চামড়া শিল্পে দায়িত্বহীনতার সুরাহা করুন

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২৭ এএম

বাংলায় ‘সম্ভাবনা’ আর ‘সম্ভব না’ কথা দুটির মধ্যে ধ্বনিগত সাযুজ্য বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কোনো সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে কেবল সম্ভাবনাতেই আটকে থাকলে সেটা যে একসময় অনিবার্যভাবে ‘সম্ভব না’-তে পর্যবসিত হবে সেটা সাধারণ মানুষও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝেন। কিন্তু দেশে চামড়া শিল্পের কর্ণধারদের মধ্যে এই বোধোদয়ের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরেই চামড়া শিল্প নিয়ে গর্ব করে বলা হয় যে, এটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। রপ্তানি আয়ের হিসাবে এটা সত্য বটে। কিন্তু বাস্তবে এক দশক ধরেই চামড়া শিল্প খাত পতনশীল। ২০১৩-১৪ সাল থেকে চামড়া খাতের আয় ১ দশমিক শূন্য ৮ থেকে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করছে। অন্যদিকে, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পের ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেওয়া আর একটা পরিবেশবান্ধব ও মানসম্মত চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলা নিয়ে গত দুই দশকের টানাহেঁচড়ার কোনো সুরাহা এখনো হলো না। ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-বিসিক। ট্যানারি মালিকদের অনীহা সত্ত্বেও ২০১৭ সালের এপ্রিলে আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগের কারখানাগুলোকে হেমায়েতপুরে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু আগে হাজারীবাগের ট্যানারির দূষণে আগে বুড়িগঙ্গা মারা যাচ্ছিল, এখন হেমায়েতপুরের ট্যানারির দূষণে ধলেশ^রী মৃতপ্রায়। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, চামড়া শিল্পে এই দায়িত্বহীনতা আর কতদিন চলতে থাকবে?

রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘ট্যানারি শিল্প নগরী কেন বন্ধ হবে না’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সাভারের হেমায়েতপুরে বিসিকের চামড়া শিল্প নগরীর ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্বেগ এবং একটি জরুরি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিকে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে দৈনিক ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপন্ন হয়। অথচ যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২৫ হাজার ঘনমিটার। অর্থাৎ দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য প্রাকৃতিক পরিবেশে মিশে দূষণ ঘটাচ্ছে। এভাবে গত তিন বছরে মোট এক কোটি ৬৪ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চামড়া শিল্পের বিপুল পরিমাণের দূষিত বর্জ্যে ধলেশ্বরী নদী এখন হুমকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সাভারের চামড়া শিল্প নগরী ‘কেন বন্ধ করা হবে না’, তা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কাছে জানতে চেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। গত ৯ সেপ্টেম্বর বিসিকের চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে ‘সুস্পষ্ট’ ব্যাখ্যা দাবি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। চিঠিতে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা না গেলে চামড়া শিল্প নগরীর কর্মকা- ‘আপাতত বন্ধ রাখার’ সুপারিশ করে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে যথাযথভাবে আইন অনুসরণ করে কমপ্লেক্সটি পরিচালিত হলে পুনরায় তা চালু করার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। এছাড়া বন্ধের আগ পর্যন্ত জরিমানার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ আদায়েরও সুপারিশ করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের এই উদ্যোগ সাধুবাদ যোগ্য।

লক্ষ করা জরুরি, শুরুতে কথা ছিল চামড়া শিল্প নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্যানারিগুলো নিজেরাই ইটিপি স্থাপন করবে। কিন্তু ট্যানারিগুলো তা না করায় শিল্প মন্ত্রণালয় প্রকল্পের আওতায় সিইটিপি স্থাপনের সিদ্ধান্তসহ ২০১০ সালে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও সিইটিপির বিভিন্ন কম্পোনেন্টের কাজ শেষ না হওয়ায় ১৩০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সেখানে উৎপাদন শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে চামড়া শিল্পের রপ্তানি বাজারে অগ্রগতির বদলে ধস, আরেকদিকে বহুল আলোচিত নতুন চামড়া শিল্প নগরীতেও চলছে পরিবেশ ও নদীদূষণ। অথচ রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীদূষণ ও হাজারীবাগ-কামরাঙ্গীরচর এলাকার পরিবেশ রক্ষার জন্যই ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেওয়ার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। দেশে চামড়া শিল্পের এই সব ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্যবস্থাপনার ভুল, দূরদর্শিতার অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতা ও দুর্নীতির কারণেই এই শিল্প খাতের ধারাবাহিক পতন ত্বরান্বিত হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে, এরপরও চামড়া শিল্পের সংকট নিরসনে সচেষ্ট না হয়ে সরকার, ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন-বিসিক এখনো পারস্পরিক দোষারোপে লিপ্ত। অন্যদিকে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প খাতে শতকরা ৬০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের সুযোগ থাকলেও পরিবেশ দূষণ ও মাননিয়ন্ত্রণের অভাবে দেশীয় চামড়াজাত পণ্যের অনুকূলে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) ছাড়পত্র না থাকায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। কিন্তু সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনো পুরোপুরি সচল হচ্ছে না। এমতাবস্থায় দেশের চামড়া শিল্প রক্ষায় সরকারের কঠোর পদক্ষেপ কাম্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত