সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২১, ১২:৫০ এএম

করোনা মহামারীতে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ দেড় বছরের প্রায় অচলাবস্থার অবসান হচ্ছে। ধীরে ধীরে আবারও স্বাভাবিক হওয়ার পথে হাঁটছে পৃথিবী। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ ৫৪৪ দিন পর গত ১২ সেপ্টেম্বর খুলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অচিরেই খুলতে যাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ধাপে ধাপে একেকটি বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে এবং ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হবে। খুব স্বাভাবিকভাবেই স্কুল-কলেজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের লেখাপড়ায় সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় খুললেই শুধু হবে না, ক্লাস-পরীক্ষা শুরু হলেই শুধু হবে না খেয়াল রাখতে হবে শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও। আর উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ।

দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি এবং এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করাও বেশ কঠিন বটে। তাই এখনই পুরোপুরি অফলাইন বা সশরীরে শিক্ষাকার্যক্রম চালানোয় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। বিশেষত, পুরোপুরি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা খুবই প্রযোজ্য। তাই করোনার কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থা আপাতত জনমনে কিছুটা স্বস্তি দিলেও শতভাগ টিকাপ্রাপ্তির আগে উদ্বেগহীন হওয়ার সুযোগ নেই। আইইডিসিআরের (সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) বিশেষজ্ঞরাও বারবার বলছেন, টিকা নেওয়ার পরেও মাস্ক পরা, ঘন ঘন হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো স্বাস্থ্যবিধিগুলো কড়াভাবেই সবাইকে মেনে চলতে হবে। কঠিন হলেও তাই এসব মানায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

এ তো গেল শারীরিক স্বাস্থ্যের কথা, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য! করোনায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু স্থবির থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হতাশা, বিষণ্ণতার জন্ম নিয়েছে তা যে খুব সহজে শেষ হয়ে যাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বলা যায়, আধুনিক ও আত্মকেন্দ্রিকতার এ সমাজে মহামারীর দরুন এ সমস্যা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। শিক্ষকতা করার সুবাদে অহরহ শিক্ষার্থীদের নানাবিধ মানসিক সমস্যায় পড়তে দেখি। একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় মনে করে প্রায়ই তারা লজ্জায়, ভয়ে কারও সঙ্গে এসব শেয়ারও করতে চায় না। অনেক সময় পাছে লোকে পাগল ভাবে, এ ভয়ে তারা বলতে চাইলেও পেছায়। হঠাৎ করে পরিবার ছেড়ে এসে শিক্ষাজীবনের এ পর্যায়ে নানা বিষয় সামলাতে শিক্ষার্থীরা এমনিতেই হিমশিম খায়। নিজেদের জীবন, ভবিষ্যৎ ও লক্ষ্যের কোনো কূলকিনারা পায় না। আবার অনেক শিক্ষার্থী নিজেকে গোছাতে না পেরে খেই হারিয়ে ফেলে। করোনাকালে চারপাশের দমবন্ধ অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের সেই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে করোনাকালে যেখানে দৈনিক মৃত্যুর হার ক্রমেই বেড়েছে, সেখানে আত্মহত্যার হার তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। জীবন নিয়ে হতাশা, বিষণœœতা, আয় কমে যাওয়া, চাকরি হারানো, কলহ ইত্যাদি নানা কারণে এ সময়ে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এবং আক্রান্তরা জীবন থেকে পলায়নপর হয়েই আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিয়েছেন। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে, প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ ৩ হাজার মানুষ নিজেই নিজের প্রাণ নেয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নানা উপায়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। তাদের মতে, আত্মহত্যা শুধু সর্বোচ্চ আয়ের দেশেই নয়, বরং এটা একটা বৈশি^ক সমস্যা এবং বিশ্বব্যাপী ২০১৯ সালে আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলোর ৭৭ শতাংশই ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে করোনার সময় এক বছরে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় নিয়ে করা এই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা এবং আর্থিক সংকটই এসব আত্মহত্যার কারণ। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের হিসাবে, প্রতি বছর দেশে আনুমানিক প্রায় দশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে।

করোনার এই অস্থির সময়ে আত্মহত্যাপ্রবণতা লক্ষ করা গেছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বর্তমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীর এভাবে অকালমৃত্যু মানুষকে মর্মাহত করেছে। কেন সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়েও জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামলাতে ব্যর্থ হয়ে এমন পথ বেছে নিচ্ছে আমাদের তরুণরা? এটা অবশ্যই ভাবনার বিষয়। সমস্যা থেকে পালিয়ে কখনোই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে সফলতা-ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে মোকাবিলা করার নামই জীবন। আজকাল প্রতিনিয়ত সফল হওয়ার চাপ ব্যক্তির জীবনে এবং সম্পর্কগুলোতে প্রভাব ফেলে, যা হয়তো সর্বত্র উন্নয়নের চাপে আমাদের অন্তরালে পড়ে যাচ্ছে। এজন্যই দৈনন্দিন জীবনের কঠিন বাস্তবতায় নানা সাময়িক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করা উচিত। তা না করে আত্মহত্যা করার মধ্য দিয়ে সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান কখনোই কাজের কথা হতে পারে না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গেই আমলে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষত, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীই মেধাবী, তাই তাদের বিভাগীয় শিক্ষাদানের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও খোঁজ নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত মনস্তাত্ত্বিক বা কাউন্সিলরের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নিঃসংকোচে শিক্ষকদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে পারেন, পেতে পারেন দিকনির্দেশনা।

শিক্ষার্থীরা যাতে মন খুলে সব শঙ্কা ঝেড়ে ফেলে নিজেদের মানসিক সমস্যায় সাহায্য চাইতে পারে এজন্য শিক্ষকদেরও যথাযথ প্রশিক্ষণ দরকার। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অনেক মেধাবী তরুণ প্রাণকে আমরা অকালে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জীবনের নানাবিধ যাতনা থেকে আত্মহত্যার এই প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে তৎপর হতে হবে তার পরিবার, কাছের বন্ধু-বান্ধব এবং শিক্ষকদের। করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হতাশায়, বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হয়ে আত্মহত্যা, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার এই প্রবণতা পুরো সমাজের জন্য কোনো আশার বার্তা দেয় না। এ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটকে আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি জীবনের ইতিবাচকতা, আশাবাদের নানা ধারণা তাদের মননে ছড়িয়ে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন বা তুচ্ছ করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বিচ্ছিন্নতার এ শহরে লাভ নেই মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য আর জ্ঞানগর্ভ কথা বলে। বরং আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে ফলপ্রসূ সমাধান প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি প্রাণই অমূল্য এবং দেশের সম্পদ এই বিবেচনা করে সেই প্রাণের রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এ প্রসঙ্গে ফরাসি তাত্ত্বিক অ্যালবেয়ার কামুর বক্তব্যকে আমরা মনে রাখতে পারি, ‘নিজেকে শেষ করার চেয়ে বরং বেঁচে থাকাটাতেই বেশি সাহসের প্রয়োজন পড়ে’।

লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত