আইন সংস্কারে রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩৯ পিএম

স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যেই জাতির পিতার হত্যাকা-সহ ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনীতিকদের হত্যার মধ্য দিয়ে যেমন দেশকে রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তেমনি বাহাত্তরের সংবিধান কাটাছেঁড়া করে দেশে অগণতান্ত্রিক শাসনের বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। দুঃখজনক বিষয় হলো, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে সামরিক শাসন হটিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও রাষ্ট্রের কাঁধ থেকে এখনো সামরিক ফরমানের জোয়াল নামানো যায়নি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে দেশের দুটি সামরিক সরকারের শাসনামল এবং সে সময় জারি করা সব অধ্যাদেশও অবৈধ হয়ে যায়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই বিকল্প আইন না থাকায় যেসব অধ্যাদেশের প্রয়োজন রয়েছে সেগুলোকে যুগোপযোগী করা এবং বাংলায় অনুবাদ করে আইনে পরিণত করতে ২০১৩ সালে দুটি বিশেষ আইনও পাস করা হয়। অথচ এরপর আট বছর পেরুতে চললেও এই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হচ্ছে না।

সামরিক শাসনামলের এসব ফরমান সংশোধন করে সময়োপযোগী করার কাজটি এখনো সম্পন্ন না হওয়ার নেপথ্যে বিভিন্ন মহলের কোটারি স্বার্থ ও মন্ত্রণালয়গুলোর ব্যর্থতাই দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশ রূপান্তরে বুধবার ‘সুবিধাভোগীদের খপ্পরে ৫১ গুরুত্বপূর্ণ আইন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আইন সংস্কারের প্রতিবন্ধকতাসহ নানা দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সচিব সভায় জানানো হয়েছে এখন ২২টি মন্ত্রণালয়ে ঝুলে থাকা এমন অধ্যাদেশ রয়েছে মোট ৫১টি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এগুলো নিষ্পত্তি করার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও দফায় দফায় সময়সীমা বাড়ানো হচ্ছে। আইন সংস্কারের এই প্রক্রিয়া সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘কোটারি স্বার্থে কিছু অর্ডিন্যান্স আইনে পরিণত করার কাজ শেষ হচ্ছে না।’ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু আইন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বাধার মুখে আটকে আছে। মন্ত্রী পর্যায়ে এসব অর্ডিন্যান্স আইনে পরিণত করার কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলেও মনে করছেন তারা।

লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, সামরিক শাসনামলের এসব অধ্যাদেশের মধ্যে বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ন্ত্রণের ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্স’, ওষুধে শিল্প নিয়ন্ত্রণের ‘ড্রাগ কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স’, নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত ‘দ্য চিফ ইলেকশন কমিশনার, কমিশনারস রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস অর্ডিন্যান্স’, ভূমি সংস্কার সংক্রান্ত ‘ল্যান্ড রিফর্ম অর্ডিন্যান্স’ এবং পুলিশ প্রশাসন সংক্রান্ত ‘মেট্রোপলিটান পুলিশ অর্ডিন্যান্স’-এর মতো জাতীয় স্বার্থরক্ষা এবং জনগুরুত্বপূর্ণ আইনকানুন ও বিধিবিধান রয়েছে। অথচ সুনির্দিষ্ট আইন ছাড়াই চলছে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। আর সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় সেবাধর্মী এ প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তথাপি, অকার্যকর আইনের জন্য এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্মরণ করা যেতে পারে, সাবেক বিএনপি ও বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন শাসনামলে একাধিকবার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অংশীজনদের বিশেষ করে চিকিৎসকদের বিরোধিতার কারণে আইনটি শেষ পর্যন্ত প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। আর এখন চিকিৎসকদের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছেন বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরাও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওষুধ খাত তদারকির জন্য সামরিক আইন সংস্কারও আলোর মুখ দেখছে না ওষুধ কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা করার মানসিকতার কারণে। একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চরম ব্যর্থ হলেও পদমর্যাদা ও সুবিধা নিতে তৎপর নির্বাচন কমিশন সদস্যরা। বর্তমান সচিব সমমর্যাদা বাড়িয়ে বিচারপতির সমান পদমর্যাদা এবং আমৃত্যু অবসর ভাতার দাবিতে আটকে আছে নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত আইন। ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার আইনও আটকে আছে ক্ষমতাবান ভূমির অংশীজনদের আপত্তিতে।

উপরোক্ত বাস্তবতায় সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠছে যে, জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকারী আইন প্রণেতারা জনগুরুত্বপূর্ণ এসব আইনের যুগোপযোগী সংস্কারের বিষয়ে উদাসীন কেন? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রীরাই বা এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালনে নিশ্চুপ রয়েছেন কেন? এটা মনে রাখা উচিত যে, একটি স্বাধীন জাতির উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা জনগণের জন্য সমতা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা প্রদানকারী একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অর্জন। তাই বাহাত্তরের সংবিধান কাটাছেঁড়া করা সামরিক ফরমানগুলোকে সংস্কার করে জনমুখী আইন প্রণয়নের বিষয়ে জাতীয় সংসদ মৌন থাকতে পারে না। আইন সংস্কারের এই প্রক্রিয়া কাদের গাফিলতিতে আটকে রয়েছে সেটাও চিহ্নিত হওয়া জরুরি। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে জাতীয় সংসদ নেতা এবং সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ পদক্ষেপ নেবেন সেটাই কাম্য।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত