পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সাফকো স্পিনিং মিলসে আর্থিক প্রতিবেদনে অসামঞ্জস্য, কোম্পানির তহবিলের অপব্যবহারসহ নানা ধরনের অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। কোম্পানিটিকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে এসইসি। একইসঙ্গে কোম্পানির সার্বিক অবস্থা যাচাইয়ে বিশেষ নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত রবিবার এসইসির উপ-পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
২০১৮-১৯ হিসাব বছর থেকে সাফকো স্পিনিং লোকসানে রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিটিকে স্বাভাবিক ব্যবসায় ফেরাতে কোম্পানিটিতে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালকরা হচ্ছেন- সিনিয়র আইনজীবী এস. এম মুনির, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার মুস্তাফিজুর রহমান, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি মো. ওয়ালি উল্লাহ ও অধ্যাপক ড. সুমন দাস।
সাফকো স্পিনিংয়ের সার্বিক অবস্থা নিয়ে তদন্ত করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এতে করে যেসব অনিয়ম খুঁজে পাওয়া গেছে, তারমধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিক্রির চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে, যা অবাস্তব বলে মনে করছে কমিশন।
সাফকো স্পিনিংকে দেওয়া চিঠিতে, ডিএসইর প্রতিবেদন ও নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব থেকে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোম্পানি ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পরিশোধিত মূলধনের ৮৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ পুঁজিবাজার থেকে বৃদ্ধি করেছে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। এই পণ্য উৎপাদনে ৩৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে আর্থিক হিসাবে জানিয়েছে। অর্থাৎ পণ্য বিক্রির চেয়ে উৎপাদন ব্যয় বেশি। যেটাকে অবাস্তব বলছে এসইসি।
এদিকে সাফকো স্পিনিং থেকে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ব্যক্তিগত কোম্পানিতে এসইসির নির্দেশনা অমান্য করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রিভ্যালুয়েশন সারপ্লাসের ওপর অবচয়ের জন্য বিলম্বিত কর সমন্বয় না করেই ৭১ লাখ টাকা রিটেইন আর্নিংসে স্থানান্তর করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস)-৬৪ এর ২০ অনুসরণ করা হয়নি। এই কোম্পানির ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আর্থিক হিসাব যথাযথভাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরের মাধ্যমে সত্যতা স্বীকার করা হয়নি। কোম্পানিটির ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে টার্ম ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এতে করে সুদজনিত ব্যয় ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১১ কোটি ৭১ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। যা কোম্পানির লোকসান বয়ে আনে।
এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে নমিনেশন অ্যান্ড রিমিউনারেশন (এনআরসি) কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ওই আর্থিক হিসাবের পরিচালকদের রিপোর্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বাক্ষর করে বিএসইসির নির্দেশনা অমান্য করা হয়েছে। এসব বিষয়সহ অন্যান্য দিক বিবেচনায় সাফকো স্পিনিং যথাযথভাবে এগোতে পারছে না বলে কমিশনের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। অথচ এই কোম্পানিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৭০ শতাংশ। কিন্তু তারা লভ্যাংশ পাচ্ছে না। যা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ পরিপন্থী এবং কমিশনের কাছে অপ্রত্যাশিত। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের সম্পদ বিক্রি, বন্ধকী, হস্তান্তর করতে পারবে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া কোম্পানির সার্বিক বিষয়াদি যাচাইয়ের জন্য বিশেষ নিরীক্ষা করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০০০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সাফকো স্পিনিংয়ে পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ২৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
