উপসচিবকে বাঁচিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব!

কর্মকর্তাকে ঋণ দেওয়ার খেসারত চালক শহীদুলের

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:৩৮ এএম

তদন্তের বিষয়টি ছিল খুব সাধারণ। উপসচিব নার্গিস পারভীন ড্রাইভার মো. শহীদুল ইসলামের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছেন কি নাতা বের করা। তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাহবুব শাহীন প্রশ্ন তুললেন, ড্রাইভারের টাকা ধার দেওয়ার সামর্থ্য আছে কি না। গভীরভাবে তলিয়ে না দেখে তিনি রায় দিলেন, একজন সাধারণ চাকরিজীবীর পক্ষে বেতনের টাকা ধার দিয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে ছয় মাস চলা সম্ভব না। কাজেই শহীদুলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। তবে ড্রাইভারের শাস্তির সুপারিশও করেননি তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা একবারও বোঝার চেষ্টা করলেন না সরকারি চাকরিজীবীদেরও সহায়-সম্পদ থাকতে পারে, পারিবারিক রোজগারপাতি থাকতে পারে। আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঋণ চাইলে অধস্তনরা কিছু না কিছু তার হাতে তুলে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন।

উপসচিব নার্গিস পারভিন বলেছেন, তার মায়ের কাছ থেকে নিয়ে ড্রাইভার শহীদুল তার ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে  দেড় লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। জমা দেওয়া টাকা শহীদুলের নয়। নার্গিসের মা, ভাই ও বোন সবাই থাকেন ঢাকায়। তাহলে ঢাকার এক বাসা থেকে আর এক বাসায় টাকা পৌঁছনোর জন্য কেন শহীদুলকে বাগেরহাট থেকে ঢাকায় আসতে হলো। কেন তার উত্তর খোঁজেননি তদন্ত কর্মকর্তা। শহীদুল কোন ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছেন তার সিøপ আবেদনের সঙ্গে জমা দিয়েছেন। নার্গিস পারভীন কিছু টাকা ফেরত দিয়েছেনতা ব্যাংকে জমা দেওয়ার স্মারকও রয়েছে। শহীদুলকে ব্যক্তিগত শুনানিতে ডেকে অভিযুক্ত নার্গিস পারভীন ছাড়াও পরিবহন পুলের একাধিক ড্রাইভার ও কর্মচারীর মুখোমুখি করা হয়েছে। ওইসব ড্রাইভারের সাক্ষ্য গৎবাঁধা। ড্রাইভারদের অনেকের লিখিত অভিযোগের ভাষায়ও হুবহু মিল রয়েছে।

উপসচিব নার্গিস পারভীনকে দায়মুক্ত করার জন্য ড্রাইভারকে ফাঁসানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুব শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তদন্তে কেউ যদি সংক্ষুব্ধ হয় তাহলে তার আপিল করার সুযোগ রয়েছে।’ মাহবুব শাহীন যানবাহন অধিদপ্তরের পরিচালক (সড়ক) পদে কর্মরত। একাদশ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের এ কর্মকর্তা সম্প্রতি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

গত ৫ এপ্রিল শহীদুল তার পাওনা টাকা ফিরে পেতে সহায়তা করার জন্য সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (এপিডি) কাছে আবেদন করেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেয়ে পরিবহন কমিশনার যানবাহন অধিদপ্তরের পরিচালক (সড়ক) মোহাম্মদ মাহবুব শাহীনকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। তিনি গত ১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরিবহন কমিশনার মিজানুর রহমান গত ১২ সেপ্টেম্বর তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে প্রেরণ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে নার্গিস পারভীন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্তে যা পেয়েছে তাই বলেছে। এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’

অভিযোগ বিবরণী থেকে জানা যায়, গাড়িচালক শহীদুল ২০১৮ সালের ১৭ জুন বাগেরহাট জেলা পরিবহন পুলে যোগ দেন। এর তিন দিন পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নার্গিস পারভীনের ডিউটি শুরু করেন। একই বছরের ৭ অক্টোবর বকেয়া বিল উত্তোলন করতে ঢাকার আসার জন্য জেলার এডিএম নার্গিসের কাছে ছুটি চান। সব কিছু শুনে এডিএম বলেন, ‘ঢাকায় আমার বোনের ভীষণ সমস্যা। তার প্রায় দুই লক্ষ টাকা লাগবে। তুমি আমার বড় ভাইয়ের অ্যাকাউন্ট নম্বরে দেড় লাখ টাকা জমা দিবা আর আমার ছোট বোন মনুকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিবা। আমার কাছে বর্তমানে টাকা নাই। তুমি আসলে তোমার টাকা ফেরত দিয়ে দিব।’

ঢাকায় এসে পরিবহন পুল থেকে শহীদুল বকেয়া বিলের ৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা তোলেন। এডিএমের বড় ভাইয়ের প্রাইম ব্যাংকের বিজয় নগর শাখায় নির্ধারিত হিসাব নম্বরে জমা দেন। আবেদনে শহীদুল সেই হিসাব নম্বরও দিয়েছেন। আরও ৫০ হাজার টাকা তার ছোট বোনের কল্যাণপুরের বাসায় পৌঁছে দেন। ওই রাতেই বাসে করে তিনি বাগেরহাট ফেরত যান। আড়াই মাস পর ২৯ ডিসেম্বর এডিএম নার্গিস এক লাখ টাকা শহীদুলকে ফেরত দেন। যা শহীদুল বাগেরহাটের কোর্ট বিল্ডিং সোনালী ব্যাংক শাখায় তার নিজের অ্যাকাউন্টে জমা দেন।

