ছেলেহারা ইমাম ও রং বদলানো শিল্পীর রাজনীতি

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২৭ পিএম

আমরা যখন খানিকটা ছোট, এই ধরুন ষাট-সত্তরের দশকের কথা বলছি। তখন কলকাতা ময়দানে ফুটবলের দলবদল নিয়ে প্রবল এক পাগলামি ছিল। মোহনবাগানের অমুক কীভাবে আচমকা লাল-হলুদ জার্সি গায়ে দিতে দল পাল্টাল, কিংবা ইস্ট বেঙ্গল কীভাবে বিপক্ষকে বোকা বানিয়ে তাদের তারকা ফুটবলারকে নিজেদের দলে নিয়ে এলো, তা নিয়ে খবরের কাগজে লেখালেখি কিছু কম ছিল না। এমন হয়েছে দাদারা ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে বলেছে, ওঠ, ওঠ, তমুক মোহনবাগানে চলে গেল। স্বাভাবিকভাবেই আমরা যারা লাল-হলুদ ভক্ত তাদের সারা দিনটাই মাটি হয়ে গেল। অনেক দিন এরকম উত্তেজনা খেলার মাঠে আর নেই। তবে, এখন তা প্রবলভাবে ফিরে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে।

আজ যে বিজেপির নক্ষত্র নেতা, গরমাগরম বক্তৃতায় তৃণমূলের ধুধ্বরি নেড়ে দিচ্ছেন, কাল তিনিই সবিস্তারে বোঝাচ্ছেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন কোনো বিকল্প নেই!

একভাবেই তৃণমূল, এমনকি সিপিএম বা কংগ্রেসের নেতাও দল বদলাচ্ছেন, এ ঘটনা গত কয়েক বছরে এমন অহরহ ঘটেই চলেছে যা ইদানীং আর খুব একটা কাউকে অবাক করে না। যারা দল পাল্টাচ্ছেন, তাদের দুটি যুক্তি শুনতে পাই। এক, ওই দলে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। দুই, এই দলে এলাম স্রেফ জনগণের সেবা করব বলে।

এখানে জনগণের অবশ্য নীরব দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া আর অন্য কোনো পথ নেই। গণতন্ত্রের এমন মহিমা যে একটা ভোট দেওয়া ছাড়া কোথাও তাদের কোনো মতামতের কেউ ধার ধারে না। যে মূল্যবান ভোটের জন্য তাদের একটু আধটু গুরুত্ব, বলাবাহুল্য অধিকাংশ সময় সেটুকু কষ্ট রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে করতে দেন না। দলীয় বাহুবলীরাই যা করার করে দেন।

দুদিন ধরে যে গরমাগরম খবর এক্কেবারে শিরোনামে তা আপনারাও জানেন। বিজেপির হেভিওয়েট নেতা বাবুল সুপ্রিয়র দল বদলে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া। বললাম বটে হেভিওয়েট নেতা, আসলে এটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে মিডিয়া নির্মিত। দক্ষিণ ভারতের একটা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র বা শিল্প সাহিত্যের নক্ষত্রের ভোটের ময়দানে নেমে বাজিমাত করার যে প্রবণতা, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আমদানি করার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে তৃণমূল কংগ্রেসের।

সন্ধ্যা রায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, মুনমুন সেন, চিরঞ্জিত, জুন মালিয়া থেকে মিমি চক্রবর্তী, নুসরাত এরকম অজস্র নাম নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো যে ফাটকা কয়েক বছর ধরে খেলছেন তার শেষতম সংযোজন বাবুল সুপ্রিয়। এমন এক দিনে বাবুল তৃণমূলে গেলেন! কয়েক বছর আগে এমন এক দিনেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অশালীন আচরণ করেছিলেন উপাচার্য, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ সুরঞ্জন দাশের সঙ্গে। যোগ গুরু, হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের অন্যতম মুখ বাবা রাম দেবের অনুপ্রেরণায় বিজেপিতে এসেছিলেন এই গায়ক বাবুল। এসেই আসানসোল লোকসভার টিকিট পেয়ে গেলেন। সাল ২০১৪। আসানসোল আক্ষরিক অর্থেই মিনি ভারতবর্ষ।

পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শিল্পনগরী। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান মতাবলম্বীদের বাস। বাঙালি, ওড়িয়া, তেলুগু, গুরমুখি ভাষাভাষীদের সহাবস্থান। পাশেই বিহার বলে হিন্দি ভাষার দাপট যথেষ্ট। রেল শহর বলে একদা এখানে ছিল বামপন্থার প্রবল প্রতাপ। আসানসোল ও সংলগ্ন এলাকার আর এক পরিচয় কয়লাখনির জন্য। এদেশের নয়া অর্থনীতির কারণে সংগঠিত-অসংগঠিত শিল্পে নব্বই দশকের পর থেকে যে মন্দা তা আসানসোলকেও রেহাই দেয়নি। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যত খারাপ হয়েছে তত সামাজিক, রাজনৈতিক পরিসর দখল নিয়েছে দক্ষিণপন্থা। সমাজবিরোধী দৌরাত্ম্য বেড়েছে। কয়লা-মাফিয়া রাজনীতিকদের মেলবন্ধনের ফলে আসানসোলের নাগরিক জীবনের ছবিটাও ধীরে ধীরে বদলে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে লোকসভা প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয়র সমর্থনে প্রচারে এসেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাখঢাক না করেই হুঙ্কার দেন, ‘মুঝে বাবুল চাহিয়ে।’ এর অন্য মানেটা হতেই পারে যেনতেন কৌশলে বাবুলকে জেতাতেই হবে।

তারপর মোদির আশীর্বাদধন্য বাবুল সুপ্রিয়র উত্থান উল্কার গতিতে। একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি এ রাজ্যের বিজেপির অন্যতম আইকন হয়ে উঠেছিলেন বাবুল। বিজেপির ক্ষমতায় টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ।

আসানসোলের আপাত শান্ত সমাজেও সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলে উঠল একসময়। তার বলি হলেন চোদ্দ বছরের এক কিশোর। শিবগাতুল্লাহ। কে এই শিবগাতুল্লাহ! অনেকেই হয়তো জানেন, তবুও মনে করিয়ে দিই, সে ছিল স্থানীয় ইমাম ইবাদুল্লাহ রশিদির ছেলে। অত্যন্ত নৃশংসভাবে শিবগাতুল্লাহকে খুন করার পর আসানসোলে আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তাতে জল ঢেলে দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন স্বয়ং ইমাম সাহেবই। ক্ষিপ্ত জনতাকে শান্ত গলায় বোঝান, হিংসা দিয়ে হিংসা থামানো যায় না। আমি আমার ছেলেকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের সদ্ভাব ফিরে আসুক। এই দাঙ্গা সাধারণ মানুষ, হিন্দু-মুসলমান চায় না। এটা রাজনীতির লোকেদের নোংরা খেলা।

আসানসোলের এই ইমামের চমৎকার ভূমিকার পাশে বড় বেমানান লেগেছিল স্থানীয় সাংসদের আচরণ। বাবুল আগাগোড়া বিজেপি আরএসএস-এর উগ্র হিন্দুত্ববাদী লাইনের অনুসারী। অন্তত এতদিন তাই ছিলেন। একজন শিল্পী যে কী করে এমন সাম্প্রদায়িক, ইসলামো ফোবিক হতে পারেন সেটা সত্যিই ভাবতে অবাক লাগে। হতে পারে এ তার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। ব্যক্তি বাবুল হয়তো আদৌ সাম্প্রদায়িক নন! এখন নতুন করে ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী ফুটবে তার মুখে। এ-সবই হলেও হতে পারে।

কিন্তু আপাতত বাবুলের ভাবমূর্তি অন্তত নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের কাছে যে খুবই খারাপ তা তার তৃণমূলে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে প্রতিক্রিয়া আসছিল তা দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। সংখ্যালঘু মানুষের বড় সংখ্যা বাবুলের তৃণমূলে যোগ দেওয়া মেনে নিতে পারেননি। এ রাজ্যের মুসলমানদের অবস্থা এখন শাঁখের করাতের মতো। এগোলেও বিপদ, পেছালেও বিপদ। তৃণমূলকে সমর্থন না করলে বিজেপি এসে যেতে পারে। আবার তৃণমূল ছেড়ে অন্য কোনো দলে যাওয়ার সাহসও নেই।

দাঙ্গাবিধ্বস্ত আসানসোলে ছেলেহারা ইমামের হাহাকার সেদিন সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে তেতো ওষুধ গেলার মতো বাবুলকেও তাদের মানতে হচ্ছে। বিজেপি জুজু তাদের তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক করে তুলেছে। বুঝতে পারলেও এই চক্র বুহ্যের বাইরে যাওয়ার পথ তাদের অজানা।

কিন্তু বাবুল এরকম সিদ্ধান্ত নিলেন কেন! আসলে এইবার নির্বাচনে বিজেপি হেরে যাওয়ার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব খোলাখুলি সামনে এসেছে। দিলীপ ঘোষ বনাম মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী বনাম বাবুল সুপ্রিয় এসব নানা টানাপড়েন হতেই পারে বাবুলকে কিছুটা হতাশ করে তুলেছিল বিজেপি সম্পর্কে। বিধানসভার ভোটে বাবুল প্রার্থী হয়েছিলেন টালিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে। সেখানে গো-হারা হারেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের কাছে। এই হার বাবুল মানতে পারেননি। এবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার রদবদলের পরে বাবুলকে আর মন্ত্রী করা হয়নি। এটা ভয়ংকরভাবে বাবুলের অহমিকাতে ধাক্কা দেয়। এর পরিণতিই দলবদলের কারণ। বাবুল সেটা স্বীকারও করেছেন। বলেছেন, ‘সাইড বেঞ্চে বসে থাকব বলে রাজনীতিতে আসিনি’।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, তৃণমূল বাবুল সুপ্রিয়র কমিউনাল ইমেজ থাকা সত্ত্বেও তাকে দলে নিল কেন!

সিনেমা বা শিল্প-সাহিত্যের অন্য তারকাদের রাজনীতিতে নিয়ে আসা কিছুটা চমক হলেও পুরোটা নয়। এর পেছনে আসল কারণ হচ্ছে রাজনীতির মঞ্চগুলোকে কমজোর করে দেওয়া। আমরা ভুলে যাই অরাজনীতিও কিন্তু এক বড় রাজনীতি। এটা বিজেপি তৃণমূল দুটো দলই জানে। সেই দিক দিয়ে দেখলে বাবুল সুপ্রিয়র দলবদলে এই রাজনৈতিক কৌশলের কোনো হেরফের হবে না।

এর অনেক ব্যাখ্যা হতে পারে। প্রথমত, হেভিওয়েট না হলেও বাবুল বর্ণময় এটা মানতেই হবে। মোদি-অমিত শাহর কাছের লোক ছিলেন। গায়ক বলে পরিচিতি আছে। এরকম একজনকে নিলে বিজেপিকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে ফেলা যাবে এটা হতে পারে। তাছাড়া, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে বিজেপির কোনো ফারাক নেই, এ আপনি মানুন না মানুন, ভয়ংকর সত্যি। ফলে বাবুল বা অন্য কাউকে নিয়েই দলে নেওয়ার ব্যাপারে টিএমসির কোনো ছুঁতমার্গ থাকবে না এটা নিয়ে বিতর্ক উঠতে পারে না।

লেখক ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত