রাজধানীর মিরপুর-১ এর বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন। সরবরাহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল তার। আড়াই বছর আগে ব্যাংক থেকে ২০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করেন আব্দুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে। ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার চুক্তিও হয় তাদের মধ্যে। কাদেরকে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা দেন জয়নাল। কিন্তু গত আড়াই বছরেও পাননি ঋণ। এরই মধ্যে করোনা পরিস্থিতিতে জয়নালের সরবরাহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিও বন্ধ হয়ে গেছে। পাওনা টাকা চাইতে গেলে জয়নালকে উল্টো হুমকিধমকি দেন কাদের। নিরুপায় হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও থানায় মামলা করেন জয়নাল।
অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া পরিচয় দিয়ে এভাবেই দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা আব্দুল কাদের চৌধুরী হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর গ্রেপ্তারের পর সামনে আসছে কাদেরের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। স্কুলের গণ্ডি পার হতে না পারলেও সচিব পরিচয়ে তার প্রতারণায় বোকা বনেছেন সমাজের অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিও।
কাদেরের কাছে প্রতারণার শিকার হওয়ার কাহিনী তুলে ধরতে গিয়ে জয়নাল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিরপুর ডিওএইচএসে একসময় আমার অফিস ছিল। সেখানে আব্দুল কাদের তার প্রতারণার মার্কেটিং অফিসার পাঠায়। তারা আমাদের বলে, সচিবের মাধ্যমে মর্টগেজ ছাড়া ব্যাংক থেকে লোন ও বিভিন্ন সরবরাহের কাজ পাইয়ে দেবে। বিনিময়ে কমিশন দিতে হবে। আমার ব্যবসার জন্য টাকার প্রয়োজন হলে আব্দুল কাদেরের অফিসে যোগাযোগ করি। তার সঙ্গে দেখা করতেই ১৫ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। তার সঙ্গে চুক্তি হয় ২০ কোটি টাকা লোন পাইয়ে দিলে ১০% অর্থাৎ ২ কোটি টাকা দিতে হবে। এর মধ্যে অগ্রিম দিতে হবে ১%। তবে আমি ০.৫% দিয়েছিলাম। সে মোট ১২ লাখ টাকা আমার কাছ থেকে নেয়। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা ছিল প্রোফাইল মেকিংয়ের জন্য।’
আরেক ভুক্তভোগী রাজধানীর পূর্বাচলের বাসিন্দা ঠিকাদার মনির হোসেন। সরকারি একটি প্রকল্পে বালু সরবরাহের ৮৪ কোটি টাকার কাজ পাওয়ার জন্য আব্দুল কাদেরের কাছে ৪০ লাখ টাকা দেন। তিন কর্মদিবসের মধ্যে কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও কাজ আর দেয়নি কাদের। তবে ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডার দেয় কাদের। পরে মনির হোসেন দেখেন অন্য একটি প্রতিষ্ঠান বালু সরবরাহ করছে।
মনির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আব্দুল কাদের জলসিঁড়ি প্রকল্পের বালু সরবরাহের কাজ পেয়েছে বলে জানায়। সে ভুয়া কাগজপত্রও দেখায়। আমার সঙ্গে বালু সরবরাহের চুক্তি হয় তার। এ কাজ আমাকে দেওয়ার জন্য তাকে জামানত স্বরূপ ৪০ লাখ টাকা দিতে হয়। গত বছরের আগস্ট ও জুলাইতে তিন কিস্তিতে টাকাও দিয়ে দিই তাকে। কিন্তু এর কয়েক দিনের মধ্যেই দেখি অন্য প্রতিষ্ঠান বালু সরবরাহ করছে। পরে টাকা ফেরত চাইলে সে টালবাহানা শুরু করে। একপর্যায়ে আমাকে টাকা না দিয়ে হুমকি দিতে থাকে।’
জয়নাল ও মনিরের মতো আরেক ভুক্তভোগী আলী আকবর। তিনিও সরবরাহের ব্যবসা করেন। থাকেন রাজধানীর রূপনগরে। সরকারি একটি প্রকল্পে পাথর সরবরাহের সাব-কন্ট্রাক কাজের জন্য ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে দুই দফায় ২৩ লাখ টাকা দেন কাদেরকে। কাজও পাননি, সেই টাকাও আর ফেরত পাননি আলী আকবর।