বাগেরহাট থেকে নার্গিস পারভীনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। সেখান থেকে তাকে পরিবহন পুলে সংযুক্তি দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে শহীদুলকেও ঢাকায় বদলি করে পরিবহন পুলে নিয়ে আসা হয়। ঢাকার পরিবহন পুলে যোগদানের পর শহীদুলকে সেই নার্গিস পারভীনকেই আনা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে শহীদুলকে আবার বরগুনা জেলায় বদলি করা হয়। শহীদুলের অভিযোগ পরিচালকের কাছে তার সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ করে তাকে বদলি করা হয়। এর পর অবশিষ্ট এক লাখ টাকা ফেরত চাইলে নার্গিস পারভীন তা পরিশোধ করতে অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ শহীদুলের।

গত ২৪ জুন ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হয়েও একই অভিযোগ করেন শহীদুল। শুনানিতে অংশ নিয়ে নার্গিস পারভীন তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান, আমার মা ঢাকায় থাকেন। মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমার ভাইয়ের চেম্বারে কর্মরত মোশাররফ হোসেনের অ্যাকাউন্টে জমা দেন। টাকা জমা দেওয়ার সিøপ তিনি সংরক্ষণ করেননি। কারণ হিসেবে তিনি ড্রাইভারকে বিশ^াস করার কথা জানান।

তিনি আরও জানান তার ছোট বোনকে শহীদুল টাকা দেয়নি। কারণ তার বাসা সে চিনত না। তাকে হয়রানি করার জন্য শহীদুল মিথ্যা অভিযোগ করেছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও জানান, ‘আমি যদি তার কাছ থেকে টাকাই ধার নিতাম তাহলে ৩ বছরে এ বিষয়ে কেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেন না।’

নার্গিস পারভীন আারও জানান, শনিবার ছুটির দিন শহীদুল তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যানবাহন মেরামত কারখানায় যান। তার কিছুদিন পর তাকে বরগুনা বদলি করা হয়। শহীদুল তার প্রথম স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেয় না। প্রথম স্ত্রী অফিসিয়ালি অভিযোগ করলে শহীদুলের ধারণা জন্মে নার্গিস পারভীন তার প্রথম স্ত্রীকে দিয়ে অভিযোগ করিয়েছেন। এ ধারণা থেকেই তাকে সামাজিক ও দাপ্তরিকভাবে হেয় করার জন্য শহীদুল এ মিথ্যা অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

ব্যক্তিগত শুনানিতে অভিযোগকারী ও ১৯ অভিযুক্তের উপস্থিত থাকার রেওয়াজ থাকলেও পরিবহন পুলের একাধিক গাড়িচালককে গোপনে হাজির করা হয়। ওইদিন তারা সবাই শহীদুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। তাদের মধ্যে ড্রাইভার মো. পাপ্পু মিয়া,আবদুল মোতালেব, জয়নাল আবেদীন মুকুল, অফিস সহায়ক মো. হোসেন ও মো. অব্দুস শুকুর তাদের লিখিত অভিযোগে নার্গিস পারভীনের গুণগান গেয়েছেন এবং শহীদুলের বদনাম করেছেন। তাদের লিখিত বক্তব্যের শেষ লাইন এক ও অভিন্ন। শেষ লাইনে তারা সবাই বলেছেন ‘মহোদয়ের সুস্বাস্থ্য কামনা করে আমি আমার বক্তব্য এখানে শেষ করছি।’ সরকারি যানবাহন মেরামত কারখানার রাজা আহমদ এবং মো. শাহাবুদ্দিন মোল্লা যৌথভাবে লিখিত বক্তব্যে শহীদুলকে নেশাগ্রস্ত উল্লেখ করেন। শহীদুলকে নেশাগ্রস্ত উল্লেখ করার পরও তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেননি বা এবিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের একজন ড্রাইভার যখন অন্য একজন ড্রাইভারকে নেশাগ্রস্ত বলেন তখন কর্তৃপক্ষকে ডোপ টেস্ট করাতে হবে। তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের দায়িত্ব তাকে দেওয়া উচিত হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার ছিল। একইভাবে অন্য ড্রাইভাররা তার বিরুদ্ধে যে চুরির অভিযোগ করেছেন তার প্রমাণ হাজির করা দরকার ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা কোনো প্রমাণ হাজির করেননি। অথচ এসবের ভিত্তিতে তিনি ড্রাইভারকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টি নিরপেক্ষ কোনো কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করানো।

তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদনে বলেন, ‘বর্ণিত অর্থ গাড়িচালক উপসচিবকে দেননি। অর্থের উৎস সঠিকভাবে তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি। একজন চাকরিজীবীর পক্ষে বেতনের অর্থ ধার দিয়ে বাড়ি থেকে ছয় মাস টাকা আনা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে বরগুনা বদলি ও প্রথম স্ত্রীর অভিযোগের কারণে সন্দিহান হয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন। অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে যানবাহন অধিদপ্তরের গাড়িচালক সমিতির সভাপতি, সম্পাদকসহ অধিকংশ সদস্য তদন্তে উপস্থিত হয়ে ওই মিথ্যা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য অভিযোগকারীর পূর্ব অপকর্মের তথ্য তুলে ধরেন। সুতরাং দেখা যায় গাড়িচালককে বদলি ও প্রথম স্ত্রীর অভিযোগের আক্রোশেই এই মিথ্যা অভিযোগ আনয়ন করেন।’

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত শেষ হয়েছে কি না আমি জানি না। আমার কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। আপনি আমার স্যারদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত