২৫ মাস বিচারকাজের বাইরে ৩ বিচারপতি

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪৫ এএম

অসদাচরণের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতিকে ২৫ মাসের বেশি সময় (২০১৯ সালের আগস্ট থেকে) আগে বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এরপর তাদের বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি যে, তিন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা হচ্ছে। তিন বিচারক হলেন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হক। যদিও সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে হাইকোর্টের বিচারকদের তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। কার্যত বিচারক হলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুরাহা না হওয়ায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে হাইকোর্টের বেঞ্চে বসে বিচারকাজ পরিচালনা থেকে দূরে তারা। এদিকে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) বিচারাধীন থাকায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল আছে কি নেই এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে আইনবিদদের।

তিন বিচারপতির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকেও তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের বিষয়ে কোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মেলেনি। অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে জানান, এটি একান্তই রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে জানান, এটি প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। ব্যক্তিগত অভিমতে তিনি বলেন, যতদূর জানি, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন) আবেদন মামলা বিচারাধীন। এখন এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে এই মামলায় হয়তো সিদ্ধান্ত হতে হবে। এদিকে জ্যেষ্ঠ আইনবিদরা বলছেন, তিন বিচারপতিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিচারিক দায়িত্ব পালনরত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সমীচীন। ব্যত্যয় হলে সেটি হবে অনাকাক্সিক্ষত। এভাবে দিনের পর দিন বিচার বিভাগের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ঝুলিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন তারা।

বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ২০০২ সালের ২৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ২০০৪ সালের ২৯ জুলাই হাইকোর্টে নিয়মিত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল একই বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল নিয়মিত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। বিচারপতি একেএম জহিরুল হক ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল একই বিভাগে নিয়মিত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পান।

২০১৯ সালের ২২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, তিনজন বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তাদের বিচারিক কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ওইদিন থেকেই তিনজন ছুটিতে যান। তবে তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, কবে থেকে অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে এবং কারা অনুসন্ধান করছে সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে আনুষ্ঠানিক কিছু তখন জানানো হয়নি। তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান কীভাবে হবে কিংবা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে অনুসন্ধান হবে কি না এমন প্রশ্নে ওইদিন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (ইতিমধ্যে প্রয়াত) সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি অনুসন্ধানের বিষয়ে ঠিক করবেন। জানতে চাইলে বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজেও এ নিয়ে কিছুই জানি না। এ বিষয়ে শুধু রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতিই জানেন। আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না।’ তিন বিচারপতি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুটির দ্রুত সুরাহা হওয়া উচিত কি না এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘শুধু এটিই নয়, আমি মনে করি সব বিষয়েরই সুরাহা হওয়া উচিত।’

প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি তারা (তিন বিচারপতি) বেতনভাতা পেয়ে থাকেন এবং কোনোরকম বিচারিক দায়িত্বে যেহেতু নেই এতে করে রাষ্ট্র ও জনগণ তো উপকৃত হচ্ছে না। এটার তো একটা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। এখন এ বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। এভাবে ঝুলিয়ে রাখার তো কোনো যুক্তি দেখি না। বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কাম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে এটার তো একটা প্রতিকার ও ব্যবস্থা আছে। সাংবিধানিকভাবে একটা পন্থা আছে। আর যেহেতু এটি বিচার বিভাগের বিষয়। সংবিধানেও তো কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ একদিনও ঝুলিয়ে রাখা সমর্থন করে না। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে যদি এটি দীর্ঘায়িত করা হয় তাহলে সেটি হবে অনাকাক্সিক্ষত।’

এদিকে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন) আবেদন বিচারাধীন। এমন পরিস্থিতিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল থাকা না থাকা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। ফলে ওই তিন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোন পন্থায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটিও স্পষ্ট হয়নি।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রত্যেকেরই বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ তিনজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী সে বিষয়ে এখনো জানা যায়নি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল কিন্তু প্রায় দুই বছর তাদের বেঞ্চ দেওয়া হচ্ছে না। যদি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের কার্যভার থেকে বিরত রাখার কোনো যুক্তি নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রয়েছে। তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু কেন তারা উদ্যোগ নিচ্ছেন না সেটি বোধগম্য নয়। এটা আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইনবিষয়ক সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টস’র (ডিএলআর)-এর সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ নিয়ে অনেকের মতো আমরা আইনজীবীরাও অন্ধকারে আছি। দুই বছর ধরে হাইকোর্টের দৈনিক কার্যতালিকায় এ তিন বিচারপতির নাম নেই। এ সময়ে তারা কার্যত বিচারপতি হিসেবে আছেন ঠিকই কিন্তু বিচারকার্য থেকে বিরত আছেন। একজন বিচারপতির মুখ্য কাজ বেঞ্চে বসা দুপক্ষের বক্তব্য শুনে বিচার করা। এখন প্রয়োজনের স্বার্থে বিষয়টি স্পষ্ট ও সবার কাছে দৃশ্যমান হওয়া উচিত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিচারকদের অপসারণসংক্রান্ত ষোড়শ সংশোধনীর বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ বিচারাধীন। এখন কেউ বলছেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বহাল রয়েছে। আবার কেউ বলছেন নেই। এমন পরিস্থিতিতে রিভিউ পিটিশনটি অতিসত্বর নিষ্পত্তি করা উচিত। যাতে কোনো ধূম্রজাল না থাকে। এ বিষয়ে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।’

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মতামত দেব না। এটা বিচার বিভাগের বিষয়। আমি মতামত দিলে এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা হবে। এটা প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। তবে আমি যতদূর জানি, এখন যেহেতু ষোড়শ সংশোধনীর মামলায় রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয়েছে এবং আপিল বিভাগে রিভিউ বিচারাধীন, হয়তো এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে এ মামলায় সিদ্ধান্ত হতে হবে। তারপরই হয়তো ওনারা পারবেন। আমার জ্ঞানত আমি এটাই বলতে পারি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত