ইউরোপে মানব পাচারে সক্রিয় ১২৪ সিন্ডিকেট

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ০১:০৪ এএম

লিবিয়ার ট্র্যাজেডির পরও থামেনি মানবপাচার। প্রতিদিনই ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানব পাচারকারীরা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হিসাবে এই কাজে সক্রিয় আছে ১২৪ সিন্ডিকেট। ইতিমধ্যে সিন্ডিকেট সদস্যদের প্রোফাইল প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে মাত্র ছয়জনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। তবে সংস্থাটির জারি করা হুলিয়াও কাজে আসছে না। লিবিয়ায় নিহতের ঘটনার পর বাংলাদেশে ২৯টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ২৫ মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। আবার যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তার মধ্যে বেশিরভাগই জামিনে বের হয়ে গেছে বলে পুলিশ সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, মুক্তিপণ না পেয়ে ২০২০ সালের ২৭ মে লিবিয়া পাড়ি জমানো ৩৭ জন বাংলাদেশির মধ্যে ২৬ জনকে মিজদায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার আগে অনেকের বাঁচার আকুতির ভয়েস রেকর্ড শোনানো হয়েছিল তাদের স্বজনদের। যারা মুক্তিপণের টাকা দিতে পেরেছিল তাদেরও নির্যাতন করা হয়। বিশ্ব মিডিয়ায় এই ঘটনা প্রচারের পর নড়েচড়ে বসে সরকার। একযোগে দেশব্যাপী অভিযান চালানো হয় মানব পাচারকারীদের ধরতে। ওই ঘটনার পর সারা দেশে মামলা হয় ২৯টি। তার মধ্যে সিআইডিতে তদন্তভার যায় ২৫টি মামলার। এসব মামলার মধ্যে সম্প্রতি ২৪টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। সেখানে ২৯৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৭১ জনকে। ৬ জনের নামে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করেছে। তারপরও থেমে নেই তাদের অপরাধ কর্মকান্ড। নানা কৌশলে লোকজনকে পাঠানো হচ্ছে ইউরোপসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে। হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা এই প্রসঙ্গে বলেন, করোনার মধ্যে মানব পাচারকারীরা সক্রিয় আছে। অনেককে ভারত হয়ে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। যারা এসব অপকর্মে জড়িত তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। ওই তালিকায় ১২৪ সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে। যারা দেশে আছে তাদের ধরতে পুলিশ কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা দেশের বাইরেও সক্রিয়। তারা ইতালি, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণও দাবি করছে বলে আমরা প্রচুর তথ্য পাচ্ছি। বিদেশি অপরাধীদের সঙ্গেও তালিকাভুক্ত মানব পাচারকারীদের সখ্য আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সুমি নামে এক মহিলা অভিযোগ করেন, তার স্বামী ইছার উদ্দিনকে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু দালালরা তাকে পাঠানোর পরিবর্তে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ভয়েস রেকর্ড পাঠায়। টাকা না পেয়ে দালালরা ইছার উদ্দিনের হাত-পা ভেঙে দেয়। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা সুমি এখনো জানেন না।

