বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৭তম বারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করলেন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উদযাপনের বছরে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রদত্ত ভাষণের তাই বহুমাত্রিক তাৎপর্য রয়েছে। এবার এমন এক সময়ে বিশ^ নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিলিত হয়েছেন যখন অভূতপূর্ব এক বৈশি^ক মহামারীতে সারা পৃথিবীই বিপর্যস্ত। একদিকে যেমন করোনাভাইরাস মহামারী প্রতিরোধে গণটিকাকরণে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি আরেকদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোর আরও দায়িত্বশীল না হওয়াও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে, গণহত্যার মুখে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত সাড়ে এগারো লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার পাঁচ বছর পেরুলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনো জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ অংশীদারত্ব পাচ্ছে না। আবার আফগানিস্তান সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টি আরও চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে এসব বিষয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থান তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সহযোগিতাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর জোরালো আহ্বান অত্যন্ত সময়োচিত।
গত শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমিতে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই শুধু এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে পারে। মিয়ানমারে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও এ সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা ও অব্যাহত সহযোগিতা আশা করি। তিনি স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারে তৈরি এবং মিয়ানমারের কাছেই এর সমাধান রয়েছে। এছাড়া করোনা ভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় কভিড-১৯ টিকাকে ‘বৈশ্বিক সম্পদ’ হিসেবে বিবেচনা করতে সাধারণ পরিষদের বিগত অধিবেশনে তার আহ্বানের উল্লেখ করে সর্বজনীন ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে না পারার সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এ যাবৎ উৎপাদিত টিকার ৮৪ শতাংশ উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলো ১ শতাংশেরও কম টিকা পেয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এ টিকা বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দুনিয়ার লাখ লাখ মানুষকে টিকা থেকে দূরে রেখে কখনই বিশ্বব্যাপী টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জাতিসংঘ অভিযাত্রার প্রথম দিন ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের কথা উল্লেখ করে সেদিন সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় প্রদত্ত ভাষণের স্মৃতিচারণ করেন। জাতির পিতার সংগ্রামী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব আর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম বীরত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের জাতির পিতা ছিলেন বহুপাক্ষিকতাবাদের একজন দৃঢ় সমর্থক। তিনি জাতিসংঘকে জনগণের ‘আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্র’ মনে করতেন। কিন্তু সেদিনের সাতচল্লিশ বছর পরের পৃথিবীতেও তা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে, সেই ধারাবাহিকতাতেই এখন করোনাভাইরাসের টিকার ন্যায্য হিস্যা দাবি, ফিলিস্তিনিদের প্রতি যেকোনো ধরনের অবিচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি বাংলাদেশের বৈশ্বিক অঙ্গীকারের উদাহরণ।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একইসঙ্গে বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন এই বিশ^মঞ্চে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। জিডিপিতে আমরা বিশ্বে ৪১তম। গত এক দশকে আমরা দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। এ সময়ে আমাদের মাথাপিছু আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। গত এক দশকে আর্থসামাজিক খাতে ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে এবং শিশুমৃত্যু হার কমে আসার পাশাপাশি গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭৩ বছর। শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং ২০১৪ সাল থেকেই এ সূচকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে আছে। সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনের সময়ই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ দিয়েছে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক। দারিদ্র্য দূরীকরণ, বিশ্বের সুরক্ষা এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শেখ হাসিনাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি নিশ্চয়ই এই লক্ষ্য পূরণে তার সরকারকে আরও উদ্যমী হওয়ার উৎসাহ জোগাবে। বাংলাদেশকে অবশ্যই জাতিসংঘে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উল্লিখিত অঙ্গীকারসমূহ পালনে এবং নিজেদের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠায় আরও সোচ্চার হতে হবে।
