চালের বাজারে অস্থিরতার পেছনে ঘুরেফিরেই আসছে একটি চক্রের নামই। তারা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই সিন্ডিকেট প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে নেওয়াও যাচ্ছে না কোন আইনগত ব্যবস্থা। সারা দেশেই আছে তাদের সদস্য। এমনকি সিন্ডিকেটের সদস্যের কাতারে আছেন পাইকারি ও খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীদের নামও। আর তাদের পেছনে কাজ করছে একাধিক চক্র। সম্প্রতি সরকারের একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই তথ্য। ওই প্রতিদেনটি পাঠানো হয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে। এর আগেও একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রম ও মনিটরিং গতিশীল করার সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বেশ কিছুদিন ধরেই ধানের দাম কমলেও চালের বাজার আগের মতোই চড়া। বিশেষ করে চিকন চালের দর কেজিপ্রতি ৬-১০ টাকা বেড়েছে। মোটা চালের দাম বেড়েছে ২ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। এতে সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে। ধানের জোগান স্বাভাবিক থাকলেও চালের বাজার চড়া হওয়ার নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে বাজার সংশ্লিষ্ট ও গোয়েন্দারা এই বিশেষ সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের চালের সর্ববৃহৎ মিল মালিক কুষ্টিয়ার আব্দুর রশিদ, নওগাঁর আলহাজ বেলাল হোসেন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের এরফান আলীর নাম পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ধানের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ধানের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে তারাই চালের দাম বাড়িয়েছে। কেবলমাত্র ব্যাপক চাহিদা থাকা মিনিকেট (চিকন চাল) চালের ক্ষেত্রে তারা এই কৌশল অবলম্বন করেছে। এ সুযোগে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করেছেন। কিন্তু চালের দাম বাড়িয়ে কত টাকা সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছে সে বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এ দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার সুযোগে অসাধু চাল ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাই চালের দাম মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখার জন্য সরকার গৃহীত বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোকে গতিশীল করতে হবে। দাম নিয়ন্ত্রণে মিল মালিক, আড়তদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই যেন সিন্ডিকেট গঠন না করতে পারেন, সেদিকে নিরীক্ষণ ও নজরদারি বাড়াতে হবে। এছাড়া চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন কমিটির কার্যক্রম ও মনিটরিং গতিশীল করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এদিকে, বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নোমান আহমেদ সম্প্রতি চালের বাজার নিয়ে এক গবেষণায় দাবি করেছেন, মজুদ আইন অনুযায়ী ধারণ ক্ষমতার পাঁচগুণ ধান ৩০ দিন এবং দ্বিগুণ চাল ১৫ দিন পর্যন্ত মজুদ করা যায়। এটি মানছে কি না তা মনিটরিং করতে হবে। দেশে মোট চালের ২০ শতাংশের মতো মজুদ করতে পারে বড় ৫০টি মিল। এখানে মনিটরিং জোরদার করতে হবে যাতে কোনো মিলার বেশি সময় ধান বা চাল আটকে না রাখতে পারেন। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে মিনিকেট চালের বাজারদর ছিল ৬৫-৬৮ টাকা। যা একমাস আগেও ছিল ৫৫-৫৮ টাকা। এ হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে অন্তত ১০ থেকে ১২ টাকা। মোটা চালের দাম বেড়ে হয়েছে ৫২ টাকা। যা কিছুদিন আগেও ছিল ৪৭ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। গত বোরো ও আউশের মৌসুমেও ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হয়েছে। এখন মাঠে আছে আমন ধান। বন্যা না হলে আমনেও ভালো ফলনের আশা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু ইতিবাচক এত খবরের পরও অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার। বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৫২ টাকায় উঠেছে। এই দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্য চালের দামও বাড়তি। ফলে এই করোনা মহামারীর মধ্যে বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। কারসাজি চক্রের কারণেই চালের দাম বাড়ছে। বেশি লাভের আশায় মিলার ও মজুদদাররা ধান, চাল মজুদ করে রেখেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় বাজারে ধান-চালের সরবরাহ কম। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, চালের দাম কমাতে সরকার সারা দেশে ওএমএস চালু করলেও বাজারে তা কোনো প্রভাব ফেলছে না।
একাধিক চাল ব্যবসায়ী জানান, দেশে চালের সবচেয়ে বড় মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর। কিছুদিন ধরেই এই মোকামসহ অন্যান্য মোকামেও চালের দর বাড়তি। ধানের ব্যাপক মজুদ গড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ দেশের অটো রাইস মিলের মালিকসহ অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুষ্টিয়ার খাজানগর মোকামে বর্তমানে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল ২ হাজার ৮৫০ টাকা, বাঁশমতি ৩ হাজার ৩৫০ টাকা, কাজললতা ২ হাজার ৬০০ টাকা ও মোটা জাতের ব্রি-২৮ ও স্বর্ণা ২ হাজার ২৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি চালভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি। অন্য মোকামের অবস্থানও একই। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও।
