জাতিসংঘের ভাষ্য মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট বিপর্যয় ঘটেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট পরিণত হয়েছে আঞ্চলিক সংকটে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পক্ষগুলো। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
যুদ্ধের শুরু
মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতি আর আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে দেশটি এখন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। ইয়েমেনে প্রতিবেশী দেশগুলোর শক্তি প্রদর্শনের লড়াইয়ের শুরু আরব বসন্ত দিয়ে। এর মাধ্যমে দেশটিতে স্থিতিশীলতা আসবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা। ২০১১ সালে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহকে তার ডেপুটি মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হয়।
ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন প্রেসিডেন্ট হাদিকে দুর্নীতি, বেকারত্ব আর খাদ্য সংকটের সঙ্গে সঙ্গে আল-কায়েদার হামলা, দক্ষিণে বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহের প্রতি উচ্চপদস্থ অনেক সামরিক কর্মকর্তার আনুগত্যজনিত বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে হয়। এরই মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে ইয়েমেনের শিয়া নেতৃত্বাধীন হুতি আন্দোলনের কর্মীরা সাডা ও সানা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর এডেন থেকে পালিয়ে যান প্রেসিডেন্ট হাদি। হুতিরা সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহের প্রতি অনুগত। তাদের পেছনে রয়েছে ইরান ও রাশিয়ার সমর্থন। একপর্যায়ে তারা পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে হাদিকে পুনরায় ক্ষমতায় আনতে সৌদি আরবসহ অন্য আটটি সুন্নি দেশ একজোট হয়ে ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। এই জোটকে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। সময়ের হিসাবে ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলার অর্ধ যুগ পার হয়েছে। এই লড়াইয়ে দুই পক্ষই পর্যুদস্ত, জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
যুদ্ধ এখনো চলছে। সম্প্রতি মারিব শহরের পার্শ্ববর্তী রাহাবা জেলা থেকে পিছু হটেছে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। জেলার দখল নিয়েছে হুতি যোদ্ধারা। মঙ্গলবার এমন সংবাদ প্রকাশ করেছে কাতারের গণমাধ্যম আলজাজিরা। উত্তর ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল মারিব। এ শহরের দখল নিতে হুতিরা সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে আক্রমণাত্মক হামলা শুরু করে। এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবে মিসাইল আক্রমণ করে হুতি গোষ্ঠী। যদিও লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগেই ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংসের দাবি করেছে সৌদি আরব। এভাবেই হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যে বছরের পর বছর পার করছে ইয়েমেনবাসী। ইয়েমেনের মানুষ যেমন সৌদি আরব জোটের হামলার ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন তেমনি সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জাঝান ও নজরানের বাসিন্দারা হুতিদের হামলার ভয়ে তটস্থ থাকেন। বলা চলে, ইয়েমেনের যুদ্ধের ঝাঁজ মাঝে-মধ্যেই এসে পড়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও তেল উৎপাদন ক্ষেত্রে।
ইরান-সৌদি আরব দ্বন্দ্ব
দীর্ঘকাল ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে। ছিল একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাও। কিন্তু, সেই প্রতিযোগিতা শত্রুতায় রূপ নেয়নি গত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত। ইরান বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা আয়াতুল্লাহ খোমেনি সৌদি আরবকে সরিয়ে আঞ্চলিক নেতৃত্বের স্থানে ইরানকে বসানোর চেষ্টা শুরু করেন। ইরান ও সৌদি আরবের সংঘাতের প্রথম প্রকাশ ঘটে আশির দশকে। ইরানের সঙ্গে ইরাকের যুদ্ধে সৌদি আরব স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন ও সামরিক সাহায্য দেয় ইরাককে। সেই থেকে দুই দশকের সম্পর্কের তিক্ততা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে, শুধু ইয়েমেন নয় সৌদি আরব আর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে রয়েছে মুখোমুখি অবস্থান। সিরিয়াতে ইরান টিকিয়ে রেখেছে বাশার সরকারকে, সৌদির সমর্থন পেয়েছে বিদ্রোহীরা। লেবাননে ইরানের সমর্থক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে হিজবুল্লাহ, সৌদির সমর্থন ছিল সাদ হারিরির প্রতি। ছায়াযুদ্ধে এই দুই দেশ মুখোমুখি ইয়েমেনে। মনসুর হাদির সরকারের সমর্থনে সামরিক হামলা চালিয়েছে সৌদি, ইরান সমর্থন দিয়েছে হুতিদের। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে বিপুল সামরিক ব্যয় করেছে, চেষ্টা করছে কৌশলগত অবস্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে। দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থান দীর্ঘায়িত করেছে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে, বাড়িয়েছে গৃহযুদ্ধের পরিসর।
করুণ দৃশ্য
ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ইয়েমেন এক অনন্য নাম। মুসলিম বিশ্বে ইয়েমেন বিশেষ মর্যাদার আসনে সমাসীন। সানা ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় নগর অঞ্চল, এখন সানায় হুতিদের রাজত্ব। সারা বছর ওয়াদি হাজরামাউত এবং ওয়াদি মাসিলায় পানি পাওয়া যায়। ফলে উৎপন্ন হয় নানা ফলমূল। এ কারণে এলাকাটি সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে। এসব জনপদের কথা ও কাহিনী পবিত্র কোরআন-হাদিসে এসেছে অনেকবার। হাজার হাজার বছর ধরে ইয়েমেন পুরো আরব এলাকায় মধু, গম, বার্লি এবং খেজুরসহ নানা ধরনের ফল উৎপাদন ও রপ্তানি করে আসছে। মাছ ধরার জন্যও এলাকাটি প্রসিদ্ধ। খাবারে সমৃদ্ধ সেই ইয়েমেনিরা এখন খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করছে প্রতিদিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের কংকালসার শিশুদের চেহারার দিকে তাকানো যায় না।
ইয়েমেনে ৫৫ লাখ শিশু খাদ্যের অভাবে মৃত্যুর মুখে পতিত। সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী, অপুষ্টির শিকার চার লাখ শিশুকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সব শিশু চিকিৎসার সহায়তা পাচ্ছে না। কিছু দিন আগে অপুষ্টির শিকার এক শিশুর মৃত্যুর ছবি মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় যেন বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ওই সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছে, ৪০ লাখ শিশু অপুষ্টি ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে।’ উত্তর ইয়েমেনের হাসপাতাল ঘুরে এসে সংস্থার প্রধান নির্বাহী জানান, ‘শিশুদের কাঁদারও শক্তি নেই।’
ধ্বংসস্তূপের দেশ
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের মরুভূমিবেষ্টিত দরিদ্র দেশ ইয়েমেন। মোট আয়তনের অর্ধেকের বেশিই মরুভূমি এবং বসবাসের অযোগ্য। পৃথিবীতে যতগুলো প্রাচীন জনপদ রয়েছে তার মধ্যে ইয়েমেন অন্যতম। বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা পার হলে কয়েক শতাব্দীকাল থেকে যেসব দেশে যুদ্ধবিগ্রহ চলে আসছে ইয়েমেন তার অন্যতম। এখনো দেশটি যুদ্ধের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে। এ খেলায় জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিংশ শতাব্দীর শেষে তেলের খনির আবিষ্কার দেশটির জনগণের আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হলেও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে তাও কোনো উপকারে আসেনি। আরব বসন্তের পর দুর্ভিক্ষ হানা দেয় দেশটিতে। সম্প্রতি রেড ক্রিসেন্টের পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের মুখপাত্র সারা আল জুদদারি জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় ইয়েমেনের বিভিন্ন শহরে জনগণের কাছে ত্রাণ সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশটির মাত্র ৫১ শতাংশ হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র চালু রয়েছে। এছাড়া খাদ্য, চিকিৎসা ও ওষুধের অভাবে বিভিন্ন ধরনের রোগের বিস্তার ঘটছে। করোনা মহামারীর সময় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর ভয়াবহতা ইয়েমেনকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছে।’
