পদে পদে বাধায় নদীতে ইলিশের আকাল

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:১৯ এএম

সাধারণত বর্ষাকালকে ইলিশের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এ সময়েই সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। লাভ হয় জেলেদের আর ভোক্তারাও পান কিছুটা কম দামে। তবে চলতি বছর মৌসুম পেরিয়ে গেলেও কাক্সিক্ষত পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েনি। ভরা মৌসুমে সাগরে কিছু ধরা পড়লেও নদীতে ছিল ইলিশের আকাল। গত বছরের তুলনায় এবার মৌসুমে জেলেরা নদীতে ইলিশ পেয়েছেন এক-চতুর্থাংশেরও কম। এতে জেলে ও ইলিশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা, বাজারে ইলিশের চড়া দামের কারণে হতাশ ভোক্তারাও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প-কারখানার বর্জ্যে নদীদূষণ, নদীতে অসংখ্য চর জেগে ওঠা ও মোহনায় অতিরিক্ত জাল ব্যবহারের কারণে ইলিশের বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ইলিশ নিরাপদে বিচরণের জন্য নদীর পরিবর্তে গভীর সমুদ্রকে বেছে নিচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোতে জাটকা ধরা বন্ধ এবং নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ধরা বন্ধের কারণে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। গত ১৫ বছরে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র বেড়েছে কমপক্ষে পাঁচ গুণ। এর মধ্যে ভোলার পূর্বে মেঘনা এবং পশ্চিমে রয়েছে তেঁতুলিয়া ইলিশের সবচেয়ে বড় অভয়াশ্রম। অথচ মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকা মাইলের পর মাইল অবৈধ খুরছি এবং তেঁতুলিয়া নদীর বেশিরভাগ এলাকায় বেহুন্দি জাল দিয়ে মাছ ধরছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের একাধিক গ্রুপ। এসব জালে ব্যবহৃত উপকরণ খুঁটি, বালির বস্তার সঙ্গে পলি জমে নাব্য সংকট দেখা দিচ্ছে। এতে করে ইলিশের প্রবেশ পথে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মৎস্য বিভাগের উদাসীনতা ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অবৈধ মাছশিকারিদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। এতে করে সাধারণ জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

জেলেদের ভাষ্যমতে, যেখানে খুরচি জাল পাতা হয়, সেখানে সাধারণ জেলেদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সাধারণ জেলেরা যখন নদীতে জাল ফেলেন তখন পানির স্রোতে তাদের জাল গিয়ে খুরচি জালের জন্য পাতা বাঁশ ও গাছের ওপর পড়ে তখন ওই সাধারণ জেলেরা ওই জাল আর তুলে আনতে পারেন না। যার কারণে বড়রকম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন প্রান্তিক জেলেরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৎস্য ব্যবসায়ী নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেঘনা নদীর সরাজগঞ্জ মাছ ঘাট, দীঘিরপাড় এলাকা, মাজির হাট (চেয়ারম্যান হাট), মির্জাকালু, তজুমদ্দিন ও বোরহানউদ্দিন মোহনার চরজহিরউদ্দিন ও দৌলতখান আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় (দিদারমাঝি) এসব জাল পাতা হয়। স্থানীয় কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা বছরের পর বছর নদীতে বাঁধা জাল, বেহুন্দি জাল, মশারি জাল, চরঘেরা জালসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ শিকার করছে। এদের বিরুদ্ধে সাধারণ জেলেরা ভয়ে কথা বলছেন না। প্রশাসনও নামমাত্র অভিযান চালিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম আজহারুল ইসলাম বলেন, ভোলায় তেঁতুলিয়া নদীতে আমাদের প্রায় ১০০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম রয়েছে। এছাড়া মেঘনায় ৯০ কিলোমিটার। আমরা প্রতিনিয়ত এই এলাকায় মনিটরিং করে থাকি। যেসব খুঁটি জাল রয়েছে সেগুলো আমরা উচ্ছেদ করছি। প্রতিনিয়ত আমাদের অভিযান রয়েছে। এছাড়া বেহুন্দি জাল আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। শুধু বেহুন্দি জালকে টার্গেট করে অনেক অভিযান করা হয়। তবে একদিকে উচ্ছেদ করলে অন্যদিকে আবার জাল পাতা হচ্ছে। আগের চেয়ে এসব জালের সংখ্যা কমে এসেছে।

তিনি বলেন, জলবায়ুর যে পরিবর্তন হচ্ছে তার ফলে কিন্তু ইলিশের গতিপথও পরিবর্তন হতে পারে। উজান থেকে যে পানি আসছে তার সঙ্গে পলি আসছে। এসব পলি মোহনাতে জমা হয়ে ডুবোচর তৈরি হচ্ছে। তবে তাতে ইলিশ চলাচলে সামান্য বাধা সৃষ্টি হলেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের অভিহিত করা হয়েছে।

একই অবস্থা চাঁদপুরের মোহনায়। স্থানীয় আড়তগুলো পর্যাপ্ত ইলিশ সরবরাহ থাকলেও তার বেশিরভাগই সাগরের। নদীতে ইলিশ কম। ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদপুরের নদীতে কয়েক বছর আগেও প্রচুর ইলিশ পাওয়া গেছে। কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। দক্ষিণাঞ্চল থেকে আমদানি করা ইলিশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে ইলিশ ব্যবসায়ীদের। পদ্মা-মেঘনা মোহনায় অসংখ্য ডুবোচর ও ড্রেজিং মেশিনের কারণে ইলিশের পরিমাণ কমে গেছে।

রফিকুল ইসলাম নামে এক জেলে দেশ রূপান্তরকে মোবাইল ফোনে বলেন, ভরা মৌসুমেও নদীতে তেমন কোনো ইলিশ নেই। নদীতে সারাদিন ঘুরলেও খরচ উঠে না। পদ্মায় এখন অনেক ডুবোচর। তার ওপর গত কয়েক বছরে নদী মোহনায় অসংখ্য ড্রেজিং মেশিন চলছে। এর কারণে পদ্মায় ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মাছের পরিমাণও কম।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শবে বরাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৫০ শতাংশ সরবরাহ করা হতো চাঁদপুর থেকে। কিন্তু এখন তা কমে ৩০-৩৫ শতাংশ এসে পৌঁছেছে। চাঁদপুরের ইলিশের মূল প্রবেশপথ পদ্মা-মেঘনার মোহনায় প্রায় শতাধিক ড্রেজার মেশিন রয়েছে। এসব ড্রেজার মেশিন নদীর গভীরে বিকট শব্দ তৈরি করে ফলে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া পাঁচটির মতো ডুবোচর রয়েছে যা ইলিশ সরবরাহ কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ। পদ্মায় ইলিশের সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে এসব অবৈধ ড্রেজার মেশিন বন্ধ করতে হবে। এছাড়া যেসব ডুবোচর রয়েছে সেগুলো ড্রেজিং করে ইলিশের প্রবেশপথকে বাধাহীন করতে হবে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাঁদপুর কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় মাছ না ধরার জন্য অবরোধ দেওয়ার কথা বলছি। সেখানে নদীর ভেতর মাসের পর মাস মাইলের পর মাইল খুঁটি গেড়ে ব্যারিকেডের মাধ্যমে নদীতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল। ফলে এসব জালের কারণে একদিকে যেমন নদীতে নাব্য সংকট হচ্ছে, আবার খুঁটি জালের কারণে সাগর থেকে ইলিশ নদীতে আসতে বাধার মুখে পড়ছে। এছাড়া ড্রেজিং মেশিনের কারণে একদিকে যেমন নদীর ভেতরে শব্দ দূষণ হয় তেমনি নদীর পানিতে ঘোলাত্ব বেড়ে যায়। এতে করে এসব অঞ্চলে মাছের খাবার নষ্ট হয়, মাছের চলাচল বিঘœ হয়। অন্তত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের ২২ দিন এর আগে পরে আরও কিছুদিন এসব মেশিন বন্ধ রাখা উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত