দীর্ঘ ছয় বছর পর জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়েছে সরকার। তবে স্বল্প আয়ের সঞ্চয়ীদের কথা মাথায় রেখে ১৫ লাখ টাকার ওপরে বিনিয়োগের মুনাফার হার প্রায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। এর নিচে বিনিয়োগ থাকলে আগের মতোই মুনাফা পাবেন সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরা।
গতকাল মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যারা নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনবেন তাদের জন্য পরিবর্তিত এ হার কার্যকর হবে। আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটি পুনঃবিনিয়োগ করলে তখন নতুন মুনাফার হার কার্যকর হবে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন এ মুনাফার এতদিন পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যেত। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে মেয়াদান্তে মুনাফা পাওয়া যাবে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে। ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার হার হবে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে এতদিন মেয়াদান্তে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এখন এই স্কিমে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করলে মুনাফা পাওয়া যাবে ১০ শতাংশ। বিনিয়োগ ৩০ লাখ টাকার বেশি হলে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ শতাংশ হারে।
পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে এতদিন ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হতো। এখন এ সঞ্চয়পত্রে যারা ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করবেন তারা মেয়াদ শেষে ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ মুনাফা পাবেন। ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে মুনাফার হার হবে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। পাঁচ বছর মেয়াদি এ সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এখন এ সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার কমিয়ে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ হার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এই চার ধরনের সঞ্চয়পত্রে মোট ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যায়। পেনশনারদের জন্য এই বিনিয়োগসীমা ১ কোটি টাকা। এর বাইরে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে আলাদাভাবে আরও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে।
ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে তিন বছর মেয়াদি হিসাবে বর্তমানে মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। এখন ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার হবে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।
ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ হিসাবে বর্তমানে মুনাফার হার সাড়ে ৭ শতাংশ। এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বিদেশি বন্ডের মধ্যে ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডের মুনাফার হার কমানো হয়েছে। এ খাতের বন্ডে এতদিন ১১ দশমিক ২০ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যেত। এখন থেকে এ খাতে বিনিয়োগ বেশি হলে মুনাফা কমে ৯ শতাংশে নেমে আসবে। এ ছাড়া ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের মুনাফার হার আগের মতোই থাকছে।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সর্বশেষ ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমায় সরকার। ওই হারই এতদিন বহাল ছিল।
সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে বাজেট ঘাটতি মেটায় সরকার। তবে এই ঋণের সুদের হার ব্যাংক ব্যবস্থার ঋণের সুদের হারের থেকে অনেক বেশি। তারপরও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার গত ৬ বছরে কমায়নি সরকার। তবে করোনার মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের লক্ষ্যের থেকে অনেক বেশি ঋণ এসেছে। ফলে এ খাতের সংশোধিত বাজেটে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায় এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৩৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি ঋণ আসে সঞ্চয়পত্রে। এই ঋণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের ঋণের প্রায় ৩ গুণ বেশি।
বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ৪১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা নিট ঋণ করে সরকার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। অনুদান ছাড়া ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
