শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কাঞ্চন-এমিলিকে ছাড়াতে চান তপু

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ০২:০৭ এএম

২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে ৩-০ জয়ের শেষ গোলটি করলেন রোকনুজ্জামান কাঞ্চন। এরপর নিজেকে ইতিহাসের পাতায় তুলে নিলেন সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করে। সেই আসরে কাঞ্চনের তিন গোল বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা রেখেছিল অগ্রণী ভূমিকা। সেই আসরে আক্রমণভাগে কাঞ্চনের সহযাত্রী ছিলেন তরুণ জাহিদ হাসান এমিলি। টুর্নামেন্টে তিনিও করেন  দু’গোল। সাফে কাঞ্চন অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি সেই আসর দিয়েই। শুরু হয় এমিলির এগিয়ে চলা। এরপর খেলেছেন আরও চারটি সাফ। গোলের হিসাবটা সমৃদ্ধ হয়ে ঠেকেছে কাঞ্চনের সমান পাঁচে। ২০২১ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে পুরনো দুই স্ট্রাইকারের খেড়ো খাতা খুলে বসতে দেখে নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন? আসলে তপু বর্মণ বাধ্য করলেন সেই হিসাব কষতে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শুক্রবার পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে জিতিয়েছ সেন্টারব্যাক তপু। এই গোলের মধ্য দিয়ে সাফে তার গোল সংখ্যা পৌঁছেছে চারে। দক্ষিণ এশিয়া ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে লাল-সবুজ জার্সিতে দুই পূর্বসূরির গোলের রেকর্ডে চোখ পড়েছে তার। বয়স এখন সাতাশ। ক্যারিয়ারের মধ্য গগনে দাঁড়িয়ে এই ডিফেন্ডার স্বপ্ন দেখেন গোলে কাঞ্চন-এমিলিকে ছাড়িয়ে যাবেন।

সাফে বাংলাদেশের হয়ে চার গোল অবশ্য আছে আরও দু’জনের। আরিফুল কবীর ফরহাদ ও এনামুল হক। দু’জনেরই পরিচয় স্ট্রাইকার। ফরহাদের চার গোল ২০০৩ ও ২০০৫ সাফে। আর এনামুল দেশের মাটিতে ২০০৯ সালে এক আসরেই করেছিলেন চার গোল। ফরহাদ-এনামুলকে ছোঁয়ার পর কাল প্র্যাকটিস মাঠে এসে সংবাদকর্মীদের কাছে রসিকতার ছলেই তপু জানতে চাইলেন, ‘বলেন তো, সাফে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোল কার?’

গোলের গোলকধাঁধা থেকে বেরুনোর পথটা একজন সেন্টারব্যাক হয়েও খুঁজে পেয়েছেন তপু। যেটা খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত দলের স্বীকৃত ফরোয়ার্ডরা। শ্রীলঙ্কা ম্যাচে খানিকটা চোট পাওয়ায় কাল অনুশীলনে দলের সঙ্গী হলেও ঘাম ঝরাননি তপু। বরং সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় কেটে গেছে তার সময়। এক সাংবাদিক তো মজা করে বলেই ফেললেন, ‘ডিফেন্স ছেড়ে বরং নাম্বার-নাইন জার্সিটা নিয়ে নিন।’ এক গাল হেসে তপুর জিভে কামড়, ‘আর বলবেন না ভাই। আমার ক্যারিয়ারটা ধ্বংস করতে চান নাকি! আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি ডিফেন্ডার হিসেবে। ঘর সামলানোই আমার প্রথম দায়িত্ব। এছাড়া পেছন থেকে সবাইকে অনুপ্রাণিত করারও একটা বাড়তি দায়িত্ব আছে। এ সবেই আমি বেশ ভালো আছি।’

‘তাহলে কার বেশি গোল জানতে চাইলেন যে?’ এমন প্রশ্নে ট্রেডমার্ক হাসি তপুর ঠোঁটে। বললেন, ‘গোল করতে তো আমার ভালোই লাগে। বক্সে ঢুকলেই নিশপিশ করে। সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় তাকি। জানেন তো, আমার কাছে কিন্তু সব রেকর্ডই জানা (হাসি)। কাঞ্চন ভাই, এমিলি ভাই পাঁচটা করে গোল করেছেন। এনামুল ভাই আর ফরহাদ ভাইয়ের আছে চার গোল করে। আরেকটা রেকর্ডও জানি। ডিফেন্ডার হিসেবে কায়সার হামিদ ভাইয়ের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সর্বোচ্চ ছয় গোল। আমার গোলসংখ্যা পাঁচ। সেটাও কিন্তু আমি ভেঙে দিতে পারি।’

কায়সার হামিদকে ছাড়িয়ে যাওয়া তপুর পক্ষে খুব সম্ভব। এমন একটা বিশ্বাস আছে সবার মধ্যে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোলটা এক পাশে রাখুন। প্রথমার্ধে যে দু’টি ভালো সুযোগ এসেছিল সেই দু’টিতেই দৃশ্যপটে হাজির তপু। প্রথমটা বিশ্বনাথের লম্বা থ্রো-ইন পায়ে জমিয়ে ৯০ ডিগ্রি ঘুরে যে শটটা নেন তা কোনোমতে ব্লক করেন এক ডিফেন্ডার। আর যোগ করা সময়ে ইয়াসিন আরাফাতের মাপা ক্রসে অসাধারণ হেডে প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন আচমকা ডিফেন্স ছেড়ে আক্রমণে আসা তপু। কিন্তু শ্রীলঙ্কার কিপার সুজন পেরেরা অসাধারণ দক্ষতায় তা ফিরিয়ে দেন।

২০১৫ কেরালা সাফে ভুটানের বিপক্ষে গোল দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে খাতা খুলেছিলেন তপু। এরপর সর্বশেষ ২০১৮ ঢাকা সাফে ভুটানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে তিন মিনিটে গোল করেন তিনি। পরের ম্যাচেই পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটা করেন ৮৫ মিনিটে। শুক্রবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষ লক্ষ্যভেদের আগে অবশ্য ক্যারিয়ারের সেরা গোলটা করেছেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে। কাতারে অনুষ্ঠিত যে গোলের সুবাদে বাংলাদেশ ১-১ গোলে রুখে দেয় আফগানদের।

দল জিতেছে তার গোলে। তাই খুব চনমনে দেখাচ্ছিল তপুকে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডার ফাঁকে দলের মিডিয়া অফিসার হাসান মাহমুদের কাছ থেকে ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে বনে গেলেন ক্যামেরাম্যান। ঘুরে ঘুরে ফ্রেমবন্দি করলেন অনুশীলনে থাকা সতীর্থদের। আবার ফিরে এসে শুরু করলেন আড্ডা, ‘এখানে আসার পর থেকে বায়ো বাবলে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। তেল-নুন-ঝাল ছাড়া খাবার আর কত ভালো লাগে বলেন? একটু যদি মরিচ ডলে ভাত খেতে পারতাম!’ মুখে ভাতের জন্য হাপিত্যেশ করলেও কঠিন এই জীবনটাকেই গলার হার করে নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে উঠে আসা তপু, ‘জানেন ভাই। ক্লাবের চেয়ে জাতীয় দলের হয়ে খেলতেই আমার বেশি ভালো লাগে। হ্যাঁ, এখানে অনেক নিয়মে থাকতে হয়। তারপরও দেশের জন্য খেলার অনুভূতিটা বলে বোঝাতে পারব না।’

রক্ষণ সামলানো মূল দায়িত্ব হলেও গোলদাতা তপু কিন্তু বরাবরই পায় বাংলাদেশের জন্য। যে চার ম্যাচে পাঁচ গোল করেছেন তিনি, তার একটিতেও হারেনি বাংলাদেশ (তিন জয়, এক ড্র)। সাফের প্রতিপক্ষদের মধ্যে এখন কেবল ভারত আর মালদ্বীপের বিপক্ষে গোল পাননি তপু। সামনের দু’টি ম্যাচেই সেই আক্ষেপ ভোলার সুযোগ আছে তার। মনে করিয়ে দিতে আগের কথাই পুনরাবৃত্তি করলেন স্পেন তারকা সার্জিও রামোসের পাঁড় সমর্থক তপু, ‘আমার কাজ সবার আগে ডিফেন্স সামলানো। কোচও আমাদের সেটাই বলেছেন। আগে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তারপর সুযোগ পেলে গোল। তারপরও সুযোগ পেলে কথা দিচ্ছি, ভারত-মালদ্বীপ ছাড় পাবে না।’ তপুর এই আত্মবিশ্বাসটা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে গেলেই বদলে যাবে বাংলাদেশ দলের চেহারা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত