মাদারীপুরের রাজৈরে সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় খলিল শেখ (৬০) নামে এক ব্যক্তিকে মারধরের পর পাগল সাজিয়ে মানসিক হাসপাতালে ভর্তির অভিযোগ উঠেছে তার স্ত্রী ও সন্তানদের বিরুদ্ধে। গত ১০ সেপ্টেম্বর খালিয়া ইউনিয়নের বৌলগ্রামে এ ঘটনা ঘটলেও নির্যাতনের দৃশ্যের একটি ভিডিও ক্লিপ ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়।
নির্যাতনের শিকার খলিল শেখ বৌলগ্রামের প্রয়াত নুরুউদ্দিন শেখের ছেলে। তাকে নির্যাতনের ঘটনায় রাজৈর থানায় অভিযোগ করেছেন ছোট ভাই তারা মিয়া শেখ। তিনি তার ভাইকে স্ত্রী ও সন্তানরা মিলে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার জন্য পাগল সাজিয়ে পাবনার একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে বলে দাবি করছেন। এলাকাবাসীও বলছে, খলিল শেখ সম্পূর্ণ সুস্থ ও ভালো মানুষ। তিনি তার সব সম্পত্তি ভাইদের নামে লিখে দিতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে তার ওপর স্ত্রী-সন্তানরা বিভিন্নভাবে অত্যাচার চালাত। খলিল শেখকে মানসিক হাসপাতাল থেকে উদ্ধার এবং তাকে নির্যাতনকারী স্ত্রী-সন্তানদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে এলাকাবাসী। তবে স্ত্রী-সন্তানদের দাবি, খলিল শেখ মানসিক ভারসাম্যহীন। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
খলিল শেখকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তার স্ত্রী হায়াতন বেগম (৫০), বড় ছেলে নাজমুল শেখ (২৮), ছোট ছেলে আসিফ শেখ (২২), বড় মেয়ে রাবেয়া বেগম (২৫) ও ছোট মেয়ে মাহমুদা আক্তারের (২০) বিরুদ্ধে।বৌলগ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, খলিল শেখ ১২ বছর প্রবাসে ছিলেন। তিন বছর আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে বিদেশে থাকা অবস্থায় পাঠানো টাকার হিসাব চাইলে তার ওপর অত্যাচার শুরু হয়। টাকার হিসাব না দিয়ে স্ত্রী-সন্তানরা উল্টো তাদের নামে সব সম্পত্তি লিখে দিতে বলে খলিল শেখকে। একপর্যায়ে মারধর সহ্য করতে না পেরে কিছু জমি বিক্রি করে ৭ লাখ টাকা স্ত্রী-সন্তানদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু এতেও মন ভরেনি তাদের। গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে জুমার নামাজের সময় খলিল শেখকে ঘরের একটি কক্ষের ভেতরে আটকে হাত-পা ওড়না ও রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন চালায়। এ সময় তার ডাক-চিৎকার শুনে কয়েকজন প্রতিবেশী ছুটে আসেন। তারা খলিল শেখকে নির্যাতনকারীদের হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে তাদের বিভিন্ন হুমকিধমকি দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন গ্রামের এক বাসিন্দা। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসার খবর পেয়ে স্ত্রী-সন্তানরা খলিল শেখকে বাঁশের টুকরোর সঙ্গে বেঁধে ঝুলিয়ে অন্য একটি রাস্তায় নিয়ে গাড়িতে তোলে। পরে তাকে পাবনার সুরমা মেন্টাল প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে রেখে আসে। বছর দুয়েক আগে নিজের ওপর স্ত্রী-সন্তানদের নির্যাতনের কথা জানিয়ে খলিল শেখ রাজৈর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
ভাইরাল হওয়া ৫৩ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে খলিল শেখকে রশি ও কাপড় দিয়ে বেঁধে মারধর করছেন তার স্ত্রী-সন্তানরা। এ সময় খলিল শেখ বাঁচার জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন। তিনি তাকে রক্ষা করার জন্য চিৎকার করে ময়না ও খোদে নামে দুজনকে ডাকছিলেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খলিল শেখের ভাতিজি ময়না আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিৎকার শুইনা দৌড়ে তাদের (খলিল শেখের) ঘরের ভিতর গিয়ে দেখি কাকা পায়ে ধরে বলতেছে নাজমুল বাবা আমি ২ লাখ টাকা খরচা কইরা তোরে বিদেশে দেখতে গেছি। তোরে বিদেশ পাঠাইছি। আমি তো পাগল না বাবা, আমারে ছার। আমারে দেইখা কাকা কয়, এ ময়না আমারে বাঁচা মা। তখন আবার চিৎকার দিতে গেলে কাকার গালে গামছা বাইন্দা রাখে। কাকা ওইখানে সবার পায়ে ধরে কইছে আমারে ছাইরা দে। এই বিষয়টা আমার ভাইকে জানাই। পরে ভাই আমারে কয়, পুলিশ আইতাছে। রাস্তা থেকে বাড়ি নিয়া যা। পরে তাদের (পুলিশ) নিয়া আইসা দেখি কাকা নাই।’
খলিল শেখের প্রতিবেশী আকিরন বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাত-পা বাইন্ধা নিয়া যাওয়ার সময় কাঁচার (মাটির) ওপর ফালাই দিলে উনি (খলিল শেখ) আমারে বাঁচা কইয়া চিৎকার দেয়। তখন আমি খলিলের স্ত্রীর কাছে জিগাইলে সে কয় উনি ব্রেইন স্ট্রোক করছে, পাগল হইয়া গেছে।’
খলিল শেখের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে গেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় নির্যাতনকারীরা। পরে দরজার ওপাশ থেকে আসিফের বোন পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। আপনারা এখান থেকে চলে যান।’ এ সময় নারীকণ্ঠে ভেতর থেকে বলতে শোনা যায়, ‘সবাই আমাদের খুন করতে আসছে, রামদা দিয়ে কোপাইতে আসছে। আপনারা যেভাবে পারেন আমাদের বাঁচান। না হলে একজন লাশ হয়ে যাবে।’ এরই মধ্যে ওই বাড়িতে হাজির হন রাজৈর থানার এসআই রাকিব উদ্দিন চৌধুরী।
খলিল শেখকে নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজৈর থানার ওসি মো. শেখ সাদিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খলিল শেখের ঘটনাটির ব্যাপারে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
