এহ্সান গ্রুপ। সাম্প্রতিক সময়ের এক আলোচিত নাম। দেশের দক্ষিণের জেলা পিরোজপুরে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন মো. রাগীব আহ্সান। সদর উপজেলার বাইপাস সড়কে বিভিন্ন ব্যক্তির জায়গা দখল করে বানান প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়। একসময় মসজিদে নামমাত্র বেতনে ইমামতি করা এই রাগীব আহ্সান এখন প্রতারণার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বলে ভাষ্য র্যাবের। বিভিন্ন নামে খুলেছেন ১৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখ টাকার বিনিয়োগে মুনাফা হিসেবে মাসিক মাত্রাতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার প্রলোভন দেখানো হতো গ্রাহকদের। আর এক্ষেত্রে ধর্মকে ব্যবহার করা হতো হাতিয়ার হিসেবে।
সাধারণ মানুষ ছিল এহ্সান গ্রুপের মূল টার্গেট। প্রতিষ্ঠানটি এজন্য মসজিদের ইমাম এবং মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়। কারণ ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্রদের কথা সাধারণ ধর্মভীরু মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে। আর এসব প্রতিনিধিদের কথায় মুগ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ এহ্সান গ্রুপে টাকা জমা রাখতেও শুরু করে। এছাড়া এহ্সান গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হতো। এসব মাহফিলে কৌশলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক প্রচারণা চলত। সবমিলিয়ে দ্রুততম সময়ে এহ্সান গ্রুপের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে গ্রাহকও বাড়তে থাকে হু-হু করে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, এহ্সান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রাগীব আহ্সান ১৯৮৬ সালে পিরোজপুরের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত হাটহাজারীর একটি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস এবং ১৯৯৯-২০০০ পর্যন্ত খুলনার একটি মাদ্রাসা থেকে মুফতি সম্পন্ন করে পিরোজপুরের একটি মাদ্রাসায় চাকরি নেন। ২০০৬-২০০৭ সালে তিনি ইমামতির পাশাপাশি ‘এহ্সান এস মাল্টিপারপাস’ নামে একটি কোম্পানিতে ৯০০ টাকা বেতনে চাকরি নেন। পরে রাজধানী ঢাকার একটি এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) কোম্পানিতে কাজ নেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলেন এহ্সান গ্রুপ। প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন কওমি মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক ও মসজিদের ইমামদের। মুফতি রাগীব আহসান পিরোজপুর পৌরসভার বড় খলিশাখালী গ্রামের আবদুর রব খানের ছেলে। রাগীব আহ্সান প্রথমে নিজ জেলা ও পাশর্^বর্তী বিভিন্ন উপজেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সুপরিচিত মাওলানা ও হুজুরদের এনে ওয়াজ মাহফিল করাতেন। তবে এই ওয়াজ মাহফিলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তার প্রতিষ্ঠানের প্রচার। মাহফিলের প্যান্ডেলের একপাশে থাকত এহ্সান মাল্টিপারপাসের ছোট ছোট ঘর। যেখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হতো বিভিন্ন মেয়াদি আমানত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমবায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০০৮ সালে পিরোজপুর জেলা সমবায় কার্যালয় থেকে অনুমোদন পায় এহ্সান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি। পিরোজপুর জেলা শহরের শের-ই-বাংলা পাবলিক লাইব্রেরি ভবনের তিন তলায় গড়ে তোলা হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি চাকরিভিত্তিক কোনো কর্মী নিয়োগ না করে নিয়োগ দিতে শুরু করে কমিশনভিত্তিক এজেন্ট। কোনো এজেন্ট যদি এক লাখ টাকা জামানত এনে দিতে পারেন, তাহলে তিনি কমিশন হিসেবে পাবেন ৬০০০ টাকা। আর গ্রাহককে এহ্সান গ্রুপের সাইনবোর্ডসর্বস্ব ১৭টি প্রতিষ্ঠানের কথিত মুনাফার একটি অংশ দেওয়ার লোভ দেখানো হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহককে দেওয়া হতো এহ্সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেডের নামে একটি জমা ভাউচার।
পিরোজপুর শহরের শের-ই-বাংলা পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা নকিব জানান, এহ্সান গ্রুপ ২০০৮ সালের শুরুর দিকে শের-ই-বাংলা পাবলিক লাইব্রেরি ভবনে বেশ কয়েকটি অফিস ও দোকান ভাড়া নিলেও দেনার দায়ে বর্তমানে তাদের কোনো প্রতিষ্ঠান এই ভবনে নেই। বর্তমানে তাদের কাছে লাইব্রেরি কর্র্তৃপক্ষের প্রায় ৮ লাখ টাকার মতো ভাড়া পাওনা রয়েছে। ভবনটির চারতলায় তাদের মক্কা হোটেল নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালুর কথা থাকলেও তা চালু করতে পারেনি। ভবনের চতুর্থ তলায় মাল্টি পারপাসের যে অফিস ছিল সেটিও ২০২০ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কর্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। এছাড়া একই ভবনের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় এহ্সান গ্রুপের মালিকানায় ছিল পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ এবং পিরোজপুর বস্ত্রালয়-২ নামে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তবে সেগুলো বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে ভিন্ন নামে পরিচালিত হচ্ছে অন্য মালিকানায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে পিরোজপুর পৌরসভার খলিশাখালী এলাকায় এহ্সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর পিরোজপুর পৌর শহরের সিও অফিস মোড়সংলগ্ন এলাকায় জমি কিনে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন রাগীব আহ্সান। প্রতিষ্ঠানটির নতুন নাম দেওয়া হয় এহ্সান গ্রুপ। যার অধীনে রয়েছে এহ্সান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, এহ্সান সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড, ড্যাফোডিল মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, এহ্সান বেসিক সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড এবং এহ্সান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড নামে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। অধিক মুনাফা দেওয়ার কথা বলে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে আমানত সংগ্রহ করে আসছিল এহ্সান গ্রুপ। তাদের রয়েছে ১ হাজার ২০০ এজেন্ট। যারা প্রতি এক লাখ টাকা আমানতের বিপরীতে মাসে ২ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে পিরোজপুর এবং এর পার্শ্ববর্তী ঝালকাঠি ও বাগেরহাট জেলার ৫০ হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় শতকোটি টাকা সংগ্রহ করেন।
পিরোজপুর সদর উপজেলার দুর্গাপুর চুঙ্গাপাশা সিনিয়র মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মো. এখলাছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এহ্সান গ্রুপের টার্গেট ছিল সাধারণ মানুষ। এজন্য তারা মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়। ইমাম ও শিক্ষকদের কথায় বিশ্বাস করে মানুষ টাকা আমানত রাখেন। এছাড়া এহসান গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন এলাকায় মাহফিল হতো। এসব মাহফিলে তারা প্রচুর প্রচার চালাতেন। ফলে দ্রুত সময়ে এহ্সান গ্রুপের নাম ছড়িয়ে পড়ে।’
এহ্সান গ্রুপের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা মো. হারুনার রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এহ্সান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে মাঠকর্মী (এজেন্ট) হিসেবে কাজ করে আসছি। আমার মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। আমি এখন গ্রাহকের টাকা কীভাবে ফেরত দেব তা ভেবে দিশেহারা। দীর্ঘদিন ধরে তারা গ্রাহকের সঙ্গে এ ধরনের প্রতারণা করে আসছে।’
ভুক্তভোগীরা জানান, আড়াই বছর আগে ব্যবসায়িক অংশীদার হুমায়ুন কবিরের দেওয়া চেক ডিজঅনার মামলায় রাগীব আহ্সান গ্রেপ্তার হন। তার হাজতবাসের খবরে সদস্যদের মধ্যে আমানত খোয়ানোর আশঙ্কা দেখা দিলে গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরত নিতে শুরু করেন। কিছুদিন পর জামিনে মুক্তি পান রাগীব। ২০১৯ সালের জুলাই মাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের মাসিক মুনাফা ও আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে প্রায়ই প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে জামানতের টাকা ফেরত পেতে ভিড় করতেন গ্রাহকরা। তারা মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেও কোনো ফল পাননি। টাকা ফেরত চেয়ে অনেকে হামলার শিকারও হয়েছেন।
তাদের একজন পিরোজপুরের কাউখালীর হোগলা গ্রামের মোহাম্মদ বাবুল আহ্সান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২০ সালের ৩ জুলাই টাকা ফেরত চাইতে গেলে এহ্সান গ্রুপের ভাড়াটে লোকজন আমার শরীরে দাহ্য তরল পদার্থ নিক্ষেপ করে। এতে আমার ডান হাত ও পা পুড়ে যায়।’
পাওনা টাকা ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন : এহ্সান গ্রুপের কাছে জমা থাকা টাকা ফেরতের দাবিতে পিরোজপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় শহরের বাইপাস সড়কে এহ্সান গ্রুপের কার্যালয়ের সামনে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। ঘণ্টাব্যাপী সমাবেশে বক্তারা বলেন, এহ্সান গ্রুপের পরিচালক রাগীব আহ্সান ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা গ্রাহকদের থেকে আত্মসাৎ করেছেন। নিজেকে যাতে জবাবদিহিতার মুখে না পড়তে হয় সেজন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বানিয়েছেন তার স্ত্রী সালমা বেগমকে, উপদেষ্টা বানিয়েছেন তার বাবা আব্দুর রব খানকে, প্রতিষ্ঠানের সহ-সভাপতি বানিয়েছেন শ্বশুর মাওলানা শাহ আলমকে, ম্যানেজার বানিয়েছেন বোন জামাই নাজমুল ইসলামকে এবং তার ভাইদের রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ পদে। গ্রাহকদের টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নামে অনেক জায়গা কিনেছেন। গ্রাহকদের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন।
এহ্সান গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষণার দাবি জানিয়ে সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, গ্রাহকদের টাকায় কেনা এহ্সান গ্রুপের সব জমি, ১৭টি প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি জেলা প্রশাসনের দায়িত্বে রাখা হোক। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন এহ্সান গ্রুপের গ্রাহক মাওলানা রফিকুল ইসলাম, হাফেজ মাওলানা নাসির উদ্দিন, মাওলানা জাকির হোসেন, মাওলানা হারুন অর রশিদ প্রমুখ।