দীর্ঘ ছয় বছরের যুদ্ধে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে দেশটিতে। আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের ১৫টি বিমানবন্দর, ১৪টি সমুদ্রবন্দর, দুই হাজার ৭০০টি মহাসড়ক ও সেতু, ৪৪২টি যোগাযোগ কেন্দ্র, দুই হাজারের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান, চার লাখের বেশি আবাসিক ভবন, ৯৫৩টি মসজিদ, ৩৪৪টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতাল, ৯১৪টি স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩৫৫টি কারখানা, ৭৭৪টি খাদ্য বিক্রয় কেন্দ্র এবং ৩৭০টি তেলের পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ইয়েমেন এখন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্র। প্রতাপশালী দেশের কাড়াকাড়ি আর নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গায় পরিণত হওয়া ইয়েমেনের বুক চিরে শুধুই ধ্বংস আর ধ্বংস। পুরো পৃথিবীর সকাল হলেও ইয়েমেনের সূর্য আজও অস্তমিত।
অস্ত্র বিক্রিই কৌশল
ইয়েমেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ, প্রায় ২ কোটি মানুষ পাচ্ছে না স্বাস্থ্য সুবিধা, সমসংখ্যক মানুষ আছে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়। প্রায় চার লাখ শিশু ভুগছে চরম পুষ্টিহীনতায়। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিগুলোর সর্বাত্মক সাহায্য-সহযোগিতার পরও ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি সামরিক বাহিনীর অযোগ্যতা প্রমাণিত। কোনো স্বীকৃত বাহিনীর কাছে নয়, তারা পরাজিত হওয়ার মুখে বিদ্রোহী একটি গোষ্ঠীর কাছে। পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বিরাট অঙ্কের বিনিময়ে অস্ত্রসম্ভার সংগ্রহ করে ইয়েমেন যুদ্ধে ব্যবহার করেও বিজয় লাভ করতে পারেনি। সৌদি আরব সাধারণত আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কেনে। গণ্যমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ অস্ত্র বিক্রি করে তার অর্ধেকেরই ক্রেতা সৌদি আরব। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে ২২৫ গুণ। যুক্তরাজ্য থেকেও সৌদি আরব প্রচুর অস্ত্র কেনে। ইয়েমেন যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরব ব্রিটেন থেকে ৭৮টি ফাইটার জেট, ৭২টি কমব্যাট হেলিকপ্টার, ৩২৮টি ট্যাংক কিনেছে। সৌদি আরবে জার্মানিও প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এক তথ্যে জানায়, ভারতের পর সৌদি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান অস্ত্র ক্রয়কারী দেশ। ইয়েমেন যুদ্ধের পর এই ক্রয় দ্রুত বেড়ে যায়।
অমানবিকতার দৃষ্টান্ত
ইয়েমেন ২০১৫ সালে যে অবস্থায় ছিল, আজও সে অবস্থাই অবরুদ্ধ। হাজার হাজার ইয়েমেনিকে হত্যা, শহর নগরে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ, বিয়ের অনুষ্ঠান ও জানাজার নামাজেও বোমাবর্ষণ করে সৌদি জোট এরই মধ্যে অমানবিক শক্তি হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। পাইকারি হারে বোমাবর্ষণ করেও হুতিদের বাগে আনা যায়নি। বরং ইয়েমেন থেকে মাঝে মধ্যে ১২০-৩২০ কি.মি. দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম, এমন মিসাইল ছোড়া হচ্ছে। ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতিরা এখন ৫০০-১০০০ কি.মি. দূরত্বের মিসাইল সংযোজন করছে। যেকোনো মুহূর্তে সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে ইয়েমেনি বাহিনী ঢুকে পড়তে পারে ভয়ে সৌদি সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু তারা বলেছে, আমরা কোনোভাবেই ইয়েমেন যুদ্ধে অংশ নেব না। তবে মক্কা মদিনায় কোনো আঘাত এলে তা প্রতিহত করব।
সৌদি আরবের ভয়
ইয়েমেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যে প্রকাশ, ২০১৮ সালে সৌদি ভূখণ্ডে ৯০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়া হয়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে রিয়াদে বিশ্বখ্যাত তেল উৎপাদনকারী সংস্থা আরামকোর তেলকূপে আক্রমণ চালিয়েছে সৌদি বিরোধীরা। অর্থাৎ ইয়েমেনি মিসাইল এখন ১০০০ কি.মি. দূরেও সফল আঘাত করতে পারছে।
মুহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন। উচ্চাভিলাষী এই যুবরাজ মাত্র তিন সপ্তাহে পুরো ইয়েমেন এক ঝটকায় দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে জোট গঠন করে আক্রমণ চালালেও বিদ্রোহীদের প্রতিরোধে সেটা স্বপ্নই থেকে গিয়েছে; বরং পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের এক নম্বর মানবিক সংকটের জন্ম দিয়ে সৌদি আরব বরঞ্চ দুর্নাম কুড়িয়েছে। বৈশ্বিক চাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ওপর। গোপনে সৌদি আরব ইরান ও বিদ্রোহীদের সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য মস্কোর সহায়তা কামনা করেছে। বোঝা যায়, ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের একতরফাভাবে জেতার সম্ভাবনা নেই। ইয়েমেনের চোরাবালিতে সৌদি আরব আটকা পড়েছে। যুদ্ধে প্রত্যাশিত ফলাফল না আসায় শীর্ষ মিলিটারি কমান্ডারদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, সৌদি আরবের ইয়েমেন আক্রমণ ‘অবৈধ ও অর্থহীন’ ছিল। বিশ্বের নেতৃস্থানীয়রা বিন সালমানকে ইয়েমেনে ভ্রাতৃহত্যার পৈশাচিক অভিযান বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছেন। এমবিবিএসকে সাবধান করার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বিদ্রোহীদের নেতা মোহাম্মদ আলী আল হুতির সঙ্গে আলাপ করেছেন। এরদোগানসহ বিশ্বের নেতৃস্থানীয়রা মনে করেন, ইয়েমেন সংকটের জন্য যুবরাজ বিন সালমান এককভাবে দায়ী। এই অর্থহীন যুদ্ধ সৌদি সরকারের বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। তাদের রাজস্বের টাকা যুদ্ধের পেছনে নিঃশেষ হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়া, আঞ্চলিক বা আরব বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানে সৌদি আরবের সম্ভাবনা এই যুদ্ধ ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এখন আমেরিকাও সৌদি আরবকে বাদ দিয়ে নতুন জোট গড়ার চিন্তাভাবনা করছে।
দুই যুবরাজের স্বপ্ন
২০১৫ সালে সৌদি কোয়ালিশন যখন যুদ্ধ শুরু করে, তখন থেকেই আরব আমিরাত এই যুদ্ধে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এই যুদ্ধের মূল অনুঘটক। মধ্যপ্রাচ্যের কর্র্তৃত্ব রক্ষায় দুই যুবরাজের রাজনীতি বহুল আলোচিত বিষয়। আরব আমিরাত ইয়েমেনকে দুই ভাগ করে অধিকতর বন্ধুভাবাপন্ন দক্ষিণাংশের কর্র্তৃত্ব নিতে চায়। এখানে আছে এডেন বন্দর, যেটি বিশ্বের সব স্থানে সহজ বাণিজ্যের জন্য খ্যাত। ইয়েমেনের প্রাকৃতিক সম্পদ হস্তগত করার ক্ষেত্রে এই বন্দরের অবস্থান কৌশলগত। আমিরাত মনে করে, একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা না হলে এডেন বন্দর হস্তগত করা সম্ভব নয়।
এ জন্য আমিরাত অনেক গোষ্ঠীকে সব ধরনের সহায়তা করে। যেমন হাজরামি এলিট ফোর্স। এদের লক্ষ্য, স্বাধীন হাজরামাউত গঠন। এরা মনে করে, তারা আদ জাতির বংশধর। মেধা ও শক্তির জন্য আদ জাতি সুনামের অধিকারী ছিল, যা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইয়েমেনে আরও অনেক গোষ্ঠীর মধ্যকার মতবাদ নিয়ে বিস্তর বিভেদ ও বিরোধ রয়েছে। রিয়াদ ‘ইসলাহ’কে সহায়তা করে, এরা ব্রাদারহুডের শাখা হলেও সৌদির প্রতি বিশ্বস্ত। অপরদিকে, আমিরাত সব ব্রাদারহুড সংগঠনের বিরোধিতা করে। আমিরাত এমনসব দলকে সহায়তা করে, যারা ‘ইসলাহ’র সঙ্গে যুদ্ধরত। বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে সৌদি আরব ও আমিরাত ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত। আমিরাত সৌদি আরবকে এই যুদ্ধ শুরুর জন্য বেশি ইন্ধন জুগিয়েছে। ইসরায়েলি মোসাদের ভয়ংকর ‘ব্ল্যাক কিউব’ বিভিন্ন ক্ষেত্র তৈরি করে আরবদের মধ্যে টোপ হিসেবে ফেলছে, যেন মুসলমান বনাম মুসলমান যুদ্ধ চলতেই থাকে।
সাংবাদিক খাশোগি হত্যার পর বিন সালমান চরম ইমেজ সংকটে পড়েছেন। নিজে দেশে কথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে জ্ঞাতি ভাইদের আটক, কাতার অবরোধসহ নানা কারণে চরম সমালোচনায় কূল রাখি না শ্যাম রাখি পরিস্থিতিতে ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’র মতো আমেরিকা জানিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের যুদ্ধকে আর সমর্থন করবেন না বাইডেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘ইয়েমেনে খোঁজা হবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ।’
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে কোনো দেশের নেতাকে আমেরিকা আর তোষণ করে না। মুহাম্মদ বিন সালমান সেই সীমা অতিক্রম করেছেন। আমেরিকার কাছে যদি সৌদি আরব বোঝা মনে হয়, তারা নিঃসন্দেহে পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করবে। তখন হয়তো সৌদিবিরোধী শিবির যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি চলে আসবে। সম্প্রতি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিনিদের প্রসঙ্গে অন্তত বিশ্বরাজনীতির ক্ষেত্রে শেষ কথা বলার কিছু নেই। তবে, বিশ্ববাসী চায়, সৌদি কর্র্তৃপক্ষ যত তাড়াতাড়ি এই যুদ্ধ বন্ধ করবে, শান্তি ও মানবতার জন্য সেটা ততই কল্যাণকর।
