মাদ্রাসা শিক্ষায় বাড়ছে তৃতীয় লিঙ্গ

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৩৭ পিএম

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজ ঢাল এলাকায় গত বছর বেসরকারি উদ্যোগে শুরু হয়েছিল দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের মাদ্রাসা। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ‘দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদ্রাসা’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির আরও বেশ কয়েকটি শাখা চালু হয়েছে। কোরআন শিক্ষায় হিজড়াদের আগ্রহ বাড়ায় ঢাকা সিটিতে ১২টি এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে আরও ১৪টির মতো শাখা রয়েছে। এর ফলে ওইসব এলাকার হিজড়াদের জীবনমানে যেমন পরিবর্তন এসেছে, তেমনি কমেছে তাদের অপরাধ প্রবণতা।

কামরাঙ্গীরচরের একটি ভাড়া বাসায় হিজড়াদের জন্য মাদ্রাসার আদলে পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের একজন হিজড়া এখানে এসে যেন পরিপূর্ণভাবে মাদ্রাসার শিক্ষা নিতে পারে সেজন্য অভিজ্ঞ আলেমদের দিয়ে সেখানকার শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা হচ্ছে। এখান থেকেই তাদের বাকি শাখাগুলো পরিচালনা করা হয়।

জানা গেছে, দেশের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সমাজে যেন ইতিবাচকভাবে দেখা হয়, তারা যেন এই মাদ্রাসায় শিক্ষা নিয়ে সমাজে সঠিকভাবে চলতে পারে সে উদ্দেশ্য নিয়ে গত বছর নভেম্বর মাসে কামরাঙ্গীরচরে প্রথম একটি শাখা করা হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানটি মরহুম আহমেদ ফেরদৌস বারী চৌধুরী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালনা করা হয়। এখানে পড়ালেখার জন্য হিজড়াদের কোনো খরচ লাগে না। ২০২০ সালে সরকার স্বীকৃত কওমি সিলেবাস অনুযায়ী মাদ্রাসাটি পরিচালিত। এখন নূরানী, নাজেরা পড়নো হচ্ছে তাদের শাখার সব মাদ্রাসায়। সামনে হিফজুল কুরআন ও কিতাব বিভাগ চালু করা হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রাথমিক জরিপ মতে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। কিন্তু হিজড়াদের সংগঠনগুলো বলছে, তাদের সংখ্যা দুই লাখের বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হিজড়াদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার দু-একটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। কিন্তু মোটের ওপর হিজড়াদের বড় অংশের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের দিকে তেমনটা উদ্যোগ দেখা যায় না বলে জানায় সংগঠনগুলো। 

লালবাগের হিজড়া সোনালি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কখনো ভাবতে পরিনি এই রকম মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পাবে হিজড়া জনগোষ্ঠী। এখানের মাদ্রাসায় পড়ার পর অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমাদের। একসময় অন্যভাবে চললেও এখন সমাজে আট-দশটা মানুষের মতো চলাফেরা করি। মাদ্রাসায় শিক্ষা নেওয়ার পর এই এলাকার হিজড়াদের অপরাধ প্রবণতা অনেকে কমেছে।

পদ্ম কুড়ি হিজড়া সংঘ সংগঠনের সহ-সভাপতি মিতু দেশ রূপান্তরকে বলেন, হিজড়ারা এই রকম মাদ্রাসায় পড়ার ফলে আগে যারা বিভিন্ন সময়ে অপরাধে জড়াত সেই সংখ্যাটা অনেক কমে গেছে। এই রকম মাদ্রাসায় যেন হিজড়ারা পড়ার সুযোগ পায় সেজন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে যোগাযোগ করে হিজড়াদের পড়ার সুযোগ করে দিতে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’

তৃতীয় লিঙ্গের মাদ্রসার প্রধান শাখার প্রশিক্ষক আবদুল আজিজ হুসাইনী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথমে মনে করতাম এদের কিভাবে পড়াশোনা করাব। সমাজে তো এদের অন্যভাবে দেখে। কিন্তু এখন দেখলাম এরা গুরুভক্ত মানুষ। তাদের ভালোভাবে বুঝালে তারা পড়া বুঝতে চেষ্টা করে। এখন অনেকেই কোরআন শরীফ পড়ছে।

মাদ্রাসার পরিচালক আবদুর রহমান আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানবিক বিবেচনায়, বিবেকের তাড়নায় হিজড়াদের কল্যাণে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এরা সমাজে অবহেলিত, নানা বিষয়ে তারা বঞ্চিত। এমনকি তারা কোনো মসজিদে গিয়েও নামাজ পড়তে পারে না। এক বছর হতে না হতে এই মাদ্রাসায় পড়ার জন্য হিজড়া গোষ্ঠীর মাঝে বেশ আগ্রহ বেড়েছে। একটি মাত্র শাখা দিয়ে যাত্রা শুরু করলে এখন ২৬টির মতো শাখা রয়েছে। দেশের বাইরে ভারতে একটি শাখা দেওয়ার কাজ চলমান আছে। যদি ঢাকায় সরকারিভাবে একটি বড় জায়গা পাওয়া যায়, তাহলে হিজড়াদের জন্য বড় একটি স্থায়ী মাদ্রাসা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত