নজরুলের বই ও মাউশির পাঠাভ্যাস প্রকল্প

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২১, ১০:৩৯ পিএম

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি খিলখিল কাজী মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রকল্পে নজরুলের বই অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন। এ নিয়ে দৈনিক দেশ রূপান্তর গত ২১ সেপ্টেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার এই প্রকল্পে আগের বারও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বই না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কবির নাতনি খিলখিল কাজী। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান বই কেনার প্রকল্পে কাজী নজরুলের বই রাখার দাবি জানিয়েছেন। মাউশির প্রকল্পটির নাম সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইডিপি)। এর আগে একই ধরনের প্রকল্পটির নাম ছিল সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ)। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ওই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল বই কেনা হলেও তাতে ছিল না কাজী নজরুল ইসলামের কোনো বই। তালিকা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ২১১ জন লেখকের ৩১২টি বই নির্বাচিত হলেও তালিকায় ছিল না জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাম।

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, খিলখিল কাজীর এই আবেদন আমাদের সবার জন্যই লজ্জাজনক, অনেক কষ্টের ও পীড়াদায়ক। একই সঙ্গে এই প্রশ্ন তোলাটা জরুরি যে, শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার প্রকল্পে দেশের জাতীয় কবির বই নির্বাচনের জন্য এমন আবেদন জানাতে হলো কেন? বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যারা আইডল বা আইকন, যারা বাঙালি জাতিসত্তার প্রধান পরিচয়, যারা বাঙালি জাতিসত্তার আসল কান্ডারি, যাদের সৃষ্টিশীলতার সংস্পর্শ ছাড়া আমাদের একটি দিনও কাটে না তাদের বই সরকারি বই কেনার তালিকায় রাখার জন্য সেই সব মহান লেখকদের উত্তরসূরিদের দাবি তুলতে হবে কেন! এটা এমন একটি সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে যা আসলে মাউশির পুরো প্রকল্পের ব্যবস্থাপনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়।

সারা দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস তৈরি করবে যে প্রকল্প সেটার যথাযথ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের ডিজাইনেই থাকতে হবে। এটা না থাকার অর্থ প্রকল্পের কনসেপ্ট পেপারই যথাযথ নয়। বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা যাদের অবদানে নির্মিত তাদের অপমান-অবহেলা করার অধিকার কেউই রাখেন না। এটা করা সরাসরি অপরাধ। এটা অনেকটা সাংবিধানিক চেতনার লংঘনও বলা যেতে পারে। ফলে রাষ্ট্রে এরকম ঘটনা ঘটলে ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই।

জাতীয় মেধা বিকাশজনিত কাজকর্মে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। সেটা না করাটাই পুরো জাতির জন্য অমর্যাদার বটে। তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস এবং যে মহান লেখকদের রচনাবলি নিয়ে সে ইতিহাস রচিত হয়েছে তাদের অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। অবশ্য এক্ষেত্রে একইসঙ্গে ধ্রুপদী লেখকদের রচনাসমূহের সঙ্গে বাংলাভাষার সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের রচনাসমূহের যথাযথ মেলবন্ধন তৈরি করতে পারা জরুরি। কেননা বাংলার উত্তর প্রজন্মের সাহিত্য বিনির্মাণও অনেক শক্তিশালী। স্বাধীন বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরেও অনেক ভালোমানের কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। কিন্তু ধ্রুপদী ও সমকালীন লেখকদের রচনার সমন্বয় হবে কোন নীতিতে? কারা করছেন বা করবেন এ গুরুত্বপূর্ণ কাজ?

খেয়াল করা দরকার, যে প্রকল্পের বই সারা দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়ক বই হিসেবে ব্যবহৃত হবে, যেসব বই তাদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলবে সেসব নির্বাচনের জন্য অবশ্যই বেসিক অ্যাকাডেমিক রিসার্চ প্রয়োজন। কিন্তু এমন কোনো গবেষণার ভিত্তিতে কি এই মাউশির এই প্রকল্পে বই কেনার তালিকা তৈরি হয়েছে? এমন একটি ব্যয়বহুল প্রকল্পের জন্য যথাযথ গবেষণা করা হলে তা যেমন সত্যিকারের সুফল বয়ে আনত তেমনি সেই গবেষণা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরও কাজে লাগত। অথচ, মাধ্যমিক স্তরের ‘রিডিং কনটেন্ট’ কেমন হওয়া উচিত সেটা জানার জন্য দেশের বর্তমান স্কুলিং সিস্টেমের ওপর কোনো পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট নেই। অর্থাৎ স্টুডেন্টদের বেসিক কম্পিটেন্সি কতটুকু আছে, কোন পর্যায়ে আছে তার কোনো মূল্যায়ন নেই। এই কাজ আসলে এই প্রকল্পেরই অংশ হওয়ার কথা। কিন্তু সেটা না হওয়ায় এখানে যে একটি মারাত্মক গ্যাপ তৈরি হয়েছে, এটা সাধু, অসাধু ও বুঝমান জ্ঞানী সবারই মানতে হবে।

এমন বড় প্রকল্পের জন্য প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি দুই ধরনের ডাটা বিশ্লেষণই জরুরি। কিন্তু প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কমিটি এমন ডাটা বা তথ্য-উপাত্ত কোথা থেকে পাবেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বটে। সরকারি প্রকল্প হলে, প্রথমেই সেকেন্ডারি ডাটা পাওয়ার জন্য দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম সবার আগে চলে আসে। প্রথমত বাংলা একাডেমি, দ্বিতীয়ত শিশু একাডেমি এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নাম আসে। তাদের বাৎসরিক কাজকর্মে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের শিশু-কিশোরদের পাঠাভ্যাস ও পাঠের যোগ্যতা এবং মেধা-মননের বিকাশ সংক্রান্ত গবেষণাকর্ম, প্রতিবেদন ও বইপত্র থাকা অপরিহার্য বলে মনে করি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের কাজ পাচ্ছি না। 

যদি বাংলা একাডেমি থেকে দেশের শিশু-কিশোরদের সাহিত্য ও বিষয় বৈচিত্র্যের কনটেন্ট নিয়ে ১০টি গবেষণা প্রতিবেদন থাকত, যদি ১০টা ভালো রেফারেন্স বই থাকত দেশের শিশু-কিশোরদের সৃশনশীলতা নিয়ে, যদি তাদের সৃষ্টিশীল কর্মের গতিশীলতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো মূল্যায়ন থাকত তাহলে দেশের প্রকাশকরাও এক ধরনের দিকনির্দেশনা পেতেন। প্রকাশকরা নিজেদের কাজের ফাঁকফোকর ধরতে পারতেন। তাতে সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বইগুলোও সেসব গবেষণার আলোকে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতো। কিন্তু এমনটি হয়নি। এমন হওয়া যে দরকার সেই চিন্তাও করা হয় না। যার ফলে কোনো ক্রান্তিকালে, কোনো জাতীয় জরুরি প্রয়োজনে এসব বিষয়ে অনুসরণযোগ্য কোনো পথ পাওয়া যায় না। শুধু প্রকাশকদের নিজস্ব চিন্তা থেকে উৎসারিত বইপত্র জাতিগঠনের সেরা উপকরণের স্বীকৃতি পেতে পারে না। এখানে কোনো অভিভাবকত্ব নেই। শত রকমের ব্যত্যয় আছে। আমাদের কর্মসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজনরা দিনেদুপুরে আমাদের ফাঁকি দেন। তাদের জীবনটাই যেন মিটিং আর মিটিংময় দায়ে ভরা। ক্রয় নীতিমালা সংস্কার করতে করতেই বছর পেরিয়ে যায়! তাই জাতিগঠনের জন্য ভূমিকা রাখা আর হয়ে ওঠে না।

প্রথমেই জিজ্ঞাসা আসে, মাউশির এই প্রকল্পে ‘কনটেন্ট’ কীসের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে? শুধুই কি ‘আনন্দদায়ক পাঠ’ বা ‘লেখক পরিচয়’ ও ‘বইয়ের শিরোনাম’-এর ভিত্তিতে বইগুলো নির্বাচিত হবে? এমনটা কি কোনো বিচারেই যৌক্তিক বলে মনে করা সম্ভব? অবশ্য, প্রকল্প ব্যবস্থাপকরা তড়িঘড়ি করে উত্তরে বলতেই পারেন, স্টাডি রিপোর্ট তো আমরা অবশ্যই দেখেছি!

যদি দেশের এ কালের শিশু-কিশোরদের উপযোগী শিক্ষা সহায়ক বইগুলোর বিষয়-বৈচিত্র্য সুনির্বাচিত না হয়, যদি এই স্তরের শিক্ষার্থীদের ‘ধারণ ক্ষমতা’ সম্পর্কে আমরা পরিষ্কার করে না জানি তাহলে প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা খরচ করেও প্রকৃত ফলাফল আসবে না এটাই সত্য। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিশু-কিশোর আছে যারা জীবনে একটি গল্পের বইও পড়বার সুযোগ পায়নি। অনেক অভিভাবকও সন্তানকে পাঠ্যবইয়ের বাইরে একটি বই কিনে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন না। ফলে শিশু-কিশোরদের জন্য কোন ধরনের রিডিং কনটেন্ট দরকার সেটা বিবেচনায় নিতে গেলে দেশের ভৌগোলিক বিন্যাস এবং শহর ও গ্রামাঞ্চল ভেদে কয়েকটি স্তরের বিভাজন প্রয়োজন হতে পারে।

যদি একটি গবেষণালব্ধ গাইডলাইন ধরে মাউশির এই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া যেত তাহলে তা সত্যিকার অর্থেই নতুন প্রজন্মের জন্য সুফল বয়ে আনত। এমন একটি দিকনির্দেশনামূলক গবেষণা থাকলে দেশের প্রকাশকদেরও প্রশিক্ষিত করা যেত। ওই গবেষণার আলোকে প্রকাশকদের জন্য এই বিষয়ে ধারাবাহিক কয়েকটি কর্মশালার আয়োজন হতে পারত। দেশে প্রকৃত অর্থে মানসম্মত সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আসলে কতই-বা? এই তালিকা তৈরি করতে ন্যাশনাল আর্কাইভের রেফারেন্স, বাংলা একাডেমির মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকরা এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও গণ গ্রন্থাগারের রেফারেন্স ব্যবহার করা যেতে পারে। আর এই প্রক্রিয়া ধরে এগোলে বই নির্বাচনে ভূমিকার পাশাপাশি প্রয়োজনে প্রকল্পের চাহিদা মতো বইও প্রকাশ করে দিতে পারতেন প্রকাশকরা। ৩-৪টি ব্যাচ করে এমন কর্মশালা খুব স্বল্প খরচেই হয়ে যেতে পারত। এতে করে এই প্রকল্পের স্বচ্ছতাও অনেক বেড়ে যেত! এখন যে কানাঘুষা চলছে সেটা অনেক কমে যেত। এখন কার কোন গোপন লাইন আছে, কার শক্তিশালী জ্যাক আছে, কার পলিটিক্যাল ব্যাকআপ মারাত্মক রকমের এসব আলোচনাও বন্ধ হতো।

এখনকার শিশু-কিশোররাই একদিন এই দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্য নাগরিক হয়ে উঠবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য তাদের যোগ্য করে তুলতে শিক্ষার কারিকুলাম ও কনটেন্ট অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শুধু সাহিত্যপাঠই অপরিহার্য নয়। বহুরকম বিষয়-বৈচিত্র্যের বই পড়া প্রয়োজন শিশু-কিশোরদের। সুলিখিত বই পড়ানোর প্রয়োজন। ৫০ বছর ধরে আমরা শুধু নানা শক্তিধর শিক্ষা কমিশন ও কমিটি দেখে আসছি। কতগুলো শিক্ষা বোর্ড, দপ্তর, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় কাজ করে শিক্ষা নামের এই মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ খাতে। এখানে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ব্যয় হয়। অথচ আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করে দিয়েছি, করছি-করমু বলে বলে। এদিকে, ট্র্যাজেডি হলো, এখনো দেশের শিশু-কিশোররা কী পড়বে, তাদের সিলেবাস কী হবে, তাদের পাঠদান এবং মূল্যায়নের পদ্ধতিও আজ-অবধি চূড়ান্ত করা যায়নি। এদেশে শিশুদের কেবলই পরীক্ষা-নিরীক্ষার গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। শিক্ষাকে জাতিগঠনের প্রধান উপকরণে পরিণত করার বদলে বৈষম্যের প্রধান সূচকে পরিণত করা হয়েছে।

লেখক প্রকাশক, সমগ্র প্রকাশন

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত