প্রায় ১৮৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ৯৬ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করার অভিযোগে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান, তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. শফিউল্লাহ বাদী হয়ে মামলাগুলো করেন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক জানান, এসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ১৮৩ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার ২৬৪ টাকার ‘অবৈধ সম্পদ’ অর্জন এবং ৯৬ কোটি ২৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৩৯ টাকার সম্পদের ‘তথ্য গোপনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়, আবদুল খালেক পাঠান, তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম, ছেলে মো. মাসুম পাঠান এবং দুই মেয়ে খালেদা পারভীন ও তানসিন কেয়ার নামে ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়। পরে তাদের নামে আলাদা পাঁচটি সম্পদ বিবরণী জমা দিতে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ২৩ জুন দুদক সচিব বরাবর তারা সম্পদের হিসাব দাখিল করেন। সেই সম্পদ বিবরণী যাচাই ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপন করার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে মামলার বাদী শফিউল্লাহ জানিয়েছেন।
আবদুল খালেক পাঠানের বিরুদ্ধে করা মামলায় বলা হয়, সম্পদ বিবরণীতে তার নামে স্থাবর-অস্থাবরসহ ৪৪৬ কোটি ৮৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৭ টাকার সম্পদ রয়েছে বলে তিনি হিসাব দিয়েছেন। কিন্তু ওই হিসাব যাচাই করে তার নামে ৪৯৬ কোটি ২৮ লাখ ৬ হাজার ৪২৪ টাকার সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনি ৪৯ কোটি ৩৯ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৭ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। অন্যদিকে তার ১৯৯৮-৯৯ করবর্ষ থেকে সব নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে ৫২৮ কোটি ৯৯ লাখ ৩৯ হাজার ১৯৬ টাকা মূল্যের সম্পদের রেকর্ডপত্র পাওয়া গেছে। ওই সম্পদের বিপরীতে খালেক পাঠানের গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ৩৯৫ কোটি ২৬ লাখ ২৯ হাজার ৯৫১ টাকা। অর্থাৎ ১৩৩ কোটি ৭৩ লাখ ৯ হাজার ২৪৫ টাকার সম্পদের কোনো বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি; যা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এবং অসাধুভাবে অর্জন করেছেন বলে প্রমাণ পেয়েছে দুদক। যে কারণে তাকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আবদুল খালেক পাঠানের স্ত্রী এবং কেয়া গ্রুপ ও কেয়া কসমেটিসকের পরিচালক ফিরোজা বেগমের বিরুদ্ধে মামলায় ২৫ কোটি ৯৬ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৭ টাকার ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত’ সম্পদ অর্জন এবং ১৭ কোটি ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৮৪ টাকার সম্পদের ‘তথ্য গোপন’ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। আবদুল খালেক পাঠানের ছেলে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের পরিচালক মো. মাসুম পাঠানের বিরুদ্ধে মামলায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭৬ হাজার ১৮৫ টাকার ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া তিনি ২ কোটি ৭২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৩ টাকার সম্পদের ‘তথ্য গোপন করেছেন’। খালেক পাঠানের মেয়ে কেয়া কসমেটিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালেদা পারভীনের বিরুদ্ধে মামলায় ‘অবৈধভাবে’ ২ কোটি ৩৫ লাখ ৫১ হাজার ১৮০ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। তিনি ১ কোটি ৯৬ লাখ ৩২ হাজার ৩৬১ টাকার সম্পদের ‘তথ্য গোপন’ করেছেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। খালেক পাঠানের আরেক মেয়ে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের পরিচালক তানসিন কেয়ার বিরুদ্ধে মামলায় ১৬ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭ টাকার ‘জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের’ এবং ২৫ কোটি ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১১৪ টাকার ‘সম্পদের তথ্য গোপনের’ অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে ২০১৭ সালে ২০ আগস্ট বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ১১১ কোটি ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবদুল খালেক পাঠান ও ছেলেমেয়েসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। অবৈধ সম্পদসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে আবদুল খালেক পাঠানকে ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন দুদকের তৎকালীন অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক হারুন অর রশীদ। দুদকের এসব মামলার বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে কেয়া গ্রুপের কার্যালয়ে একাধিকবার ফোন করলেও কেউ তা ধরেননি।