জানতে চাইলে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ সাইদুর রহমান জানান, মানব পাচারের অভিযোগে দায়ের করা ২৪ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি একটি মামলার তদন্তও শেষ পর্যায়ে আছে। এই চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে লিবিয়ায় মানব পাচার করছে বলে তথ্য এসেছে। তারা ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে ঝুঁকিপূর্ণ মানব পাচার করছে। এসব ঘটনায় প্রতারিত হয়ে অনেকে টাকা ফেরত পাওয়ার পর মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে আগ্রহী হচ্ছে না। আবার কিছু ব্যক্তি মামলা করলেও মানব পাচারকারীর পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা দেন না। এ কারণে তাদের ধরতে পুলিশের বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও সিন্ডিকেট সদস্যদের ধরার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, দেশের ভেতরে মানব পাচারের ১২৪ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। তারা বাংলাদেশিদের ইউরোপে নিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে পাচার করে আসছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত বাংলাদেশিকে সংগ্রহ করে দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে লিবিয়ায় পাচার করে আসছে। সিন্ডিকেট সদস্যদের যোগসাজশে আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা একের পর এক অপকর্ম করে আসছে। লিবিয়ায় মানব পাচারে চারটি দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে মানব পাচারকারী চক্র। লিবিয়ায় সক্রিয় আছে বাংলাদেশি আরও একাধিক চক্র। দালাল ধরে লিবিয়ায় যাওয়া এসব ভুক্তভোগীকে খরচ করতে হচ্ছে সাত থেকে আট লাখ টাকা। ভারত, নেপাল, দুবাই ও মিসর ঘুরে লিবিয়া যাওয়ার পর চক্রের সদস্যদের হাতে জিম্মি করে রাখা হয় ভাগ্যের অন্বেষণে দেশছাড়া যুবকদের। এরপর আরও ১০-১২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের নির্যাতন করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় অর্থ। টাকা কালেকশন করে দেশে অবস্থানরত পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। তারা ওইসব টাকা হন্ডির মাধ্যমে দুবাইতে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে ধাপে ধাপে ওই টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়। তাছাড়া, দুবাই, আম্মান ও লিবিয়া হয়ে ইতালিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে আলাদা একটি চক্র। এই চক্রের সদস্যরা ইউরোপকেন্দ্রিক মানবপাচার করে। তাদের কেউ লিবিয়া নিয়ে যাওয়ার পর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের সদস্যদের মধ্যে দুবাইয়ে অবস্থানরত আফ্রীন আহমেদ মূল হোতা। সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে ঢাকায় অবস্থান করেন সুজন, মামুন ও কাউসার। ঢাকার ফার্মগেটের মনিপুরিপাড়ায় একটি ট্রাভেলস নামের প্রতিষ্ঠান থেকে এসব অপকর্ম চালানো হচ্ছে। মানব পাচার সিন্ডিকেট সদস্যরা দুবাই, আম্মান ও লিবিয়া হয়ে ইতালিতে অবৈধভাবে লোক পাঠায়। বিদেশে লোক নেওয়ার পর তাদের জিম্মি করে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের পর তাদের কাছ থেকে ৫-১০ লাখ করে টাকা আদায় করা হয়। এসব টাকার ভাগ দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থানরত মুক্তিপণ আদায়কারীদের কাছে পৌঁছে যায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিবাসন প্রত্যাশীরা দুবাইয়ে যাওয়ার পর আফ্রীন আহমেদ তাদের রিসিভ করেন। এই সময় তাদের (অভিবাসনপ্রত্যাশী) নীল গেঞ্জি (টি-শার্ট) পরিয়ে দেওয়া হয়। নীল টি-শার্ট পরা থাকলেই আফ্রীন বুঝতে পারেন এরা তার লোক। সেখান থেকে তাদের জর্ডানের রাজধানী আম্মানে পাঠানো হয়। এরপর টিয়া কালারের গেঞ্জি পরিয়ে জর্ডানের নাগরিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের নেওয়া হয় লিবিয়া। সেখানে যাওয়ার পর পরানো হয় সাদা-কালো গেঞ্জি। লিবিয়ার এয়ারপোর্টে সজীব, মানিক ও জাফর অবস্থান করেন। সাদা-কালো গেঞ্জি দেখলেই তারা বুঝতে পারেন এই ব্যক্তিরা তাদের মক্কেল। পরে তাদের লিবিয়া থেকে নৌকা বা স্পিডবোটে মাল্টা হয়ে অবৈধভাবে ইতালি পাঠানো হয়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাসখানেক আগে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় সুজন নামে এক ব্যক্তিকে। ওই ব্যক্তি পুলিশকে জানায়, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জগন্নাথপুর। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার বড়। তার ছোট ভাই সজীব লিবিয়ায় থাকে। তার মাধ্যমে ভৈরবের জগন্নাথপুরের সজল, লক্ষ্মীপুর গ্রামের বিজয় ও নুরআলীপুরের ইছার উদ্দিন লিবিয়ায় যান। তাদের মধ্যে বিজয় ও ইছার উদ্দিন নিখোঁজ অছেন। সজল ওই হামলায় আহত হয়েছেন। পাচারকারী চক্রের সদস্য জাফরের মাধ্যমে সজীব এই তিনজনকে লিবিয়ায় নিয়ে যান। এর আগেও জাফরের মাধ্যমে অনেক লোক পাঠানো হয়েছে। লিবিয়ার ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া ৪২ জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

সূত্র আরও জানায়, সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ও বরগুনা জেলায় বেশি মানব পাচার করছে। তার মধ্যে ঢাকায় কামাল উদ্দিন, খালিদ চৌধুরী, আবদুস সাত্তার, মাদারীপুরের নূর হোসেন শেখ, নজরুল, রবি, জুলহাস শেখ, মিরাজ হাওলাদার, রাসেল মীর, রাজন ওরফে বুলেট, মোমিন, ইলিয়াছ মীর, জাকির মিয়া, গোপালগঞ্জে রব মোড়ল, কুষ্টিয়ায় মো. কামাল, ফরিদপুরের বক্স সরদার, নড়াইলে মোক্তার মোল্লা, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শাওন ও জাফর ইকবাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রফিকুল ইসলাম (সেলিম) ও হোসাইন, কুমিল্লার সনাতন দাশ ওরফে দাদা, শরীফ হোসেন, শরীয়তপুরের রফিকুল ইসলাম, বরগুনায় সজল ও ইদ্রিস আলী, নোয়াখালীতে রুবেল মির্জা, নাসির উদ্দিন মির্জা ও রিপন মির্জা, কিশোরগঞ্জের হেলাল মিয়া, খবির উদ্দিন ও শহিদ মিয়ার নেতৃত্বে ১৩৪টি সিন্ডিকেট বেপরোয়া। সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, গত বছরের নবেম্বরে লিবিয়ায় মানব পাচার মামলার ৬ পলাতক আসামিকে ধরতে ইন্টারপোলের সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। পরে ইন্টারপোল মিন্টু মিয়া, স্বপন, নজরুল ইসলাম মোল্লা, তানজিরুলসহ ৬ জনকে ধরতে রেড নোটিস জারি করে। তিনি আরও বলেন, গত ২১ জুলাই লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এর আগে গত ২৪ জুন ভূমধ্যসাগর থেকে ২৬৪ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। গত ২৮ ও ২৯ জুন নৌকায় অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে ৪৩ জন নিখোঁজ হয়। ২০১৪ সাল থেকে এই পথে ইউরোপে যাওয়ার পথে বিভিন্ন দেশের ২০ হাজারের বেশি অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরেই মারা গেছেন অন্তত ৩৫০ জন। ভূমধ্যসাগরের এ জলপথকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য ‘বিপজ্জনক পথ’ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত