সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জিয়ার মরণোত্তর বিচার চেয়ে তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২১, ০২:৪৪ এএম

কথিত অভ্যুত্থানের ‘অভিযোগে’ ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর ক্যান্টনমেন্টসহ বিভিন্ন স্থানে গুলি-নির্যাতন করে হত্যা, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড ও চাকরিচ্যুতির ঘটনায় জিয়াউর রহমানের বিচার ও নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন দাবি করেছেন নিহত সৈনিকদের পরিবারের সদস্যরা সন্তানরা।

গতকাল অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকে তাদের নিহত স্বজনের ছবি সঙ্গে নিয়ে আসেন। কারও বুকে ছিল বাবার ছবি, আবার কারও বুকে স্বামীর। সভায় নিজেদের দুঃসহ কষ্টের কথা তুলে ধরেন নিহতের স্বজনরা।

ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত সার্জেন্ট দেলোয়ার হোসেনের ছেলে নূরে আলম বলেন, আজ ৪৪ বছর বাবা নিখোঁজ। এক বছর বয়সে আমি বাবা হারিয়ে এতিম হয়েছি। মাত্র ২২ বছর বয়সে আমার মা বিধবা হয়েছে। প্রতি বছর এই দিন এলে মা অস্থির হয়ে ওঠে। বাবার খোঁজে আমার মা দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। সেদিন কী ঘটেছে, আমরা জানতে চাই। তদন্ত কমিশন গঠন করে সুষ্ঠু বিচার চাই।

সার্জেন্ট তোফাজ্জল হাসানের স্ত্রী লায়লা আরজুমান বানু বলেন, ২ অক্টোবর যখন গন্ডগোল হয় সে সময় আমার স্বামী কুর্মিটোলা ব্যারাকে ছিলেন। হঠাৎ করে দেখি তার চিঠি আসে না। তখন খোঁজাখুঁজির পর শুনি ওনাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে গেছে। এরপর তার আর খোঁজ পাইনি। আমার ৬ মাসের বাচ্চাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি কেউ তার তথ্য দিতে পারেনি। কোন অপরাধে তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে তাও জানি না। তার মরদেহ আমি খুঁজে পাইনি। আর্থিক অসচ্ছলতায় সন্তানদেরও ঠিকভাবে মানুষ করতে পারিনি। জীবনের এই পর্যায়ে এসেও কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছে নেই। আমার শুধু একটাই দাবি যারা অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করেছে। আমি তাদের বিচার চাই।

সভায় সার্জেন্ট মকবুল হোসেনের স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, আমার সন্তানরা বাবার মৃত্যুর তারিখ জানে না, মরদেহ পাওয়া যায়নি। তাদের প্রশ্নের জবাবে উত্তর দিতে পারিনি। আমরা তো অনেক কষ্টে জীবন পার করেছি। এখন আমাদের সন্তানরা যদি কিছু পায় তাহলেই অনেক কিছু হবে। শহীদদের রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা ঘোষণা করা হোক। সেটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া হবে।

এ সময় উপস্থিত পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখন রাষ্ট্রদ্রোহীর তকমা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে বেঁচে যাওয়া সৈনিক ও তাদের সন্তানের। অথচ যারা সেদিন নিহত হয়েছিলেন তারা প্রত্যেকে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। বিচারের নামে দিনের পর দিন সৈনিকদের সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে হাত, পা ও চোখ বেঁধে দিনের পর দিন ফেলে রেখেছিল। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। টর্চার সেলে নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষতবিক্ষত অর্ধমৃত সৈনিকদেরও ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। সেই লাশগুলো কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে তারও কোনো অস্তিত্ব নেই। আমরা ওইসব ঘটনার বিচার চাই।

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে বেশ কয়েকটি কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার মধ্যে ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ঘটনা অন্যতম। প্রতিটি কলঙ্কময় দিনের মূল কুশীলব খুনি জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, এরপরেও অসংখ্য দেশপ্রেমিককে হত্যা করেছেন। তার হাত রক্তে কলঙ্কিত, তার হাতে রক্তের দাগ।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, জিয়াউর রহমান এক আদর্শহীন নায়ক। তিনি সকালবেলা হত্যাকাণ্ডের খবর নিয়ে কাজ শুরু করতেন। তার একমাত্র বিশ্বাসের জায়গা ছিল পাকিস্তান। তার বিশ্বাসের জায়গা ছিল আইএসআই।ৃআমি শুধু বলব, বাংলাদেশকে যদি সত্যিকারভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিয়োজিত করতে হয়, তাহলে জিয়াউর রহমান কিংবা এরশাদের কোনো চিহ্ন দেশের রাজনীতিতে রাখা চলবে না।

জিয়াউর রহমান বা যারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে তাদের প্রত্যেকের মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিত। তাই যত বিলম্বই হোক না কেন, হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ডের ব্যানারে ‘১৯৭৭ সালের বিদ্রোহ দমনের নামে সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের ফাঁসি, কারাদণ্ড ও চাকরিচ্যুতির ঘটনায় জিয়ার মরণোত্তর বিচারের দাবিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বীরবিক্রম মাহবুব উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক বজলুল হক প্রমুখ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত