ধর্ষণের পর হত্যা

১৮ বছর পর আজিজ ও কালুর ফাঁসি কার্যকর

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২১, ০৫:৪৯ এএম

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় দুই নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। গত সোমবার রাত পৌনে ১১টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসি কার্যকর হওয়া দুজন হলেন আলমডাঙ্গার খাসকররা ইউনিয়নের রায় লক্ষ্মীপুর গ্রামের আজিজ ওরফে আজিজুল (৫০) ও একই গ্রামের মিন্টু ওরফে কালু (৫০)।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার তুহিন কান্তি খান এবং যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সোমবার রাতেই দুজনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে নিজ গ্রামে ওই দুজনকে দাফন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বিচারিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে এ ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে টানা ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

দুজনের ফাঁসি কার্যকরের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার তুহিন কান্তি খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের ফাঁসি কার্যকরের জন্য কয়েক দিন ধরে আমরা প্রস্তুতি নিই। স্বজনরা গত শনিবার কারাগারে এসে শেষবারের মতো তাদের দুজনের সঙ্গে দেখা করেন। দুই পরিবারের অর্ধশতাধিক মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা করিয়ে দিয়েছি। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী শনিবার গরুর কলিজা ও ইলিশ মাছ খাওয়ানো হয়। পরদিন রবিবার গ্রিল ও নানরুটি আর সোমবার মুরগির মাংস, দই ও মিষ্টি খাওয়ানো হয়।’

জেলার তুহিন কান্তি খান জানান, দুজনের ফাঁসি কার্যকরের জন্য কারাগারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ১৩ জন অস্ত্রধারী কারারক্ষী কারাগারের ভেতরে টহল দেন। সন্ধ্যার পর থেকেই গোটা এলাকায় পুলিশ ও র‌্যাবের নজরদারি বাড়ানো হয়। পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন কারাগারের ফটকেও। দুজনের ফাঁসি কার্যকর করতে রাতে একে একে কারাগারে ঢোকেন যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ার্দ্দার, সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামান। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনকে রাতে গোসল করানোর পর তাদের তওবা পড়ান কারা মসজিদের ইমাম। রাতেই স্বজনদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের পর তাদের খাবার খাওয়ানো হয়। এরপর তাদের রায় পড়ে শোনানো হয়। নিম্ন আদালতের রায়, আপিল এবং রাষ্ট্রপতির কাছে করা ক্ষমার আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টিও তাদের জানানো হয়। পরে দুজনকে জমটুপি পরিয়ে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে প্রথমে মিন্টু ওরফে কালু, এর পাঁচ মিনিট পর একই গ্রামের আজিজ ওরফে আজিজুলের ফাঁসি কার্যকর হয়। ফাঁসি কার্যকরে ছিলেন কেতু কামার, মশিয়ার রহমান, লিটু হোসেন, আজিজুর রহমান ও কাদের নামের পাঁচ জল্লাদ। ফরেনসিক টিম ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার পর দুজনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে সন্ধ্যায় কালু ও আজিজুলের পরিবারের সাত সদস্য তাদের মরদেহ নিতে কারাগারে যান। এ সময় দুজনের জন্য আলাদা দুটি অ্যাম্বুলেন্স তাদের সঙ্গে ছিল।

বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে টানা ১৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসানে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন হত্যার শিকার দুই নারীর স্বজনরা। মামলার বাদী ও নিহত কমলা খাতুনের মেয়ে নার্গিস খাতুন বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর হলেও দোষীদের শাস্তি হওয়ায় খুশি আমরা। মামলার রায়ে দীর্ঘদিন পার হলেও এতদিন পর ন্যায়বিচার পেয়ে আমাদের স্বস্তি ফিরেছে।’

২০০৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আলমডাঙ্গার জোড়গাছা গ্রামের কমলা খাতুন ও ফিঙ্গে বেগম নামে দুই নারীকে রায় লক্ষ্মীপুর গ্রামের মাঠে হত্যা করা হয়। তারা দুজন বান্ধবী ছিলেন। হত্যার আগে তাদের দুজনকে ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধের পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে ওই দুই নারীর গলা কাটা হয়। এ ঘটনায় নিহত কমলা খাতুনের মেয়ে নার্গিস খাতুন বাদী হয়ে পরদিন আলমডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া দুজনসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অন্য দুজন হলেন একই গ্রামের সুজন ও মহি। মামলা বিচারাধীন অবস্থায় আসামি মহি মারা যান। ২০০৭ সালের ২৬ জুলাই এ মামলায় চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সুজন, আজিজ ও কালুকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপর আসামিপক্ষের লোকজন হাইকোর্টে আপিল করেন। ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় বহাল রাখে। ২০১২ সালে ১১ নভেম্বর নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখার আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর চলতি বছর ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ দুই আসামির রায় বহাল রাখে এবং অন্য আসামি সুজনকে খালাস দেয়। গত ২০ জুলাই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান খালাসপ্রাপ্ত সুজন। পরে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আজিজ ও কালু রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলেও সেই আবেদন নাকচ হয়ে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত