সাহিত্যে নোবেল ২০২১

উপনিবেশ ও বাস্তুচ্যুতির অভিঘাতের গভীর কথন

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২১, ০২:২৬ এএম

প্রতি বছর সারা দুনিয়ার সাহিত্যপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে সাহিত্যের নোবেল। কে পাচ্ছেন এই সর্বোচ্চ মুকুট? এসেছে উৎকণ্ঠার উত্তর এ বছর সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। গতকাল বৃহস্পতিবার নোবেল বিজয়ী ১১৮তম লেখক হিসেবে ৭৩ বছর বয়সী আবদুলরাজাক গুরনাহর নাম ঘোষণা করেছে সুইডিশ অ্যাকাডেমি। তারা বলছে, ঔপনিবেশিকতার প্রভাব ও শরণার্থী জীবন নিয়ে তার গভীর লেখনীর জন্য এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

নোবেল জয়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় আবদুলরাজাক গুরনাহ বলেন, অসাধারণ সব লেখকের পাশে আমার নাম, এ আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আমি এতটাই বিস্মিত যে বিশ্বাস করার আগে নিজ কানে ওই ঘোষণা শোনা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি।’

আবদুলরাজাক গুরনাহ ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ভারত মহাসাগরের তানজানিয়ার জাঞ্জিবার দ্বীপে বেড়ে ওঠেন তিনি।

১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শান্তিপূর্ণভাবে মুক্তির পর তানজানিয়ার জাঞ্জিবার দ্বীপ একটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, তখন চলছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবেদ কারুমের শাসনামল। দেশটিতে আরব বংশোদ্ভূত নাগরিকদের নিপীড়ন ও গণহত্যা চালানো হয়েছিল। আবদুলরাজাক গুরনাহ সেসব ভুক্তভোগী নৃগোষ্ঠীর একজন। ফলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর।

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে শরণার্থী হিসেবে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। লেখালেখি শুরু করেন ২১ বছর বয়সে। এরপর জীবনভর তার লেখনীতে এসেছে বিভিন্ন মহাদেশে শরণার্থীদের দুর্দশা আর শরণার্থী জীবনের কষ্টের কথা। গুরনাহ দশটি উপন্যাস এবং বেশ কয়েকটি ছোটগল্প প্রকাশ করেছেন।  আর এসব লেখায় উঠে এসেছে উপনিবেশ ও বাস্তুচ্যুতির অভিঘাতের গভীর কথন।

আবদুলরাজাক গুরনাহ ইংল্যান্ডের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। সম্প্রতি তিনি অবসর নিয়েছেন। সোয়াহিলি তার মাতৃভাষা, তবে ইংরেজি ভাষাতেই তিনি সাহিত্য রচনা করেন। মূলত ওলে সোয়েঙ্কা, এনগো ওয়া থিওংগো এবং সালমান রুশদির মতো লেখক তার আদর্শ।

তিনি বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের সাবেক অধ্যাপক এখন ওয়াসাফিরি নামক একটি জার্নালে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। আর বাস করছেন যুক্তরাজ্যের ইস্ট সাসেক্সে।

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অব ডিপারচার’। ১৯৯০ সালে তার উপন্যাস ‘ডটি’তে তিনি অভিবাসী পটভূমির একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। ‘অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬) এবং ‘বাই দ্য সি’ (২০০১)-এর মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে সত্যের প্রতি আবদুলরাজাক গুরনাহর নিবেদন। তার উপন্যাস প্যারাডাইস (১৯৯৪) যেটি রচনা করা হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ঔপনিবেশিক পূর্ব আফ্রিকাকে ঘিরে। এটি বুকার প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

মূলত এসব লেখনির মধ্যদিয়ে তিনি বিভিন্ন মহাদেশের শরণার্থীর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে নিজের আত্মপরিচয়ই তুলে ধরেন।

আবদুলরাজাক গুরনাহ মনে করেন, তার মাতৃভাষা সোয়াহিলিতে লেখা প্রথম দিকের সাহিত্য ঠিক সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। আরবি ও ফার্সি ভাষার সাহিত্য ‘দি আরবিয়ান নাইটস’, তার সাহিত্যে রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রেরণা ছিল। তবে ইংরেজি ভাষার ঐতিহ্য, শেকসপিয়ার থেকে ভি এস নাইপল, বিশেষভাবে তার লেখার ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

আবদুলরাজাক তার লেখনীতে সচেতনভাবেই ইংরেজি সাহিত্যের প্রচলিত রীতি ভেঙেছেন। ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তুলে ধরার বদলে তিনি তার দরদি ভাষায় ওই জনগোষ্টির গাঁথা-ব্যথা উপস্থাপন করেছেন তার লেখায়।

আবদুলরাজাকের সবশেষ উপন্যাস ডিসার্শন। এটির জন্য ২০০৬ সালে কমনওয়েলথ সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন এবং পরে দ্য লাস্ট গিফটের জন্যও পুরস্কৃতও হন তিনি। তার প্রথম তিনটি উপন্যাস হচ্ছে মেমোরি অব ডিপার্চার, পিলগ্রিমস ওয়ে এবং দোতেই। এই তিনটি উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে শরণার্থীবিষয়ক অভিজ্ঞতার গভীর কথন। ২০০৫ সালের তার উপন্যাস ‘ডেজারশন’ যাকে ‘ইম্পেরিয়াল রোমান্স’ বা ‘রাজকীয় প্রেম-ভালোবাসা’ বলে অভিহিত করা হয়।

গত বছর সাহিত্যের নোবেল পেয়েছিলেন মার্কিন কবি লুইস গ্লুক। সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার জয়ী বাছাই কমিটি সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর ২০১৮ সালে সাহিত্যের নোবেল স্থগিত রাখা হয়। সুইডিশ অ্যাকাডেমির এক সদস্যের যৌন নিপীড়নের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন বেশ কয়েকজন সদস্য।

নোবেল ফাউন্ডেশনের আস্থা ফিরে পেতে কমিটিতে ব্যাপক রদ-বদল আনার পর গত বছর সুইডিশ অ্যাকাডেমি একসঙ্গে দুই বছরের (২০১৮-১৯ সালের) সাহিত্যের নোবেল জয়ীদের নাম ঘোষণা করে। ২০১৮ সালের সাহিত্যের নোবেলজয়ী হিসেবে পোল্যান্ডের ওলগা তুকারচুক এবং পরের বছরের বিজয়ী অস্ট্রিয়ার পিটার হ্যান্ডকে-কে বেছে নেয় সুইডিশ অ্যাকাডেমি।

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের শেষ ইচ্ছা অনুসারে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবতার কল্যাণে অবদানের জন্য প্রতি বছর চিকিৎসা, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। চিকিৎসা বিভাগের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে গত সোমবার এ বছরের নোবেল দেওয়া শুরু হয়। এরপর পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে নোবেল ঘোষণা করা হয়েছে। আজ শুক্রবার শান্তি এবং আগামীকাল শনিবার অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত