মুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কতদূর এগুলো

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২৪ পিএম

দীর্ঘদিন ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তচিন্তার জন্য লড়াই অব্যাহত আছে। মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি ও অধিকার রক্ষার আন্দোলন মানব ইতিহাসের ধারাবাহিকতার একটি মৌলিক অনুষঙ্গ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানব সমাজে মুক্তচিন্তা ও মুক্ত বিশ্বাসের চর্চার অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যেই মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার মূলমন্ত্র নিহিত আছে। ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত হয়েছে ও হচ্ছে। এই হিসেবে মানব সংস্কৃতি ও সভ্যতার ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানবাধিকারের বর্তমান এই ধারণাটি খুব বেশি পুরনো নয়। লক্ষ বছরের মানব

সংস্কৃতির তুলনায় এই সময়কাল যে বিন্দু তুল্য তা বলাবাহুল্য। তারপরও যুগে যুগে মানুষের মানবাধিকারের চরম লংঘনের যেমন দৃষ্টান্ত আছে একই সঙ্গে তা রক্ষায়ও উদ্যোগ একেবারে কম নয়। অতীতের সেই প্রচেষ্টাগুলো সেই সময়ের মানদণ্ডে প্রগতিশীল হলেও বর্তমানের ধারণার তুলনায় তা একেবারেই নয়। এরকম মানবাধিকার রক্ষার প্রাচীন জানা ইতিহাসের একটি উদাহরণ হাম্মুরাবির কোড। হাম্মুরাবি প্রাচীন ব্যাবিলনের শাসক ছিলেন সেই খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সালে, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে। হাম্মুরাবি তার সময়ে কিছু আইন প্রণয়ন করেছিলেন, যার মধ্যে নিষ্ঠুরতম শাস্তি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এই হাম্মুরাবির কোডকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে চান কেউ কেউ। বলা হয় এই কোডের আওতায় সেই সময়ে একজন দাসের বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর পারস্য সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট। কেউ কেউ দাবি করেন ব্যাবিলন জয় করার পর তার প্রণীত নীতিমালা ছিল মানবাধিকারের প্রাচীনতম দৃষ্টান্ত। এই নীতিমালাগুলো খোদাই করা হয়েছিল মাটির তৈরি একটি সিলিন্ডারে। এই নীতিমালায় দাসদের মুক্ত করে দেওয়া, বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও শ্রেণি বিবেচনায় বৈষম্য না করা ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। যদিও মানবাধিকারের এই ঐতিহাসিক ধারণাগুলো নিয়ে এখনো যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবাধিকারের পালে হওয়া লাগে। মানুষের মর্যাদা, মুক্তচিন্তা, স্বাধীন মতামত, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার ইত্যাদি মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরে জাতিসংঘের কাঠামোর আওতায় যতগুলো মানবাধিকার সম্পর্কিত সনদ প্রণীত হয়েছে এর কোনো কোনোটি হয়েছে সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আবার কোনো কোনোটি হয়েছে পিছিয়েপড়া বিশেষ গোষ্ঠী ও শ্রেণির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর অধিকার আদায়ের আন্দোলন তীব্র হলেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সমাজগুলো এই ধারণার সঙ্গে ঠিক খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনি। আর পারেনি বলেই এখনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও বিশ্বাসের বিবেচনায় মানবাধিকারের লংঘন হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। এটাকে এখন পর্যন্ত মানবাধিকার আন্দোলনের আপাত ব্যর্থতা হিসেবে বলা যেতে পারে। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জয়জয়কার, প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছিল। আবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ক্ষমতাধর দেশগুলোর পক্ষ থেকে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখা হয়। যদিও চর্চার ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

অনেক সময় পুঁজিবাদকেও গণতন্ত্রের সঙ্গে এক করে দেখা হয়। অন্যদিকে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পার্থক্য শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার মালিক কে হবে তা ঠিক করে দেওয়ার মধ্যে সীমিত থাকে। কিন্তু এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ও ক্ষমতায়নকে জড়ানো যায়নি। এই শতাব্দীর তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাও প্রায় একই দোষে দুষ্ট। এই কারণেই দেখা যায় এখনো দেশে দেশে সাধারণ মানুষের বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে যার কোনোটা ঘটছে প্রচলিত সমাজ কাঠামোর হাত ধরে, আবার কোনোটা বিশ্বাসের হাত ধরে, আর কোনোটা এর উভয়ের মিশেলে। অনেকে বলে থাকেন গণতন্ত্রের বিকল্প হচ্ছে আরও ভালো গণতন্ত্র কিন্তু আরও ভালো গণতন্ত্র দ্বারা কী বোঝায় বা এর প্রায়োগিক দিকটা কী সে সম্পর্কে খুব একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। এটাই সম্ভবত গণতন্ত্রের কাঠামোগত সমস্যা। এখনো এই কাঠামোগত সমস্যাসমূহ সবার সামনে খুব পরিষ্কার না হলেও তা ধীরে ধীরে উন্মোচন হতে শুরু করছে। সমাজতন্ত্রের পতনের একটা বড় কারণ ছিল পুঁজিবাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য পুঁজিবাদী কাঠামোর আশ্রয় গ্রহণ করা যা সমাজতন্ত্রকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। একইভাবে সামরিক উপায়ে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না তাও বোধহয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত বিশ, ত্রিশ ও চল্লিশ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র স্থাপনের সামরিক প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতা এই কথাই বলে। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া ও আফগানিস্তান এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

জনগণের ক্ষমতায়ন বলতে কী বোঝায় এটা নিয়ে একটা সময় সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী বিশ্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। সমাজতন্ত্রীদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিসেবে দেখা হয়, যদিও এই বিদ্রোহ বেশিদিন টেকেনি। এদের বিভাজনকে কেন্দ্র করে এমনকি মানবাধিকার সনদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছিল। একপক্ষ বলছে মুক্ত মত ও মুক্ত পথ গ্রহণের অধিকারই হচ্ছে মানবাধিকার এবং অপরপক্ষ বলছে মৌলিক চাহিদা রক্ষার অধিকার রক্ষাই হচ্ছে মানবাধিকার। সে যাই হোক, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার নামে পৃথিবীতে রক্ত ঝরার ঘটনাও কম না। ঠিক যেমন ধর্ম, বিশ্বাস ও জাতি রক্ষার নামে পৃথিবীতে রক্ত ঝরছে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এর মাধ্যমে পশ্চিমা ব্যবস্থা, ধ্যান-ধারণাকে ছড়িয়ে দেওয়া ও পৃথিবীর অন্যান্য বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবস্থাকে অস্বীকার করার চেষ্টা। এই পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজব্যবস্থা যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি শাসনব্যবস্থাও হতে পারে বৈচিত্র্যময়, সেটাই স্বাভাবিক। শাসনব্যবস্থার পদ্ধতি যাই হোক না কেন এর অন্তর্নিহিত বিষয় হতে হবে মানবাধিকারের ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ের আফগানিস্তান তালেবান দ্বারা অধিকৃত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা, সমালোচনা ও শঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে। এটা ঠিক আমেরিকার এভাবে চলে যাওয়াটা আকস্মিক ছিল। কিন্তু অস্ত্র দিয়ে তো গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বরঞ্চ এটা ভালো যে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘ বিশ বছর পর হলেও বুঝতে পেরেছে এভাবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না, এ জন্য চাই অন্যকিছু যা আরও বেশি গণতান্ত্রিক।

এই পৃথিবীর মানবাধিকারের ইতিহাস কখনো একরৈখিক বা সরল ছিল না, এটি উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। আফগানিস্তানের ঘটনা দেখে যারা মনে করছেন পৃথিবীতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের যাত্রা পশ্চাৎপদতার দিকে, তাদের জন্য পরামর্শ এই পশ্চাৎপদতা দেখে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যে কোনো অগ্রগতির পেছনেই রয়েছে ধারাবাহিক উদ্যোগ, যেখানে পশ্চাৎপদতা ও ব্যর্থতা এর একটি অংশ। ব্যর্থতাই মানুষকে নতুনের পথে স্বপ্ন দেখায়, ভেতর থেকে উদ্দীপনা তৈরি করে পরিবর্তনের পথ সুগম করে, আর সেটাই হচ্ছে মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় ভরসা।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত