সংগ্রামী আলোকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হান

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২৯ পিএম

২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কাউন্টার ফটো’র দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আলোকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হানকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। পরদিন বিকেলে প্রতিষ্ঠানটির উত্তরা ক্যাম্পাসে ছিল আলোকচিত্রবোদ্ধাদের এক মিলনমেলা। সেই অনুষ্ঠানে গিয়েই আমি প্রথম আবদুল হামিদ রায়হানকে দেখতে পাই। তখনই তার বয়স ৮২ বছর। তবে পোশাক-আশাকে বেশ স্টাইলিস্ট। কথা বলে মনে হলো তিনিই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা আর গল্পগুজব হলো। এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর।

এ বছর আগস্ট মাস জুড়ে ‘আলো ছায়ায় বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে দৈনিক দেশ রূপান্তরের ফেইসবুক লাইভ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে গিয়ে আবদুল হামিদ রায়হানের কথা মনে পড়ে। কিন্তু শঙ্কা হচ্ছিল, এ বয়সে তিনি কথা বলতে পারবেন তো! তাকে ফোন করতেই সেই দরাজ কণ্ঠ। কুষ্টিয়ার বাসায় বসে মোবাইল ফোনে স্ট্রিমইয়ার্ডের সংযোগে তিনি টানা ৪০ মিনিট আমার সঙ্গে কথা বললেন। তার তোলা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি আর মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়। তার মতো একজন গুণী আর বর্ষীয়ান আলোকচিত্রীর সাক্ষাৎকার নিতে পারাটাও আমার জন্য এক পরম সৌভাগ্য।

১৯৭০ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনী প্রচারণায় কুষ্টিয়ায় এসেছিলেন। আবদুল হামিদ রায়হান তখন কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর খাওয়া-দাওয়া ও নির্বাচনী জনসভার ছবি তোলার দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। কুষ্টিয়া ইউনাইটেড হাই স্কুল মাঠে ‘ইয়াসিকা ৬৩৫’ ক্যামেরায় তিনি সেই জনসভার ছবি তোলেন। সেই ছবি তোলার পরই তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে আলোকচিত্রী হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়ে যান।

আবদুল হামিদ রায়হান কিন্তু তখন পেশাদার আলোকচিত্রী ছিলেন না। মনের আনন্দে ছবি তুলে বেড়াতেন। তার ছবি তোলার শখ হয় মাত্র ১৪ বছর বয়সে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ তখন সবে শেষ হয়েছে। সেই সময় পূর্ববঙ্গের এক মহকুমা শহরে নিম্ন মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা এক ছেলের পক্ষে আলোকচিত্রের মতো ব্যয়বহুল চর্চার সঙ্গে নিজেকে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া কম বড় কথা নয়। সেই বিবেচনায় আমি তাকে দুঃসাহসীই বলব। এই দুঃসাহসী মানুষটির জন্ম ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার জগতি ইউনিয়নের বড়িয়া গ্রামে, বড় খালার বাড়িতে। বাবা চয়েন উদ্দিন ধুতি ও থান কাপড়ের ব্যবসা করতেন। মা জবেদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। শৈশবে ভর্তি হন বাড়ির পাশের আড়ুয়াপাড়া মক্তবে। মক্তবের পাট চুকিয়ে ১৯৪৬ সালে ভর্তি হন সিরাজুল হক মুসলিম হাই স্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই প্রকৃতির মায়ায় পড়েন। চারদিকের অপার সৌন্দর্য দেখে ভাবেন যদি ছবি তুলে রাখতে পারতাম! মাকে জানালেন সে কথা। মায়ের কাছ থেকে চার টাকা নিয়ে সাড়ে তিন টাকায় ‘কোডাক ১২৭’ ক্যামেরা আর দশ আনা দিয়ে একটা সাদা কালো ফিল্ম কিনলেন। সেই শুরু...। এরপর স্টুডিওর আশপাশে ঘুরাঘুরি করতে থাকেন কেমন করে ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করা যায়? ছবি এনলার্জমেন্ট করা দেখে ফটোগ্রাফির প্রতি আরও ঘোর লেগে যায়। ১৯৫১ সালে আবদুল হামিদ রায়হান পড়তেন নবম শ্রেণিতে। সে সময় বাবার ব্যবসার অবস্থা খুবই করুণ। পরিবারে অভাব অনটন। তাই সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে তিনি ছুটেন কর্মের সন্ধানে। প্রথমে শুরু করেন তামাক পাতার ব্যবসা। এরমধ্যে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ব্যবসা ফেলে তিনি জড়িয়ে পড়েন ভাষা আন্দোলনের লড়াইয়ে। কুষ্টিয়ায় যে পাঁচজন ভাষা সংগ্রামীর নাম মানুষের মুখে মুখে তারা হলেন আবদুল হামিদ রায়হান, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, অধ্যাপক সুধীর লাহেরী, নাজমুদ্দীন আহমদ ও ওয়ালিল বারি চৌধুরী। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তার ব্যবসা লাটে ওঠে। তাই বাধ্য হয়ে তিনি সন্তোষ কুমার সেন নামের এক হিন্দু ব্যবসায়ীর তামাকের দোকানে কর্মচারীর কাজ নেন। এরপর ১৯৫৬ সালে কুতুবউদ্দিন অ্যান্ড সন্স নামের এক তামাক কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। স্টেশন রোডেই ছিল সেই কোম্পানির অফিস। সেই অফিসে ডার্করুম বানিয়ে ফটোগ্রাফি চর্চা চালিয়ে যেতে থাকেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনশ টাকায় কেনেন ‘লুবিটেল ২’ ক্যামেরা। ১৯৬৯ সালে যখন আন্দোলন-সংগ্রাম দানা বাঁধতে শুরু করে তখন তার মনে হলো, এসব ধরে রাখতে একটা ভালো ক্যামেরা দরকার। তাই নিজের জমানো সঞ্চয় থেকে পাঁচশ টাকা দিয়ে করাচি থেকে পোস্টালের মাধ্যমে একটা ‘ইয়াসিকা ৬৩৫’ ক্যামেরা কেনেন। ঊনসত্তর-সত্তরের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান আর স্বাধিকারের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি সেই ক্যামেরায় উত্তাল দিনের ছবি তুলতে থাকেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সারা দেশে শুরু হয় গণহত্যা। রায়হান ভাবেন যে করে হোক নেগেটিভগুলো রক্ষা করতে হবে। ২৭ মার্চ কিছু সময়ের জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলে তিনি অফিসে গিয়ে প্রথমে নেগেটিভগুলো উদ্ধার করেন। পরদিন নেগেটিভ নিয়ে সপরিবারে কুষ্টিয়া শহর ছেড়ে মেহেরপুরের আকবপুর গ্রামে শ^শুরবাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। শ^শুরবাড়ির টিনের চালে লুকিয়ে রাখেন সেইসব নেগেটিভ। এখানেও জীবনঝুঁকির কারণে পরিবার নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ৭ মে চলে যান নদীয়ার করিমপুরে। যোগ দেন করিমপুর ইয়ুথ ক্যাম্পের সহকারী ইনচার্জ হিসেবে। তার মাথায় তখন ফটোগ্রাফি নেই, মনে কেবল দেশকে শত্রুমুক্ত করার চিন্তা। করিমপুর ক্যাম্পের যুবকরা দলে দলে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে গেলে তার কাজও কমে যায়। তিনি ভাবলেন এবার ফটোগ্রাফিকে দেশের কাজে লাগাই। তখন কলকাতায় মুজিবনগর সরকার অনুমোদিত বাংলাদেশে ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোর (বিভিএসসি) নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি কাজ করছিল বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন কুষ্টিয়া সদরের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও রায়হানের বাল্যবন্ধু ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। জুন মাসের শেষের দিকে করিমপুর ক্যাম্পে আসেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তখন তিনি ব্যারিস্টারকে বললেন, ‘তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো।’ বিভিএসসিরও তখন ডকুমেন্টেশনের জন্য লোক দরকার ছিল। ব্যারিস্টারের সহযোগিতায় ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোরে আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দেন। এই সংগঠনে যোগ দিয়ে তিনি চারণের মতো ঘুরে বেড়াতে থাকেন কোর্ট-কাচারি, হাসপাতাল, ট্রেনিং ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি, সীমান্ত এলাকা, মুক্তাঞ্চলসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। সেই সময় তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম বর্বরতা, ধ্বংসযজ্ঞ আর বীভৎসতার চিত্র। পাশাপাশি মুক্তিসংগ্রামীদের দুঃসাহসী সাফল্য আর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মানবিক সংবেদনশীলতাও তার ক্যামেরায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। ছবিগুলো বিভিএসসির মাধ্যমে ভারতসহ পশ্চিমা গণমাধ্যমে পাঠানো হয়, যা বিশ^ জনমত গড়ে তুলতে সহায়ক হয়েছিল।