ভুক্তভোগী আলী আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বারিধারার অফিসে এক মিডিয়াম্যান আসে। সে বলে সাব কনট্রাকটরের কাজ পাইয়ে দেবে। এক সচিবের প্রতিষ্ঠান এ কাজ পাইয়ে দেয়। আমি সরল বিশ্বাসে দুই দফায় ১৫ ও ৮ লাখ টাকা দিই। কিন্তু কোনো কাজই সে দেয়নি।’
এভাবেই ভুয়া অতিরিক্ত সচিব পরিচয় দেওয়া আব্দুল কাদের চৌধুরী অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের (ডিবি) কাছে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন আব্দুল কাদের।
গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর কাওরান বাজার, মিরপুর এবং গুলশান এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন কাদেরের দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী ছোঁয়া, অফিস ম্যানেজার শহিদুল আলম ও আনিসুর রহমান। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবি, বঙ্গভবনের ডায়েরি, বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, অফিসের বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি, পত্র-পত্রিকার কাটিং (যেমনসিআইপি পদ পাওয়ার, অতিরিক্ত সচিব হওয়ার ইত্যাদি) ভিজিট ফি রেজিস্টার, বিভিন্ন ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহানুরের ভুয়া স্বাক্ষর সংবলিত ওয়ার্ক অর্ডারের বিলম্বপত্র, প্রতারণামূলক কার্যক্রমের কিছু মেসেজ/চ্যাটিং ও অডিও ক্লিপ, ভিন্ন তথ্যসংবলিত পাসপোর্ট ও আইডি কার্ড, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রোফাইল এবং দলিলাদিসহ প্রতারণার অসংখ্য আলামত।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আব্দুল কাদের মাঝি থেকে আব্দুল কাদের চৌধুরী নাম ধারণ করে তিনি গত ১৪ বছর ধরে প্রতারণার মাধ্যমে গড়েছেন অঢেল সম্পত্তি। রাজধানীর গুলশানে জব্বার টাওয়ারে তার রয়েছে ছয় হাজার স্কয়ার ফুটের অফিস, যার মাসিক ভাড়া ৫ লাখ টাকা। কারওয়ান বাজারেও তার অফিস রয়েছে। মিরপুর ছয় নম্বরে তার বাসা হলেও গুলশান ও মিরপুরে তার ফ্ল্যাট রয়েছে। গাজীপুরে ৯ তলা বাড়ি এবং গাজীপুরেরই পূবাইলে আট বিঘা জমির ওপর রয়েছে বাগানবাড়ি। এছাড়া বেশকিছু ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। অঢেল সম্পদের মালিক হলেও তার নেই কোনো বৈধ উপার্জন।
তার রয়েছে তিন বৈধ স্ত্রী। এছাড়াও আরও অসংখ্য নারীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ভুয়া স্টিকার লাগিয়ে সচিবালয়ে যাতায়াত করতেন। তার গাড়িতে নারী ও অনেক কথিত নারী মডেল থাকত। ওই গাড়িতে করেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পূর্বপরিচিত নারী সঙ্গীদের নিজ অফিসে এনে অনৈতিক কাজে জড়াতেন।
এদিকে ভুয়া স্টিকার লাগিয়ে সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রবেশের ফলে প্রশ্ন উঠেছে সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে। কাদের সচিবালয়ে কোন কোন কর্মকর্তার কাছে যেতেন সে বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশ। অতিরিক্ত সচিব ছাড়াও কাদের নিজেকে সিআইপি বলে পরিচয় দিত। দামি গাড়ি, বডিগার্ড, ওয়্যারলেস সেট ব্যবহার করত। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া কথিত ভুয়া কার্যাদেশ, শমসের বিন মুসার সঙ্গে তার ছবি এবং বিভিন্ন লেনদেনের ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করত। ৩৩ জন সচিবসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে তার কনসোর্টিয়াম, ব্যবসা আছে বলে প্রচার করত।
কাদেরের প্রতারণার নানা দিক তুলে ধরে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, কাদের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা করে থাকে। তার নিয়োগ করা মার্কেটিং অফিসাররা বিভিন্ন ঠিকাদার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রচারণা চালাত। ভুয়া অতিরিক্ত সচিব সেজে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যই ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ফি নিত। ব্যাংক থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রসেসিং ফি বাবদ ৫ থেকে ১০% টাকা ডাউনপেমেন্ট হিসেবে নিত। তিনি বিশ্বাস জন্মানোর জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এবং বিভিন্ন সরকারি প্রজেক্টের শত শত কোটি টাকার ঠিকাদারি পেয়েছেন বলে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করত। এসব ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তা বিক্রি করত। তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা জামানত রেখে প্রতারণা করে। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয়।
এছাড়া সততা প্রপার্টিজের নামে নামমাত্র কিছু টাকা বায়নার মাধ্যমে জমি ও স্থাপনা কেনার জন্য চুক্তি সম্পন্ন করে, যেগুলো দিয়ে পরে মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে টাকা আদায় করেন। এই প্রতারণার কাজগুলো করার জন্য স্বল্পশিক্ষিত কাদের নিজেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন শেষে সর্বশেষ অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হিসেবে পরিচয় দিত।
নাম প্রকাশ না করে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের চাকরিচ্যুত এক ডিআইজির কথিত স্ত্রীর (যার অভিযোগে ওই ডিআইজি চাকরিচ্যুত হন) সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল কাদেরের। সে নিয়মিত কাদেরের পাঠানো গাড়িতে করে কারওয়ানবাজার অফিসে আসত। ওই নারী সেখানে কাদেরের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করত। এছাড়া এ চক্রটি অনেক সুন্দরী নারীর সাপ্লায়ারও ছিল।’
এ বিষয়ে ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুয়া অতিরিক্ত সচিব পরিচয়দানকারী আব্দুল কাদের চৌধুরী ঢাকা ট্রেড কর্পোরেশন, জমিদার ট্রেডিং, সামীন এন্টারপ্রাইজ, চৌধুরী গ্রুপ, হিউম্যান ইমপ্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশন, সততা প্রোপার্টিজ, ডানা লজিস্টিকস, ডানা মটর্স ইত্যাদি নামসর্বস্ব কয়েকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালিত করত। সে হিউম্যান ইমপ্রুভমেন্ট ফাউন্ডেশনের ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের’ মাধ্যমে বড় রকমের প্রতারণা শুরু করে। ২০০৪-২০০৬ সালে দেশের শত শত মানুষের কাছ থেকে সরকারি অনুদানে বাড়ি এবং খামার তৈরি করার নামে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আব্দুল কাদের নিজেকে কথিত ধনকুবের প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের প্রতিষ্ঠান ড্যাটকোর লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে পরিচয় দিত। সে প্রিন্স মুসা বিন শমসেরের নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন স্থাপনার কাস্টোডিয়ান হিসেবে টাকা-পয়সা কোনো ব্যাপার না বলে জাহির করে চাকরিপ্রার্থী, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারকে প্রতারিত করত।’
কাদের সচিবালয়ে কার কার কাছে যেত তা জানতে চাইলে ডিসি মশিউর রহমান বলেন, ‘অনেক প্রতারক সরকারি বড় বড় আমলাদের অফিস কক্ষে ঢুকতে না পারলেও বাইরে এসে বলে অমুক স্যারের সঙ্গে দেখা করে এলাম। আসলে সে সচিবালয়ে কার কাছে যেত, কে কে তাকে ঢোকার সুযোগ দিত এসব বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে।’
