মোটা দাগে যদি বলা যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি যে দুটো বা তিনটা উপাদানের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, তার একটা হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্সের অনেক সংজ্ঞা আছে, তবে নগদ টাকার এক স্থান থেকে অপর স্থানে হাতবদলকে আমরা বুঝে থাকি। সাধারণভাবে বিদেশ থেকে অর্থ বা টাকা দেশে আসাকেই আমরা রেমিট্যান্স হিসেবে বুঝি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। দেশের অর্থনীতি গতিশীল রাখায় রেমিট্যান্সের ভূমিকা অনেক। কিন্তু প্রবাসীদের পাঠানো এই রেমিট্যান্স দেশের উন্নয়নের সরাসরি কতটা কাজে লাগছে? অর্থাৎ দেশের বড় বড় বিনিয়োগে বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে কতটুকু কাজে লাগছে?
অর্থনীতিবিদ এবং প্রবাসীদের নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে প্রবাসীরা দেশে যে টাকা পাঠান, তার বড় একটি অংশ ভোগবিলাসেই বেশি ব্যয় হয়। আর বিনিয়োগ বলতে যা হয়, তা হলো জমিজমা কেনা, ঘরবাড়ি বানানো ও ফ্ল্যাট কেনা। প্রবাসী আয়ে এমন কোনো বিনিয়োগ হয় না, যার মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থান হয়। কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালীসহ যেসব স্থানে জমির দাম বেশি, সেসব অঞ্চলের প্রবাসীরা জমিতে বিনিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী থাকেন। তবে পাঠানো অর্থের অধিকাংশ দৈনন্দিন পারিবারিক চাহিদা মেটায় অর্থাৎ পোশাক, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকত্বের দুর্বলতার কারণে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোতে শিক্ষার হার ও মান কোনোটিই তাৎপর্যপূর্ণ হয় না। অনেক এলাকায় দেখা যায়, বাবা বা ছোটভাইকে একটা দোকান করে দেন প্রবাসীরা। অর্থাৎ সে টাকা বিনিয়োগ করেছেন ব্যবসার কাজে। অনেক সময় দেখা যায়, সেই ব্যবসা টিকে থাকে না, ফলে তার বিনিয়োগের পুঁজিও উঠে আসে না। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন ভোগ্যপণ্যের জন্য প্রবাসীর আয় ব্যয় হলেও সেটা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। ভোগের জন্য অর্থনীতি চালু থাকে। দ্রব্যের চাহিদা তৈরি হয়। ফলে টাকা হাতবদল হতে থাকে। এমনকি করোনার মধ্যে দেশে পাঠানো অর্থ অনেক পরিবারের জীবন বাঁচিয়েছে। আরও একটা খাতে এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়, সেটা হলো বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেকেই চড়া সুদে ঋণ নিয়ে থাকে। সেই ঋণ শোধেও এই প্রবাসী আয়ের অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। গবেষকরা মনে করেন, দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে প্রবাসীরা এই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন না। ফলে তারা মার খান ও পুঁজি হারান। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের এমন ব্যবহারকে তারা ধনাত্মকভাবে দেখেন। তা সত্ত্বেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহের জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব রয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি যৌক্তিক। দেশীয় শ্রমবাজারে শ্রমের চাহিদা ও জোগানের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রবাসের শ্রমবাজার আমাদের শ্রমশক্তির জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রবাসী আয়ের অর্থ দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও অবদান রাখছে। মোটকথা, বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থ সামষ্টিক অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করছে।
এই প্রবাসী আয় নিয়ে অল্প বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী দশকের দিকে তাকালেই দেখা যাবে যে, অভিবাসন ও প্রবাসী আয়ের প্রভাব দেশীয় অর্থনীতিতে কেমন ছিল। গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৬-৭৭ সালে মাত্র ১৪ হাজার অভিবাসী ছিল। ২০০৭-০৮ তা গিয়ে দাঁড়ায় ৯ লাখ ৮১ হাজার। ২০০৮ সালের বৈশি^ক আর্থিক সংকট, বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলার কারণে ২০১১-১২ থেকে শুরু করে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত অভিবাসীর সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। তবে এর পরের বছরগুলো থেকে আবার এই হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংক একটা রিপোর্ট দেয়, সেখানে তারা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অভিবাসী ও শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশের শ্রমিকরা মূলত কোন দেশে বেশি যায় সেটা খেয়াল করলে দেখা যায়, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, কাতার ও আফ্রিকার লিবিয়া বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের প্রথম পছন্দ। তবে বাংলাদেশের এক এক অঞ্চলের জনগণ এক এক দেশে যেতে পছন্দ করে। এর কারণ হলো, ওই অঞ্চলের যে মানুষরা যে দেশে অবস্থান করেন তারা তাদের এলাকার স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট থাকে। ফলে অঞ্চলভিত্তিক একটা পছন্দ গড়ে ওঠে। যেমন চট্টগ্রাম অঞ্চলের শ্রমিকের পছন্দ মধ্যপ্রাচ্য আবার সিলেট অঞ্চলের পছন্দ ইউরোপ। তবে সেই সমীক্ষা বলে মোট অভিবাসীর ৪৫ শতাংশ সৌদি আরবে যেতে চায় এবং মালয়েশিয়া বাংলাদেশিদের তৃতীয় অভিবাসন গন্তব্যস্থল। মোট অভিবাসীর ১০ শতাংশ এই দেশে যেতে যায়, বাকিরা মধ্যপ্রাচ্যে। তবে সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অন্যতম পছন্দের স্থান। আবার খুব অল্পসংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে ভারতে যেতে চায়। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের তথ্যানুসারে ৩.১ শতাংশ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের গন্তব্যস্থল প্রতিবেশী ভারত।
অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে ধরি তাহলে দেখা যায়, যারা মূলত দক্ষ বা হাই স্কিল্ড অভিবাসী তারা দেশে ফিরে আসার জন্য কোনো ইচ্ছে মনের ভেতরে পুষে রাখেন না। যদি রেখেও থাকেন তা হলো, শেষ বয়সে এসে বাংলাদেশ থাকতে চান। আবার যারা অদক্ষ শ্রমিক যারা মূলত দালাল ধরে বিদেশে যান, তারা দেশে টাকা পাঠিয়ে কয়েক বছরের ভেতরে দেশে ফিরে এসে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। কিন্তু এ ধরনের কোনো তথ্য নেই যে, এই দুই ধরনের প্রবাসীরা কারা আয়ের কত অংশ বাংলাদেশে পাঠান। তবে ধারণা করা যায়, যারা সাধারণত শিক্ষিত বা দক্ষ পেশাজীবী, তারা দেশে বেশি পরিমাণে অর্থ পাঠান না। এ ধরনের ব্যক্তিরা বেশি মাত্রায় ব্যক্তি বা আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে তারা বিদেশে সম্পত্তি গড়ার দিকে ঝোঁকেন। একইভাবে যারা অল্প-স্বল্প শিক্ষিত তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় পারিবারিক চাহিদার কারণেই তারা দেশে বেশি অর্থ প্রেরণ করতে বাধ্য হন। এ ধরনের ব্যক্তিরা পরিবারের চাহিদা ও সামাজিক চাপে বেশি পরিমাণ অর্থ দেশে নিয়ে আসেন।
অন্যদিকে, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ বাংলাদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যকের কাছেই প্রিয় একটা মাধ্যম হলো হুন্ডি। তারা এই অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্ট (জিইপি) ২০০৬ সালে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয় যে, বাংলাদেশে পাঠানো প্রবাসীদের অর্থের ৫৬ শতাংশই আসে এই হুন্ডির মাধ্যমে। অবশ্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার ইদানীং কিছু বেড়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে এই চিত্র অনেকটাই পাল্টেছে। আবার দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে অবৈধ পথে বেশ কিছু টাকা অনায়াসে আনা যায়, যা কি না রেমিট্যান্সের হিসাবের বাইরেই থাকে। ফলে সেসব এলাকায় চোরা কারবারের বিষয়ে স্থানীয় জনগণ বেশি পরিমাণে উৎসাহী। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহারের জন্য সরকার এখন ২ শতাংশ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো টাকার ওপর ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার ফলে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে এখন ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
আমাদের দেশের উন্নয়নে রেমিট্যান্সের প্রভাব ও গুরুত্ব বোঝানোর জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মাইক্রো এবং ম্যাক্রোপর্যায়ের আর্থসামাজিক বিষয়গুলোর ওপরে জোর দেওয়া দরকার। আমাদের মতো দেশগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক উন্নয়নে রেমিট্যান্স অনুঘটকের মতো কাজ করে। প্রবাসীরা দেশে কর্মসংস্থানবিহীন থেকেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের সুযোগ করে দিতে পারেনি। তথাপি তাদের পাঠানো অর্থের দ্বারা আমাদের দেশের উন্নতি হলেও বিদেশ থেকে দেশে আসার পথে বিমানবন্দরে এই প্রবাসীরা নানা ধরনের অসহযোগিতার মুখে পড়েন। তাদের জন্য নেই কোনো আলাদা চ্যানেল, যাতে করে অনেকটা ভ্রমণের ক্লান্তিতে এই প্রবাসী শ্রমিকরা দ্রুত বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। ভিআইপি বা সিআইপিরা যে ধরনের সুযোগ পেয়ে থাকেন, সেই রকম না হলেও আলাদা ক্যাটাগরি আমরা তাদের জন্য করতেই পারি। আবার অনেক প্রবাসী শ্রমিকরা লেখাপড়া তেমন জানেন না বলে এম্বারকেশন কার্ড বা বহির্গমনের জন্য যে ফরম পূরণ করতে হয় তার জন্য আলাদা করে কোনো হেল্পডেস্ক রাখার মাধ্যমে তাদের বিদেশ ভ্রমণ আমরা আরও সহজ করতে পারি।
যাদের পাঠানো অর্থে আমরা দেশে আরাম-আয়েশ করছি, শুধু বিমানবন্দরে না, সামাজিকভাবে কি আমরা তাদের মূল্য দিচ্ছি? আমাদের শিক্ষার হার বেড়েছে কিন্তু মানসিকভাবে কি আমরা শিক্ষিত হয়েছি? এই প্রশ্ন দেশ পরিচালনার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত তাদের কাছেই। উন্নয়ন ও রেমিট্যান্সের মধ্যে একটা ধনাত্মক যোগসূত্র আছে। স্বীকার করতেই হবে বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। হচ্ছে নতুন সম্ভাবনার জন্ম। এমন সময় আমাদের সবার সক্ষমতার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের তাই আরও দূরদর্শী হতে হবে, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে সেসব বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দেশের বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিকের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদার বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করতে হবে। তাহলে প্রবাসী শ্রমিকদের মানসিক কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
লেখক ব্যাংকার ও গবেষক