১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ কুষ্টিয়া শত্রুমুক্ত হয়। ১৩ ডিসেম্বর নিজ শহরে ফিরে আসেন আবদুল হামিদ রায়হান। কুষ্টিয়া তখন বিধ্বস্ত শহর। বাতাসে লাশ আর বারুদের গন্ধ। স্বজন হারানো মানুষের বেদনার কথা শুনতে শুনতে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তবু নিষ্ঠুর বর্বরতার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করেন আহত হৃদয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি তুলেছিলেন। নানা প্রতিকূল পরিবেশে সব সংরক্ষণ করা যায়নি। তবে এখনো ৫৪০টি নেগেটিভ অক্ষত আছে। অতি আদরে রেখেছেন নেগেটিভগুলো, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অবিনাশী দলিল। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালের ১৩ মার্চ আবদুল হামিদ রায়হান গড়ে তোলেন ‘রূপান্তর’ নামের এক ফটো স্টুডিও। মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর পূর্ববর্তী তার তোলা ঐতিহাসিক ছবিগুলো বাঁচিয়ে রাখতেই এই উদ্যোগ। রূপান্তরের দেয়ালে সাঁটানো আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই ছবিগুলো। রূপান্তরকে এখন শুধু স্টুডিও বললে কম বলা হবে। রূপান্তর এখন নতুন প্রজন্মের মানুষের শ^াস নেওয়ার জায়গা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা ও আলোকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হান আজ ৮৯ বছর বয়সে পা রাখলেন। কুষ্টিয়ার ১১, খলিলুর রহমান সড়কের নিজ বাড়িতে অনেকটা নিভৃতে বসবাস করেন এই সংগ্রামী বীর। ভোর সাড়ে ৪টায় ঘুম থেকে উঠে নিত্য তিন কিলোমিটার হাঁটেন। তাই শরীরটাও বেশ সুস্থ সবল আছে। দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে একাত্তরে চিত্র ধারণ করেছিলেন তিনি। সেই চিত্রসম্ভার জাতিকে দান করে গেছেন, আবার দেখারও সুযোগ করে দিয়েছেন। এমন মানুষের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান জানানো সত্যিই কঠিন কাজ। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই কীর্তিমানের জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানাই, তার শতায়ু কামনা করি।

লেখক : আলোকচিত্রী, শিক্ষক ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত