজ। এর মধ্যে ৭-১২ আগস্ট গণটিকা কর্মসূচি (সম্প্রসারিত আকারে) পালন করে সরকার এবং এ সময় প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ২২৭ জন। এর ফলে দৈনিক গড় টিকার পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।
