তৈরি পোশাক কারখানায় করোনা-উত্তর একই ধরনের মজুরি পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন ৬৩ শতাংশ শ্রমিক। তবে ১৯ শতাংশ এ ব্যাপারে অনিশ্চিত। ১৬ শতাংশ স্বাভাবিকের চেয়ে কম মজুরি পাবেন বলে ধারণা করছেন। কম মজুরি পেলে খাবারের পেছনে ব্যয় কমাবেন বলে জানিয়েছেন ১৮ শতাংশ শ্রমিক।
বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, আয়-ব্যয়, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মজুরি প্রদান ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও মাইক্রোফাইন্যান্স অপরচুনিটিজ (এমএফও) যৌথভাবে ‘গার্মেন্ট ওয়ার্কার ডায়েরিজ’ নামে একটি জরিপ পরিচালনা করছে। গতকাল এক ওয়েবিনারে সেই জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।
জরিপে উঠে আসে, পোশাকশ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন না এবং কারখানার মালিকরা তাদের উদ্বেগ কমাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেননি। শ্রমিকদের তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে, শ্রমিকদের উদ্বেগ নিরসনে ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ কর্র্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন, রপ্তানি ও সামগ্রিকভাবে পুরো অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কারখানার মালিকপক্ষ, সরকার, নীতিনির্ধারক ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলোকে সম্মিলিতভাবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলে মনে করে সানেম।
জরিপ অনুসারে, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মজুরি পাওয়ার প্রত্যাশা করেন এমন শ্রমিক রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ, যাদের মধ্যে প্রায় সবাই বেশি ওভারটাইম কাজ করেছেন। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত আসার পর পোশাকশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। আগস্টের ৬ তারিখে পরিচালিত এ জরিপে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের কাছে লকডাউন চলাকালীন কাজে ফেরার নির্দেশের ব্যাপারে তাদের মনোভাব জানতে চাওয়া হয়। ৮৪ শতাংশ শ্রমিক জানান, তারা বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চালু হওয়ার পর প্রথম সপ্তাহে শ্রমিকদের উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম ছিল।
মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা বাদে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৭ শতাংশ পোশাকশ্রমিক জানান, তাদের কারখানায় কভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই ৪৭ শতাংশের মধ্যে ৮৩ শতাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত পদক্ষেপগুলো সংক্রমণ রোধে যথেষ্ট ছিল। যদিও এ জরিপের প্রায় প্রতিটি প্রশ্নের ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা একই রকম উত্তর দিয়েছেন, এই প্রশ্নের ক্ষেত্রে তাদের মাঝে ভিন্নমত দেখা যায়। ৮৭ শতাংশ নারী ও ৭১ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক মনে করেন, কারখানায় নেওয়া অতিরিক্ত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট ছিল।
এ জরিপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক নীতিগ্রহণ ও বৈশ্বিক ব্যান্ডগুলোকে শ্রমিকমুখী উদ্যোগ নিতে সহায়তা করা, যা পোশাকশ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টায় এবং তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব আরও ভালোভাবে বুঝতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে সহায়তার ক্ষেত্রেও এ জরিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এ জরিপের অধীনে সানেম ও এমএফও ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে বাংলাদেশের মূল পাঁচটি শিল্প এলাকায় (চট্টগ্রাম, ঢাকা শহর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার) কর্মরত পোশাকশ্রমিকদের সম্পর্কে প্রতি মাসে তথ্য সংগ্রহ করছে। গত ৬ আগস্ট, ২০২১-এ ১ হাজার ২৭৮ জন শ্রমিকের একটি নির্বাচিত পুলের মধ্যে ফোনে পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ জরিপে অংশগ্রহণকারী তিন-চতুর্থাংশের বেশি উত্তরদাতা নারী শ্রমিক, যা সামগ্রিকভাবে এ শিল্পের বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। এ জরিপে পোশাকশ্রমিকদের মাঝে কভিড-১৯-এর কারণে ঘোষিত লকডাউনের প্রভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা ও আগামীতে মজুরি হ্রাস-বৃদ্ধির সম্ভাবনার ব্যাপারে তাদের মনোভাবের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
