রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের পর দেশে এবং বিদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। দেশের এবং বিদেশের প্রধান-অপ্রধান প্রায় সব প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ড কাভার করেছে। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নানান তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রচারের পাশাপাশি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অত্যন্ত গুরুত্বে সঙ্গে সম্প্রচার করেছে। প্রায় সব প্রকাশিত নিবন্ধে ও প্রচারিত অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর হত্যাকান্ডকে অত্যন্ত গুরুতর ‘নিরাপত্তা ইস্যু’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সেটা মোটাদাগে সত্যও বটে। তবে, মুহিবুল্লাহর হত্যাকান্ডের কারণ এবং প্রতিফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পাইকারি হারে রোহিঙ্গা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রকৃতি এবং অবস্থা নিয়ে যে ধরনের আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে, তা নতুন এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে হচ্ছে। এসব সম্ভবত পুরো রোহিঙ্গা ইস্যুটিকেই একটি ভিন্ন মাত্রার সংকটের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। বেশির ভাগ আলোচনায় মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি এই রোহিঙ্গা নেতার প্রতি এক ধরনের দরদ, মমত্ববোধ ও ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে যা প্রশংসনীয় হলেও এটা করতে গিয়ে রোহিঙ্গা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে যেভাবে লেভেলিং করা হচ্ছে, তা প্রকারান্তরে বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা উভয়ের জন্যই নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে। কেননা, বেশিরভাগ লেখালেখি এবং আলোচনায় রোহিঙ্গা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যে পাইকারি চিত্র উঠে আসছে সেটা বিশ্লেষণ করে যদি বাক্য-ভেরিয়েবল সংক্ষেপে সাজানো হয়, তাহলে তার স্বরূপ হবে অনেকটা এরকম: রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সন্ত্রাসীদের আখড়া, সেখানে কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, গত চার বছরে প্রায় ১০৮ জন রোহিঙ্গা নিজেদের মধ্যে আন্তঃকোন্দলে নিহত হয়েছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো দিনের বেলায় একরকম কিন্তু রাতের বেলা তার অন্য চেহারা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৪টা সন্ত্রাসী সংগঠন আছে, আরসা বা আল-ইয়াকিন এখানে অত্যন্ত সক্রিয় এবং সাধারণ রোহিঙ্গারা সবসময় একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকে, ক্যাম্পগুলোতে ইয়াবাসহ অবৈধ মাদক-ব্যবসা চলে রমরমা, নানান ধরনের অপরাধ প্রবণতা রোহিঙ্গাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং সীমান্ত বাণিজ্যের অবৈধ চোরাচালানের মূল অংশীজন এসব রোহিঙ্গা। এ সবগুলো বৈশিষ্ট্যের কথাই এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি এবং রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা-ক্যাম্প সম্পর্কিত একটি পাইকারি উপস্থাপনা। যারা নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাতায়াত করেন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তারা জানেন যে এ ধরনের পাইকারি উপস্থাপনা রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আসল চিত্রকে কোনোভাবেই প্রতিফলিত করে না।
রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা-ক্যাম্পের এ ধরনের নেতিবাচক উপস্থাপনা একদিকে যেমন প্রকৃত চিত্রকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনা করে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সম্পর্কিত বিদ্যমান ও পরিবর্তনশীল সমাজ মনস্তত্ত্বকেও একধরনের নেতিবাচক প্রণোদনা দেয়। পাশাপাশি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান সম্পর্কিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পলিসিকেও এক ধরনের ঝুঁকি ও সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। তাই, মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ড ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা-ক্যাম্প সম্পর্কিত জনপ্রিয় বোঝাবুঝিগুলোকে যেন আমরা আরও নেতিবাচক করে না-তুলি সেদিকে আরও সংবেদনশীল ও সচেতন হওয়ার জরুরি বলে মনে করি। রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা-ক্যাম্প সম্পর্কিত এ ধরনের পাইকারি উপস্থাপনা আমাদের মোটা দাগে তিন ধরনের সমস্যায় ফেলে দিতে পারে।
এক. আমরা যদি নিয়মিতভাবে বলতে থাকি যে, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন সন্ত্রাসীদের আখড়া হয়ে উঠেছে, তাহলে প্রকারান্তরে আমরা নিজের অজান্তেই মিয়ানমারের দাবির পক্ষেই একধরনের অবস্থান গ্রহণ করি। কেননা, মিয়ানমার সবসময় বলে আসছে রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী এবং বাংলাদেশ সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিয়েছে। এবং মিয়ানমারের এ বয়ান মিয়ানমার নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে সরবরাহ করছে। এ অজুহাতকে সামনে রেখেই মিয়ানমার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে। মিয়ানমার যখনই বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসেছে, বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এবং সময়-কাল নিয়ে দেনদরবার করেছে আর মিয়ানমার সবসময়ই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ধরা এবং দমনের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করতে চেয়েছে। ফলে, আমরা যদি মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাইকারি হারে ‘রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী’, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সন্ত্রাসীদের আস্তানা’ এবং নানান ‘সন্ত্রাসী সংগঠন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয়’ প্রভৃতি বলতে থাকি, তাহলে আমরা প্রকারান্তরে মিয়ানমারের দাবিকেই সমর্থন করে যাচ্ছি যা একেবারেই আত্মঘাতী বলে মনে করি। সুতরাং এ ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের আরও সংবেদনশীলতা, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে আলোচনা করতে হবে।
দুই. ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তখন থেকেই মিয়ানমার বলার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ আরসাকে আশ্রয় দিয়েছে। গোটা পৃথিবী জানে এবং মানে যে বাংলাদেশ অত্যন্ত মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছে। কোনো সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয়নি। এর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘বাংলাদেশে আরসা বলে কিছু নেই’। কিন্তু মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বারবার আমরা বলছি যে, এটা আরসা বা আল-ইয়াকিনের কাজ। অনেকে আরসা এবং আল-ইয়াকিনকে স্বতন্ত্র সংগঠন মনে করলেও আরসা আর আল-ইয়াকিন মূলত একই সংগঠন। মুহিবুল্লাহর ভাই হাবিবুল্লাও আল-ইয়াকিনের কথা বলেছেন। সেটা তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু আমরা যদি নিয়মিতভাবে পাইকারি হারে আরসা বা আল-ইয়াকিনের কথা বলি, তাহলে আমরা প্রকারান্তরে মিয়ানমারের দাবিকেই স্বীকার করে নিচ্ছি যে, বাংলাদেশে আরসা আছে যা প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়। বাংলাদেশে কোনো আরসা নেই। কেউ কেউ আরসা বা আল-ইয়াকিনের নাম ব্যবহার করে ক্যাম্পে একটা বিশেষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে কিংবা আরসা বা আল-ইয়াকিনের নামে ক্যাম্পে একটা আতঙ্ক তৈরি করে রাখতে পারে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া মিডিয়ায় পাবলিকলি মুহিবুল্লাহ হত্যাকন্ডের জন্য আরসা বা আল-ইয়াকিনকে দায়ী করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা প্রকারান্তরে মিয়ানমারের দাবিকে এক ধরনের ন্যায্যতা দেয়। তাই এসব বিষয় আমাদের খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
তিন. আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পলিসি হচ্ছে প্রত্যাবাসন এবং আমিও মনে করি প্রত্যাবাসন ছাড়া এর কোনো দীর্ঘমেয়াদি এবং সম্মানজনক বিকল্প নেই। ফলে, আমরা যারা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলি, বিচার-বিশ্লেষণ করি এবং নানান ধরনের মতামত প্রদান করি, আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, আমাদের এমন কিছু বলা বা করা উচিত হবে না, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে এবং প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণে আমরা পাইকারি হারে রোহিঙ্গাদের একটা লেভেলিং করছি যে, রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত দুষ্কৃতকারী। এগারো লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে এভাবে পাইকারি হারে লেভেলিং করা রোহিঙ্গা সম্পর্কে একটি ভিন্ন বার্তা দিতে পারে যা প্রত্যবাসনের প্রক্রিয়াকে সংকটাপন্ন করতে পারে। কেননা, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরকারবারি এবং বিভিন্ন দ্বন্দ্বে লিপ্ত দুষ্কৃতকারীদের মিয়ানমার কেন সানন্দে নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যেতে রাজি হবে? সুতরাং আমরা যেন আমাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের নামে রোহিঙ্গাদের কোনো এমন লেভেলিং করে না-ফেলি, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
পরিশেষে বলব, একথা অনস্বীকার্য যে এগার লাখের অধিক রোহিঙ্গার মধ্যেও দুষ্কৃতকারী আছে, কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আছে, চোর আছে, ডাকাত আছে, দুষ্ট লোক আছে এবং খারাপ লোক আছে; যেটা পৃথিবীর সব সমাজেই কম-বেশি আছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ ধরনের সন্ত্রাসী কিছু লোক আছে বলেই মাঝে মাঝে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এগার লাখের অধিক রোহিঙ্গার মধ্যে এদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। এদের সংখ্যা হবে হয়তো পাঁচশ, এক হাজার বা সর্বোচ্চ দুই হাজার। কিন্তু তাই বলে, পুরো এগার লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে সন্ত্রাসী বা ৩৪টা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে সন্ত্রাসীদের আখড়া বলা যাবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, এভাবে পাইকারি উপস্থাপনা রোহিঙ্গাদের যেমন একটি নেতিবাচক লেভেলিং দিচ্ছে পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকেও ক্রমান্বয়ে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, যা কোনো ভাবেই কাম্য নয়।
লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
