সিনিয়র সচিব ও সচিবরা কখন কোথায় যাচ্ছেন তা সরকার জানতে পারছে না। গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় সময়মতো তাদের না পেয়ে নানা অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সব সিনিয়র সচিব ও সচিবকে তাদের ভ্রমণসূচি পাঠানোর নির্দেশনা জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত রবিবার এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশনার কপি পাঠানো হয়েছে।
সরকারের কর্মকর্তারা জানান, সচিবরা অনেকটা ইচ্ছেমাফিক চলাচল করছেন। বিশেষ করে করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগেই পড়ছে না, অধিদপ্তর, দপ্তর, সংস্থাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ের পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনগুলোতেও। সম্প্রতি ঢাকার কাছের এক সিটি করপোরেশনের মেয়রের হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। এ ধরনের ঘটনা তিনি প্রায়ই ঘটান।
ওই মেয়রের মতো অনেক সচিবকেও শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা খুঁজে পান না সময়মতো। সচিবদের প্রধান হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবও অনেক সময় কিছু সচিবের অবস্থানের তথ্য জানেন না। সচিবদের দেশের ভেতরে কর্মস্থল ছাড়তে হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানোর নিয়ম রয়েছে। সচিবরা তা তো অনুসরণ করেনই না, অনেকে বিদেশে গেলেও তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে যথাসময়ে জানান না। গত ১৭ সেপ্টেম্বর একজন সচিব বিদেশ সফরে যান। তার সফরসূচি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয় ১৯ সেপ্টেম্বর।
সচিবদের বিদেশ যেতে হলে মন্ত্রণালয় থেকে সারসংক্ষেপ পাঠাতে হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সরকারি আদেশ (জিও) জারি করে। এরপরই সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ যেতে পারেন। আর সচিবদের বিদেশ যাওয়ার আগে সেই ভ্রমণসূচি মন্ত্রিপরিষদে পাঠাতে হয়।
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হচ্ছে। অনেক সচিব বিদেশ গিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করছেন। কে কোথায় কী সই করছেন তা জানা সরকারের জন্য জরুরি। বিদেশের সঙ্গে এসব চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই করতে হলে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করতে হবে। বিষয়গুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানতে পারলে সরকারের পক্ষে সমন্বয় করার সুযোগ থাকে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা।
তিনি আরও জানান, কিছু কর্মকর্তা আছেন বিদেশ শুনলেই যেতে চান। জুনিয়র কর্মকর্তাদের জন্য আমন্ত্রণপত্র এলেও সেখানে সচিবদের অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখা যায়। অথচ সরকারের নীতি হচ্ছে জুনিয়র কর্মকর্তাদের বেশি করে বিদেশ পাঠানো। তারা যেন বিদেশ গিয়ে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার বিষয়টি দেশে প্রয়োগ করার সুযোগ পান।
সরকারি কর্মকর্তারা আরও বলছেন, বিদেশ সফর নিয়ে চলছে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কে কখন কোন কাজে কোন দেশে কতবার যাচ্ছেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য সংরক্ষিত নেই। ফলে একজন কর্মকর্তা ঘনঘন বিদেশ যাত্রার সুযোগ পাচ্ছেন। আবার অনেকে বছরে একবারও বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পান না।
সরকারের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ২০১১ সালের ১৯ জুন পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে বিদেশে শিক্ষা সফর, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপে সচিবের বদলে জুনিয়র কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বা মধ্যসারির কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব, অধীনস্থ দপ্তরপ্রধান, যুগ্ম সচিবদের একসঙ্গে বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা হলেও তা প্রায়ই মানা হয় না। হরদমই দেখা যায় মন্ত্রী, সচিব, দপ্তরপ্রধান একসঙ্গে বিদেশ সফর করছেন।
পরিপত্রে বিদেশ সফরসংক্রান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সার-সংক্ষেপে এক বছরের ভ্রমণের তথ্য দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। অভিযোগ আছে, অনেকে তথ্য গোপন করে বারবার বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ নিচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বিভাগীয় কমিশনারদের কর্মস্থল ত্যাগ করতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়। ইউএনওর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডিসি। ডিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কমিশনার। আর বিভাগীয় কমিশনারের কর্তৃপক্ষ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত সচিব। তাদের মধ্যে ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের বিদেশ যাওয়ার অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। মাঠ প্রশাসনের এসব কর্মকর্তার বেলায় নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটলেও পৌরসভা মেয়র, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা সরকারের এ নিয়ম মানছেন না।
মেয়র, চেয়ারম্যানরা তো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নন, তারা কেন এ নিয়ম মানতে যাবেন এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা মানবেন, কারণ তারা সরকারের সুবিধা ভোগ করেন। মেয়র, চেয়ারম্যানদের কর্মস্থল ত্যাগ করতে হলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে। অনেক মেয়র ও চেয়ারম্যান এ নিয়ম মানেন না। অথচ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইনে এর সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সচিবালয়সহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা যায়, বিভিন্ন মেয়র ও চেয়ারম্যান তাদের গাড়ি নিয়ে এসব জায়গায় চলে আসেন। তাদের গাড়িতে বড় করে লেখা থাকে তাদের পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ বা জেলা পরিষদের নাম। তারা স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন ছাড়া সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে যেতে পারেন না। কারণ তাদের যাতায়াত ভাতা দেয় সরকার। সরকারি টাকা খরচ করতে হলে তাদের সরকারের নিয়ম মেনে খরচ করতে হবে।
