গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে তরুণী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুতে তার বোন নুসরাত জাহান তানিয়ার আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ নাকচ হয়ে যাওয়ার পর তারই উত্থাপিত হত্যার অভিযোগ তদন্ত করার আইনি সুযোগ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এক দল জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনে করছেন, একই ঘটনায় মৃতের ভাইয়ের দায়ের করা হত্যা মামলা স্থগিত রেখে পুলিশি তদন্তে প্রত্যাখ্যাত মৃতের বোনের আরেকটি অভিযোগ তদন্ত করা এ সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ ঘটনায় এ পর্যন্ত করা তিনটি মামলার মধ্যে প্রথমটি এরই মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় মামলাটি অনিষ্পন্ন রেখে তদন্তে পাঠানো হয়েছে তৃতীয় মামলা। একটি ঘটনাকে ঘিরে একই বাদীর দুই রকমের অভিযোগ, বাদীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারও সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। গত ২৬ এপ্রিল মুনিয়ার লাশ উদ্ধারের পর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন মৃতের বোন নুসরাত জাহান তানিয়া। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং অন্যান্য আলামত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও তদন্ত করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, আত্মহত্যার কোনো প্ররোচনার ঘটনা ঘটেনি। চার মাস তদন্তের পর গত ১৯ জুলাই আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। শুনানি শেষে ১৮ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আদালত। একই সঙ্গে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় এ মামলা থেকে সায়েম সোবহান আনভীরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পুলিশের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নুসরাতের দেওয়া নারাজি আবেদনও নথিপত্র বিশ্লেষণপূর্বক খারিজ করে দেওয়া হয়। এর আগে মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে গত ২ মে একটি হত্যা মামলা করেন তার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। তিনি মামলায় অভিযুক্ত করেন চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে। কিন্তু প্রথম মামলা চলমান থাকায় এ মামলাটির কার্যকারিতা স্থগিতের আদেশ দেয় আদালত। প্রথম মামলার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সবুজের মামলাটিই চালু হওয়ার কথা বলে মনে করেন আইনজীবীরা। কিন্তু এর মধ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর একই ঘটনা নতুনভাবে উপস্থাপন করে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা করেন প্রথম মামলার বাদী নুসরাত। আদালত সেটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দেয়। আইনজীবীরা বলছেন, এর মাধ্যমে আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে। তাদের মতে, নুসরাতের করা প্রথম মামলা কার্যকারিতা হারালে ভাই সবুজের করা দ্বিতীয় মামলাটি তদন্তে আসবে। কিন্তু এটি না করে নুসরাতের করা তৃতীয় আরেকটি মামলা গ্রহণ ও তদন্তের নির্দেশ বিধিমতো হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, মুনিয়ার ভাইয়ের মামলা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে কি না? এ বিষয়ে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এবিএম আলতাফ হোসেন বলেন, একই ঘটনায় একই আসামির বিরুদ্ধে একই বাদীর দুই ধরনের মামলা করার সুযোগ আইনে নেই। বাদী নুসরাত প্রথমে আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা করেছিলেন। মামলাটিতে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করেছে এবং আসামিকে অব্যাহতি দিয়েছে। এমনকি বাদীর নারাজি আবেদনও খারিজ হয়েছে। এখানে নারাজি আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রক্রিয়া গ্রহণে বাদীর সুযোগ ছিল। তবে তিনি তা না করে নতুন করে নতুন অভিযোগে মামলা করেছেন। অর্থাৎ তিনি নিজেই অভিযোগ নিয়ে কনফিউশনে রয়েছেন। পরে করা তার মামলাটি সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া নতুন মামলাটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩(১) ধারারও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে করেন তিনি। সংবিধানের ৩৫(২)-এ বলা হয়েছে, এক অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দন্ডিত করা যাইবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এখতিয়ারবান আদালতে যখন কোনো অপরাধের জন্য যে ব্যক্তির একবার বিচার হয়েছে এবং তাকে উক্ত অপরাধের জন্য দন্ডদান করা অথবা অপরাধ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে, তখন উক্ত খালাস বা দন্ড বলবৎ থাকার সময় তাকে একই অপরাধের জন্য পুনরায় বিচার করা যাবে না। অথবা একই ঘটনা হইতে উদ্ভূত অন্য কোনো অপরাধের জন্যও পুনরায় তার বিচার করা যাবে না। যে অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে ২৩৬ অনুসারে একটি পৃথক অভিযোগ আনয়ন করা যাবে বা যার জন্য তার বিরুদ্ধে ২৩৭ ধারা অনুসারে দ-িত করা যাবে।
নজিরবিহীন বলছেন আইনজীবীরা : ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘মুনিয়ার ভাইয়ের করা দ্বিতীয় মামলা স্থগিত ছিল নুসরাতের করা প্রথম মামলা পরিচালনার স্বার্থে। এখন যেহেতু প্রথম মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে তাই দ্বিতীয় মামলা চলবে। দ্বিতীয় মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে আর কোনো মামলা হতে পারে না। পূর্ববর্তী মামলায় বাদী যদি কোনো গাফিলতি হয়েছে বলে মনে করে তাহলে সে নারাজি দিতে পারে। কিন্তু একই বিষয়ের ওপর আবারও মামলা করতে পারে না। এভাবে মামলা হয় না, আইনে নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় যে মামলা করা হয়েছে সেটা নিষ্পত্তির আগে একই বিষয়ের ওপর তৃতীয় মামলা হতে পারে না। যদি কেউ এ ধরনের মামলা করেও তাহলে তা খারিজ হয়ে যাবে। জুডিশিয়াল নোটিসে যখন সেই মামলা আসবে তখন তা খারিজ হয়ে যাবে। একই বিষয়ে একাধিক মামলা চলতে পারে না। যেহেতু একই ঘটনায় হত্যা মামলা আগেই করা আছে এ মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনে মামলা করার সুযোগ নেই। কোর্ট বিষয়টি জানতে পারলে খারিজ করে দেবেন।’ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আরফান উদ্দিন খান বলেন, ‘আত্মহত্যা প্ররোচনার পরে একই বাদীর হত্যা মামলা দায়ের নজিরবিহীন। আমার জীবনে এমন মামলা দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘বড় ভাই (আশিকুর রহমান সবুজ) যে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন সেই মামলাটি স্থগিত থাকতে পারে না। কোর্টের উচিত ছিল এটি একই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করা। যেহেতু আত্মহত্যা রেজাল্ট এসেছে কোর্ট পিবিআইকে এই হত্যা মামলা দিতেই পারে না বলে আমি মনে করি। আত্মহত্যা যেখানে মেডিকেলি প্রমাণিত সেখানে হত্যা মামলা হয় কী করে! এই মামলা টিকবে না, পিবিআই বা যাকেই দিক ফাইনাল রিপোর্ট দেবে। এটি ১৫৪ ধারা কভার করে না।’
আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, ‘একই বাদী দুই ধরনের মামলা করায় সুবিধা পাবে বিবাদী। কারণ এক বাদী কীভাবে একেক সময় একেক ধরনের মামলা করেন। তা তদন্ত কর্মকর্তার সামনে আসবে। আমার মনে হয় নুসরাত তার ভাইয়ের দায়ের করা মামলা গোপন করেছে, না হলে আদালত দুই মামলারই তদন্ত করার নির্দেশ দিত। কারণ একই ঘটনার একই সঙ্গে পৃথক দুটি তদন্ত হতে পারে না। বাদী নিজে বলেছে আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা, ময়নাতদন্তে প্রমাণ হয়েছে আত্মহত্যা। সে সময় মুনিয়ার ভাই একটা হত্যা মামলা করে। সেই হত্যা মামলার রিপোর্ট এখন স্থগিত। এ অবস্থায় মুনিয়ার বোন আবার আরেকটা হত্যা মামলা করে। এটা পুলিশকে হয়রানি ছাড়া আর কিছু না। ভাইয়ের মামলা কেন নুসরাত গোপন করল। নাহলে তো দুই মামলাই একসঙ্গে তদন্ত হওয়ার কথা।’
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলার ফাইনাল রিপোর্টে আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ মেলেনি সেখানে হত্যা মামলা আসবে কোথা থেকে। মামলা তদন্ত করে তো কোনো লাভ হবে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট একই, আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এখন সেখানে নতুন করে তদন্ত করে কি পাবে?
মুনিয়ার ভাইয়ের মামলার আর্জিতে যা আছে গত ২ মে মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করেন মুনিয়ার বড় ভাই আশিকুর রহমান সবুজ। ওই মামলার আর্জিতে সবুজ বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে শারুনের ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল। এ কারণে শারুন মুনিয়ার মাধ্যমে আনভীরের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত তথ্য জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে অসম্মতি জানালে মুনিয়ার ওপর ক্ষিপ্ত হন শারুন। এর প্রতিশোধ নিতে শারুনই সহযোগীদের নিয়ে মুনিয়াকে হত্যা করে। সবুজের দাবি, তার বোন মুনিয়াকে শারুন চৌধুরী ও তার সহযোগীরা ঘটনার দিন ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে ঢুকে হত্যা করে। পরে তার বোনের লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে কৌশলে বাসা থেকে বের হন শারুন। মামলার আবেদনে আরও বলা হয়, আসামি নাজমুল করিম শারুন আমার কোমলমতি বোনকে অসৎ উদ্দেশ্যে ‘ব্যবহার ও ভোগ’ করেছে। আমার অধুনা মৃতা বোন মুনিয়া যখনই এই ঘৃণ্য চক্রান্ত থেকে বের হয়ে ফেরত আসতে চেয়েছে, তখনই শারুন আমার বোন মুনিয়ার ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাক্ষী, আমার বোন তানিয়ার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস, নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন সুকৌশলে আমার বোনের ফ্ল্যাটে ঢুকে অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহযোগিতায় নির্মমভাবে হত্যা করে মুনিয়ার মৃতদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে।
