১৯৩৫ সালের পর এই প্রথম শান্তিতে নোবেল পেলেন কোনো সাংবাদিক। সে বছর জার্মান সাংবাদিক কার্ল ফন অসিয়েতস্কি শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়া এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন বৃদ্ধি পেতে থাকা আর তার বিপরীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া ও স্বাধীন সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়তে থাকার বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রায় এক শতাব্দী পর এবার পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই সাংবাদিককে পুরস্কার প্রদান সম্পর্কে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিও জানিয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যা গণতন্ত্র ও টেকসই শান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত, তার পক্ষে লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবেই ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা ও রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভকে এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। মারিয়ার ক্ষেত্রে নোবেল কমিটি বলেছে, তিনি তার জন্মস্থান ফিলিপাইনে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতার ব্যবহার ও দেশটিতে ক্রমেই বেড়ে চলা কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যবহার করছেন। দিমিত্রির ক্ষেত্রে নোবেল কমিটি বলেছে, তিনি তার দেশ রাশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক দশক ধরে বাকস্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করছেন।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানকালে সাংবাদিকতা সম্পর্কে নোবেল কমিটি যে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেছে তা উল্লেখযোগ্য। তারা বলছেন, স্বাধীন এবং সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা এবং যুদ্ধের প্রচার থেকে রক্ষা করার কাজ করে। কমিটির তরফে আরও বলা হয়েছে যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। এ প্রসঙ্গে ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসার নোবেলপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় বলা কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মারিয়া রেসা বলছেন, ‘সত্য ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। সত্যহীন একটা পৃথিবী মানে সত্যবাদিতা ও বিশ্বাসহীন এক পৃথিবী’। অন্যদিকে, নোবেলপ্রাপ্তির পর রাশিয়ার সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভের মন্তব্যটিও খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। দিমিত্রি বলছেন, ‘আমি মনে করি এই পুরস্কারের কারণে আমি কর্তৃপক্ষের হামলা থেকে সুরক্ষিত থাকব। এই পুরস্কার আমাদের জন্য শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং রাশিয়ার স্বাধীন সাংবাদিক কমিউনিটির জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ শান্তিতে নোবেলজয়ী দুই সাংবাদিকের মন্তব্য যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় সাংবাদিকতার একটি সম্পূর্ণ চিত্র সামনে নিয়ে আসছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করা বাধাগ্রস্ত হলে যে রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তিগুলোই প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং সেগুলোর ওপর মানুষের আস্থা তথা বিশ্বাসই নষ্ট হয়ে যায়, এই বাস্তবতা সাম্প্রতিক বিশ্বে স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান। অন্যদিকে, রাশিয়ার সাংবাদিক দিমিত্রি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিকে কর্তৃপক্ষের হামলা থেকে নিজের ও রুশ সাংবাদিক গোষ্ঠীর জন্য রক্ষাকবচের সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন।
বিশ্বের অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর নানারকম নির্যাতন-নিপীড়ন ও হামলা-মামলা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান অনুসারে দেশে ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৮শরও বেশি মামলা হয়েছে এবং ২০১৮ সালের অক্টোবরে আইনটি প্রণয়নের পর থেকে মামলা দায়ের হয়েছে প্রায় ২ হাজার। এছাড়া চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সরকারের সমালোচনাকারী প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যমকে সরকারের চাপে থাকতে হচ্ছে এবং বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর ওপরও সরকারের নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি করোনা মহামারীর কালে দেশে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে’ মামলার ঘটনা ছিল তুমুলভাবে সমালোচিত।
এটা লক্ষ্য করা জরুরি যে, বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর দশটা গণতান্ত্রিক অধিকারের মতো নয়, এটি গণতন্ত্রের মৌল ভিত্তি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সংবিধান স্বীকৃত তেমনি আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য। বাকস্বাধীনতার মধ্যে কথা শোনার অধিকারও রয়েছে; তথ্য পাওয়া, চাওয়া, আলোচনা ও বিতর্ক করাও এর মধ্যে পড়ে। সে কারণে এটি কোনো একক ব্যক্তির নিজেকে প্রকাশের অধিকার নয় বরং সর্বজনীন অধিকার। আবার স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান শর্ত এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে প্রখ্যাত মার্কিন যোগাযোগবিদ ও সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপমানের বিখ্যাত উক্তিটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। বহু আগেই তিনি বলেছিলেন ‘The present crisis of Western democracy is a crisis of journalism’। অর্থাৎ, ‘পশ্চিমা দুনিয়ায় বর্তমানে গণতন্ত্রের যে সংকট সেটা সাংবাদিকতার সংকটের কারণেই উদ্ভূত’। সাংবাদিকতা যদি স্বাভাবিকতা থেকে বিচ্যুত হয়, স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে তা সারা দেশের জন্যই সংকট বয়ে আনে এবং গণতন্ত্রের জন্যও সংকট তৈরি হয়। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ওয়াল্টার লিপমানের এই উক্তি যেমন তার কালের পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য সত্য ছিল তেমনি তা একালেও বাংলদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের জন্যই সত্য।
